কলাম

বদ্বীপ পরিকল্পনা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন

ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর
বাংলাদেশের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর ৫ম খ-ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আর্থসামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্টভাবে উন্নয়নের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন ১৩২৯৫ বর্গকিলোমিটার (দেশের ভূমি এলাকার ১০%) এবং লোকসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। তিনটি জেলায় (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) বিভক্ত এই এলাকায় ১২টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর বাস। এদের মধ্যে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের জনসংখ্যা বেশি। ত্রিপুরারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী; চাকমা ও মারমারা বৌদ্ধ। ২০০১ সাল থেকে সমতল ভূমি হতে ক্রমাগত মুসলিমদের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার বসতি স্থাপনের ফলশ্রুতিতে এখন এই এলাকায় তাদের সংখ্যা প্রায় ৫০% হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই এলাকাতে মাথাপিছু আয় জাতীয় গড় থেকে ২৭% কম।
বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের পর ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রমাগতভাবে বেড়ে ওঠা সামাজিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের একগুঁয়ে মনোভাব ও শাসনের কারণে এখানকার উপজাতীয়রা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশে সব নাগরিক সমান অধিকারসম্পন্ন এবং এই বিবেচনায় সব এলাকা সমভাবে উন্নীত করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিক দিকনির্দেশনায় সশস্ত্র প্রতিরোধকারীদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি সম্পাদনে বাংলাদেশ সরকারের তরফ হতে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন সংসদের চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ও উপজাতীয়দের তরফ হতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় বা সন্তু লারমা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে চূড়ান্ত পর্যায়ে আলোচনা ও চুক্তি প্রণয়নে আমি সংশ্লিষ্ট ছিলাম। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রণীত ব-দ্বীপ পরিকল্পনার ভিত্তি রৈখিক সমীক্ষণে শান্তিচুক্তিকে এই এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে (দ্রষ্টব্য, বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০, ভিত্তি রেখা সমীক্ষণ, ৫ম খ-, পৃঃ ২২২)।
শান্তিচুক্তির আওতায় বাংলাদেশের সংবিধান, ভূমাত্রিক অখ-তা ও সার্বভৌমত্বের অলঙ্ঘনীয়তাকে স্বীকৃতি দিয়ে ১. পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে এর বৈশিষ্ট্য রক্ষাকরণ ও উন্নয়নের ওপর জোর (চুক্তির ক অংশ), ২. পার্বত্য এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ৩টি জেলা পরিষদকে অধিকতর আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্পণ এবং পার্বত্য এলাকায় প্রযোজ্য আইনাবলি গ্রহণ ও প্রয়োগকরণ বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেয়ার দায়িত্ব প্রদান (চুক্তির খ অংশ), ৩. তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের উন্নয়ন তৎপরতা ও আইনশৃঙ্খলাসহ সাধারণ প্রশাসন সমন্বয় করার লক্ষ্যে উপজাতীয়দের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নেতৃত্বের আওতায় একটি আঞ্চলিক কাউন্সিল গঠনকরণ (চুক্তির গ অংশে) এবং ৪. উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত প্রশাসনিক ও আর্থিক সহযোগিতা দেয়া, ভূমি সংক্রান্ত বিবাদ নিষ্পত্তি ও জরিপের ভিত্তিতে ভূমি মালিকানার রেকর্ডাদি প্রণয়ন ও সংরক্ষণের জন্য ভূমি কমিশন গঠন, জনসংহতি সমিতির সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ ও আত্মসমর্পণ, স্থায়ী সামরিক ছাউনি ও সীমান্তরক্ষীদের স্থাপনা ছাড়া সব অস্থায়ী সামরিক ও আধাসামরিক ক্যাম্প পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারকরণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় অবস্থিত সকল সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিয়ে পার্বত্য এলাকার প্রার্থীদের নিযুক্তি এবং পার্বত্য এলাকা বিষয়ক মন্ত্রণালয় স্থাপন করে একজন উপজাতিকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের নিশ্চয়তা দেয়া হয় (চুক্তির ঘ অংশে)।
শান্তিচুক্তি সই করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চুক্তিটি পার্বত্য এলাকায় স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সারাদেশের জনগণের জন্য সুযোগের এক জানালা খুলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর অধিকাংশ সংবেদনশীল দেশ এই চুক্তিকে স্বাগত জানায়। শান্তি স্থাপনে সাহসিকতা ও দৃঢ় সংকল্পবোধ প্রদর্শনের জন্য জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো চুক্তির সারথী শেখ হাসিনাকে প্রখ্যাত হামফ্রে বোয়েগনী শান্তি পুরস্কার দিয়ে সম্মান ও স্বীকৃতি জানায় (দ্রষ্টব্য, মহীউদ্দীন খান আলমগীর, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, জনকণ্ঠ, ডিসেম্বর ১২, ২০০৫)।
১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির সূত্র ধরে এই এলাকায় প্রশাসনিক সংস্কার, সামাজিক সংহতি স্থাপন ও উন্নয়ন কার্যক্রম গুরুত্বের সঙ্গে হাতে নেয়া হয়। বিদ্রোহী উপজাতীয়রা অস্ত্র সমর্পণ করে এলাকার প্রশাসন ও উন্নয়নে শেখ হাসিনার সহযোগী হন। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকার তাদের তরফ থেকে এই চুক্তির বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে এই সব কার্যক্রম হয় বন্ধ, না হয় স্থবির করে দেয়। পরবর্তী নির্বাচনে এই প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের পরাজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবার পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিশৃঙ্খলা, সংহতি ও উন্নয়ন অর্জনের জন্য শান্তিচুক্তির সূত্রাদি অনুসরণ করে গঠনমূলক পদক্ষেপ নেয়া হতে থাকে। এতদসত্ত্বেও এই এলাকা দেশের প্রধান দারিদ্র্যজর্জরিত এলাকা রূপে বিদ্যমান। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই এলাকার ৫২% জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। দেশের ১৫টি দরিদ্র জেলার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার ৩টি জেলা বিদ্যমান রয়ে গেছে।
ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার উন্নয়নের জন্য ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত কার্যক্রম বিধৃত হয়েছে। ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এই এলাকার প্রকল্প প্রণয়ন, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের গুরুত্ব স্বীকার করা সত্ত্বেও বাস্তবে অগ্রাধিকারের সূত্র অনুযায়ী উন্নয়ন হয়নি। এই পরিকল্পনাকালীন স্থানীয় লোকজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ৫টি কর্মশালায় এই এলাকার উন্নয়নের কার্যক্রম আলোচিত হয়েছে (দ্রষ্টব্য, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা, ৫ম খ-, পৃঃ ২১১-২১৬), কিন্তু সন্তোষজনক অর্থায়ন নির্দিষ্ট করা যায়নি। ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও বদ্বীপ পরিকল্পনায় সব প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং উন্নয়ন অর্থায়নের গুরুত্ব, আকার ও প্রকৃতি নির্দিষ্ট করে সুনির্দিষ্ট ও পর্যায়ক্রমিক কার্যক্রমে একীভূত বা সুবিন্যস্ত করা হয়নি। অসম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পার্বত্য এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নকে পাশ কাটিয়ে প্রণীত হয়েছে এবং ধীর গতিতে বাস্তবায়িত হতে চলছে, নির্দ্বিধায় একথা বলা চলে।
উল্লেখ্য, পার্বত্য এলাকার ভূসম্পদ জরিপ করার লক্ষ্যে এখনও যথোপযুক্ত ভূতাত্ত্বিক জরিপ হাতে নেয়া হয়নি। চুনা পাথর, কয়লা, পাললিক শিলা ও আকরিক লোহা এই এলাকার ভূস্তরে বিদ্যমান বলে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে মত প্রকাশ করেছেন। মিয়ানমারের আরাকান এলাকা সন্নিকটে বাংলাদেশের এই এলাকায় ও এর সংলগ্ন মহাদেশীয় সোপানে খনিজ তেল বিদ্যমান বলে ধারণা করা হয়েছে। মাতামুহুরী, কর্ণফুলী, রাংখিয়াং, সাংগু, মায়ানী, চিংড়ি, ফেনী ও বাগখালী নদী এবং তাদের উপনদীসমূহের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচ সম্ভাবনার বিস্তারিত জরিপ এখনও হয়নি। আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক ভূতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে এসব সম্পদের লভ্যতা নিরূপণ করা আবশ্যক বলে বিশেষজ্ঞ মহল থেকে বলা হয়েছে। এই এলাকার বনজ সম্পদ ৬১% এলাকাজুড়ে বিদ্যমান হওয়া সত্ত্বেও তার পূর্ণাঙ্গ জরিপ এবং সম্ভাব্য ব্যবহার বিন্যাস এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, পরিকল্পনাকালীন ৫টি কর্মশালায় উন্নয়ন বিষয়ক সুপারিশ এবং ব-দ্বীপ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য বিষয়ের আলোকে পার্বত্য এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য কতিপয় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ পরিকল্পনাবিদদের গ্রহণ করা সমকালীন প্রেক্ষিতে অভিপ্রেত – এক. এই এলাকায় আর্থসামাজিক উন্নয়নের মৌল ভিত্তি হিসেবে শান্তিচুক্তিতে বিধৃত সব প্রশাসনিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে হবে। এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিত ভূমি কমিশনকে অধিকতর সক্রিয় করে পাহাড়ি জনগণের ভূমির মালিকানা ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সমতল ভূমি থেকে আগত লোকজন যেন কোনোক্রমেই এই এলাকার জরিপবিহীন যৌথ বা সামাজিক চাষের অন্তর্ভুক্ত পাহাড়িদের জমি দখলে নিতে বা রাখতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সার্বিকভাবে এই এলাকার জনগণের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকলেও সমতল ভূমি থেকে আসা জনগণ সমতল এলাকার দারিদ্র্যসীমার আপেক্ষিকতায় পাহাড়ি এলাকায় বিত্তশালী। তাদের এই বিত্তশালিত্ব অনেকাংশে তাদের অনুকূলে প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকা- প্রযুক্ত হওয়ার প্রতিফলন। দুই. প্রশাসন ও অর্থনৈতিক সব কার্যক্রম যাতে পাহাড়িদের প্রতিকূলে না যায় কিংবা কাজ করে তার ওপর সুতীক্ষè নজরদারি থাকতে হবে। এক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ভূমি কমিশন এবং ৩টি জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিষদকে অধিকতর সচেতন, সংবেদনশীল ও তৎপর রাখতে হবে। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে স্থানীয় এলাকা বা বসতিতে যেন অহেতুক দমনমূলক শক্তি প্রয়োগ না ঘটে তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। প্রশাসনিক বিশেষত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকরণের সব কাজ বা পদক্ষেপে উপজাতীয়দের অধিকতর মাত্রায় অংশীদারিত্ব দেয়া কর্মানুগ হবে। তিন. পার্বত্য এলাকায় সর্বত্র বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এই লক্ষ্যে যেখানে প্রয়োজন ও সম্ভব সেখানে সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ ও জল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের ব্যবস্থা দ্রুত গড়তে ও বিস্তৃত করতে হবে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র সংস্কার ও প্রসারণ এবং তার প্রয়োজনীয় জলাধার সংরক্ষণ এই পটভূমিকায় অতীব প্রয়োজনীয় বলে যথার্থ কার্যক্রম প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। বিদ্যুৎ এই এলাকার সব গৃহস্থালি ও গ্রাম আলোকিত করার সঙ্গে সঙ্গে সমাজ থেকে পেছনে টেনে নেয়ার কুসংস্কারসমূহ তিরোহিত হবে। বিদ্যুতের লভ্যতা সেচকার্য প্রসারিত ও কৃষিজাত শিল্প স্থাপিত করা উৎসাহিত করে এই এলাকায় ব্যক্তি উদ্যমের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার অনুকূল আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলবে। চার. বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে নিশ্চয়তা বিধানের সঙ্গে সঙ্গে সব গ্রাম বাজার ও শহর এলাকাসমূহে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করে মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়ে এই এলাকায় বসবাসরত সব জনগোষ্ঠীকে নারীপুুরুষ নির্বিশেষে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে, একীভূত বাজারব্যবস্থার আওতায় সার্বিকভাবে এ এলাকার উৎপাদনকে সুসংহত ও বিস্তৃত করতে হবে। সাম্প্রতিককালে এই এলাকায় সড়ক যোগাযোগ লক্ষণীয়ভাবে প্রসারিত হওয়া সত্ত্বেও এখনও দেখা ও শোনা যায়, পার্বত্য এলাকার বেশকিছু অগম্য স্থানে বা বসতিতে উৎপাদিত কলা, কমলা, কাঁঠাল, আনারস ও অন্যান্য ফল ও শাকসবজি বাজারজাতকরণের সুবিধা বা ব্যবস্থা না থাকায় বিনষ্ট হয়ে যায়। বাজারব্যবস্থা সুসংহত ও বিস্তৃত হলে এই ধরনের অপচয় বন্ধ হয়ে যাবে। পাঁচ. এই এলাকায় ইতোমধ্যে স্থাপিত কাগজের কলকে বাঁশ বা কাঠের বিকল্পে সারাদেশ থেকে আহরিত পুরনো কাগজকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার উপযোগী পুনর্বাসন এবং সেনাকল্যাণ সংস্থা কর্তৃক স্থাপিত (এখন অচল) আনারসের রস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প সংস্কার করতে হবে। এই এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপিত সব শিল্প উৎপাদনকে ন্যূনপক্ষে ১৫ বছর কর অবকাশ দেয়া লক্ষ্যানুগ হবে। ছয়. শিক্ষাকে চেতনাবোধ সৃষ্টি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমূলক জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর ভিত্তি হিসেবে সব এলাকায় অবকাঠামো সৃষ্টি করতে হবে। শেখ হাসিনার শাসনামলে এই এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়কৃত ও বিস্তৃত হয়েছে। এরপরও এখনও এই এলাকায় ইতোমধ্যে স্থাপিত ১৪২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের দাবি উঠেছে। এই দাবি জরুরি ভিত্তিতে পূরণ করে প্রাথমিক শিক্ষার আবরণে দেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বিবৃত অনুজ্ঞা অনুযায়ী ৬-১৪ বয়োবর্গের সব শিশুকে একই মানের অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার আবরণে আনতে হবে, ঝরে পড়ার হার কমিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার অবকাঠামো ও মান সমন্বিতভাবে উন্নীত করতে হবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে কেবল পাহাড়িদের জন্য আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ও পরিচালিত না করে সবার জন্য উন্মুক্ত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত করা লক্ষ্যানুগ হবে। কেবল পাহাড়ি শিশুদের জন্য আবাসিক বিদ্যালয় গড়া ও পরিচালনা তাদের জাতীয় জীবনের মধ্যস্রোত থেকে দূরে রাখবে। কানাডায় এক সময়ে জোর করে আদিবাসী শিশুদের জন্য আবাসিক বিদ্যালয় পরিচালনার কুফল প্রতিক্রিয়া মনে রেখে সাবধানতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। পাহাড়ি তারুণ্যকে বাঙালি জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিকশিত, প্রশিক্ষিত ও যোগ্য করার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম এলাকায় স্থাপিত সব বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশল এবং চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়সহ সব উচ্চশিক্ষার নিলয়ে শতকরা ২% আসন সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করে এসব আসনে ভর্তি হওয়া সব উপজাতীয় ছাত্রছাত্রীকে সরকারি বৃত্তির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ পাহাড়ি তরুণদের দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত সরকারি বিভাগ ও উদ্যোগের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ১% কোটা তাদের অনুকূলে সংরক্ষণ করে তাদের জাতীয় জীবনের মধ্যস্রোতে নিয়ে আসতে ও সংরক্ষণ করতে হবে। সাত. সরকারি ব্যবস্থাপনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় এই এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত করতে হবে, সুপেয় পানি সরবরাহ এবং প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসম্মত বর্জ্য ও পয়ঃব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এই এলাকার জন্য একটি সেবিকা প্রশিক্ষণ কলেজ স্থাপন জরুরিভাবে হাতে নিতে হবে। এই এলাকায় এখনও বিদ্যমান ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ ব্যাধিসমূহ তিরোহিত করতে হবে। এই লক্ষ্যে বদ্বীপ পরিকল্পনায় বিবৃত সংশ্লিষ্ট ভিত্তি রৈখিক তথ্যাদির আলোকে সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্প ও কার্যক্রম গ্রহণ করা বিধেয় হবে। আট. এই এলাকায় দানাদার শস্যের চাষ বিস্তৃত এবং মৃত্তিকা বিনিষ্টকারী জুম চাষ ক্রমান্বয়ে নিরুৎসাহিত করে শাকসবজি ও ফলফলাদির চাষ ও উৎপাদন প্রযুক্তিভিত্তিক প্রক্রিয়ায় প্রসারিত করতে হবে। যে ৩৩% জমি এই এলাকায় এখনও চাষের আওতার বাইরে বিদ্যমান, তা যথার্থ সেচ ও নিষ্কাষণ অবকাঠামো গড়ে তুলে সব লভ্য জমিকে উৎপাদনশীল কৃষিতে প্রযুক্ত করতে হবে। এই লক্ষ্যে খাগড়াছড়িতে বিদ্যমান কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের খামার, গবেষণাগারকে বিস্তৃত ও শক্তিশালী করা বিধেয় হবে। বিদ্যমান বনজ সম্পদ সংরক্ষণ ও বাড়ানোর লক্ষ্যে সামাজিক সমর্থনভিত্তিক প্রযুক্তি প্রয়োগিক কার্যক্রম প্রণয়ন ও গ্রহণ করতে হবে। নয়. সমতল ভূমিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে যেভাবে গৃহহীনদের জন্য লাগসই গৃহনির্মাণকরণ এগিয়ে চলছে, সেভাবে এই এলাকায়ও মাচাংভিত্তিক বাসের বিকল্পে স্থায়ী ভূমিতে স্থাপিত গৃহাদি নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় হবে। এই এলাকার নৈসর্গিক সম্পদকে ভিত্তি করে পর্যটন সুবিধাদি প্রসারিত করতে হবে। সরকারিভাবে নির্মিত পর্যটন কেন্দ্রের বাইরে ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপনীয় স্থাপনা ও পর্যটন সুবিধাদি দ্রুত ছড়িয়ে দিতে হবে। এই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ে সুপারিশকৃত পারিবারিক পর্যটন ব্যবস্থা বাদ দিয়ে পরিবেশী পর্যটন বিস্তৃত করতে হবে। পারিবারিক পর্যটন বিস্তৃত করলে এলাকার সামাজিক সংহতি হুমকির সামনে দাঁড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা যায়।
উপরোক্ত ৯টি ক্ষেত্রে ও লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প ছক তৈরি ও অনুমোদন করে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় বাজেটের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ দিতে হবে। এই এলাকা উন্নয়নের জন্য যে অঙ্কের বরাদ্দকরণ ঈপ্সিত ছিল তা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলা চলে। দেশের কোনো মেগা বা বড় প্রকল্প এই এলাকায় স্থাপন করা কিংবা তার আওতায় এলাকাকে আনার জন্য নির্দিষ্ট কিছু এখনও নেই। মোটা দাগে ও প্রাথমিকভাবে এই প্রেক্ষিতে এই এলাকার উন্নয়নের জন্য আগামী ৫ বছর ধরে প্রতি বছর ৩০ হাজার কোটি টাকা সমকালীন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সঙ্কুলান করা বিধেয় হবে। এই বরাদ্দ প্রাপ্তের প্রেক্ষাপটে এখন থেকে সুচারুভাবে প্রকল্পসমূহ শনাক্ত ও প্রণয়ন করতে হবে। এসব প্রকল্প ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় বিধৃত সম্পদ ও সমস্যার আলোকে সরকারের আগামী ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্টভাবে অন্তভুক্ত করতে হবে এবং নির্দিষ্টকৃত অর্থায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রকল্প প্রণয়ন একীভূত করে সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে সময়বদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে জাতিকে এগিয়ে যেতে হবে। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সব নাগরিককে সমান অধিকার ও সমভাবে উন্নীত হওয়ার যে সূত্র ও লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন তার বাস্তবায়নে সব অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনা প্রণয়নকারীদের দৃঢ় পদে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে।
লেখক: সংসদ সদস্য
সাবেক আমলা ও মন্ত্রী