প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস-২০১৯ : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও গত ২৯ মে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস উদযাপিত হয়েছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এক গর্বিত অংশীদার। আর এ কার্যক্রমে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৩০ বছর অতিক্রম করেছে সফলতার সাথে। বিশ্বের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ স্থানে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ। বিশ্বশান্তি রক্ষায় এই দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা বাংলাদেশের সংবিধানেও উচ্চারিত হয়েছে। একই সাথে আমাদের পররাষ্ট্র নীতিতেও এই সূর অনুরণিত হয়েছে যার মূল কথা ‘সবার প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়’। এই দৃঢ় অঙ্গীকারকে সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ একযোগে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে অত্যন্ত সফলতার সাথে অংশগ্রহণ ও অর্পিত দায়িত্ব পালন করে আসছে।
আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গত ২৯ মে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশ একটি শান্তিকামী দেশ। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে ধরার মাধ্যমে একটি শান্তিকামী দেশ হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ৩০ বছরের অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি বিশেষ ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন। তিনি বীরোচিত কাজ, মেধা এবং বিচক্ষণতার মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান।
দিবসটি উপলক্ষে শহীদ শান্তিরক্ষীদের নিকট আত্মীয় এবং আহত শান্তিরক্ষীদের জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এছাড়া জ্যেষ্ঠতম শান্তিরক্ষী হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বক্তব্য প্রদান করেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো। এছাড়া রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সাথে মতবিনিময় করেন। অনুষ্ঠানে তিন বাহিনী প্রধান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও), পুলিশের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিদর্শক, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, বাংলাদেশে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান শান্তি মিশনে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫ জন সদস্য জাতিসংঘের পতাকাতলে একতাবদ্ধ হয়। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী শান্তি মিশনে যোগ দেয় ১৯৯৩ সালে। বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ পরিবারের সদস্য হয় নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে।
হাইতি থেকে পূর্ব তিমুর, লেবানন থেকে কঙ্গো পর্যন্ত বিশ্বের সকল সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের পদচিহ্ন রয়েছে। বসনিয়ার তীব্র শীত, সাহারা মরুভূমির দুঃসহ গরম ও পূর্ব এশিয়ার ক্লান্তিকর ভাদ্র, তার সাথে মানিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা। ধর্ম, গোত্র, বর্ণ, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আঞ্চলিক বৈষম্যকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা নিজেদের উৎসর্গ করেছে বিশ্বমানবতার সেবায়। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা ছড়িয়ে আছে বিশ্বের প্রায় সবখানে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা, নিরপেক্ষতা, সততা ও মানবিকতার কারণে বিশ্বের সকল মানুষের কাছে আজ তারা দৃষ্টান্তস্বরূপ।
সরকারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী অন্যতম প্রধান দেশ। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা একনিষ্ঠভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এ পর্যন্ত বিশ্বের ৪০টি দেশে ৫৪টি মিশনে ১ লক্ষ ৬৩ হাজার ৮৮৭ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী সদস্য অংশগ্রহণ করেছেন। বর্তমানে বিশ্বের ১০টি দেশে ৬ হাজার ৫৮২ জন সদস্য শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণও ক্রমান্বেয়ে বেড়ে চলেছে। এরই মধ্যে ১ হাজার ৬০৯ জন নারী শান্তিরক্ষী সাফল্যের সাথে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে মোট ২১৪ জন নারী শান্তিরক্ষী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে কর্মরত আছেন। তাছাড়া সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ১৪৬ জন বাংলাদেশি বীর সন্তান নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের এই ত্যাগ বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে যেমন রক্ষা করেছে তেমনি সারা বিশ্বের মানুষের নিকট বাংলাদেশকে করেছে গৌরবান্বিত।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দ্রুত সাড়াদান প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পূর্ণ সামর্থ্যরে কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দ্রুত সাড়াদান প্রস্তুতি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ২৬টি ক্ষেত্রে অর্থাৎ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯টি, নৌবাহিনীর ৬টি, বিমান বাহিনীর ৩টি এবং পুলিশ বাহিনীর ৮টি ক্ষেত্রে জাতিসংঘকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ‘মানুষবিহীন আকাশ নজরদারি’ ব্যবস্থার বিষয়েও একটি প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি আমরা শান্তিরক্ষার বিধি-বিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে জাতিসংঘে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
উল্লেখ্য, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণের চলমান পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের অ্যাকশান ফর পিসকিপিং ইনিশিয়েটিভ, ২০১৪ সালে নিউইয়র্কস্থ পিসকিপিং মিনিস্ট্রিয়াল, ২০১৫ সালে নিউইয়র্কে, ২০১৬তে প্যারিসে এবং ২০১৭ তে ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত দ্য লিডার সামিট অন পিসকিপিং অনুযায়ী জাতিসংঘ এই মন্ত্রিপর্যায়ের সভার আহ্বান করে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেজ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন।