আন্তর্জাতিক

বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন সমীকরণ

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)
চতুর্দশ শতকে ইউরোপের রেনেসাঁর শুরু থেকে ষষ্ঠদশ শতকের সায়েন্টিফিক রেভল্যুশনের মধ্য দিয়ে ইউরোপের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার যে শুরু, তা অব্যাহত থাকে একেবারে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত। একসময়ের পুরো আমেরিকাসহ আফ্রিকা, এশিয়াজুড়ে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বিশ্ব ক্ষমতাবলয়ের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থাকে ইউরোপের হাতে। আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার পরে আরো প্রায় ২০০ বছর এশিয়া ও আফ্রিকায় ইউরোপের শাসন বহাল থাকে। সেই সময়ের বিশ্বকে এককেন্দ্রিক, অর্থাৎ ইউরোপকেন্দ্রিক বলা গেলেও ক্ষমতাবলয়ের বিস্তার নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহ অনবরত লেগেই থাকত। ব্রিটিশ ও ফ্রান্স ছিল পরস্পরের প্রবল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের দেশগুলো ক্ষমতাবলয়ের ভাগাভাগিতে পরস্পরের প্রতিপক্ষ ও প্রতিযোগী হিসেবে লিপ্ত ছিল। তার জের ধরেই দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধ হয় এবং দুটি যুদ্ধেরই কেন্দ্রভূমি ছিল ইউরোপের ভূখ-।
প্রথম মহাযুদ্ধের পরে বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন মানচিত্রের সূচনা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট ব্লক এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ব্লকের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতায় বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং তখন থেকে পুঁজিবাদী ব্লক বা পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বের ফ্রন্টলাইনে চলে আসে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিয়োজিত সেনাবাহিনী ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থেকে যাওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতাবলয় বিস্তারের অনেক সুবিধা পায় যুক্তরাষ্ট্র।
এই সময়ে বিভাজনটি মূলত ছিল ইউরোপ এবং আটলান্টিক মহাসাগরকেন্দ্রিক। পূর্ব-পশ্চিম দুই অংশে ইউরোপ ভাগ হয়ে যায়। পশ্চিমের নেতৃত্বে থাকে যুক্তরাষ্ট্র, পূর্বের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন। শুরু হয় বিশ্বব্যাপী ক্ষমতাবলয় বিস্তারের প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত হয় সামরিক জোট ন্যাটো (ঘঅঞঙ) এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গঠিত হয় সামরিক জোট ওয়ারশ প্যাক্ট। দুই পক্ষের অসংখ্য প্রক্সি যুদ্ধের শিকার হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছে কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানে। আমেরিকার ক্ষমতাবলয়ের ভেতরে যেতে অস্বীকার করায় সিআইএ-র হাতে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন তৃতীয় বিশ্বের অনেক স্বাধীনচেতা রাষ্ট্রনায়ক। এই তালিকায় আছেন চিলির আলেন্দো, ইরানের মোসাদ্দেক, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ন এবং বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিব।
নিজেদের দোরগোড়ায় আমেরিকার প্রক্সি শাসক বসানোর ভয়ে ভীত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সত্তর দশকের শেষ দিকে আফগানিস্তান দখল করে নেয়। আফগানিস্তানকেন্দ্রিক অ্যাকশন-রিঅ্যাকশনের সূত্রে বিশ্বে উত্থান ঘটে ভয়াবহ ধর্মান্ধ জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর। সেটি এখন ফ্র্যাংকেনস্টাইনরূপে আমেরিকাসহ পুরো মানবসভ্যতাকে ধাওয়া করছে বিশ্বের সর্বত্র।
ক্ষমতাবলয় বিস্তারের এই অশুভ প্রতিযোগিতার পরিণতির কথা তখনই দুই পক্ষের বাইরে থাকা কয়েকজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা ঠিকই বুঝেছিলেন। তৎকালীন সদ্য স্বাধীন ও উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্রনায়করা, বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী প-িত জওয়াহেরলাল নেহরু এবং মিসরের বিপ্লবী নেতা জামাল আবদুল নাসের উপলব্ধি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েতের নেতৃত্বে দুটি ব্লক, তাদের নিজ নিজ ব্লকের স্বার্থে সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে নিজস্ব ব্লকের দিকে টানার যে চাপ সৃষ্টি করবে তা থেকে বাঁচার জন্য উন্নয়নশীল ও নতুন স্বাধীনতা লাভকারী দেশগুলোর একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থাকা অপরিহার্য। তা না হলে সম্পূর্ণ পৃথিবী দুটি সামরিক জোটে ভাগ হয়ে পড়বে এবং তা হবে বিশ্বশান্তির জন্য অশনি সংকেত। আর নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে বৃহৎ শক্তির করতলে পড়ে নামমাত্র স্বাধীন হয়েও দুই পরাশক্তির আশ্রিত হয়ে থাকতে হবে। তারা নিজ রাষ্ট্রের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে স্বাধীনভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না। উপনিবেশ যুগের শোষিত-নির্যাতিত মানুষ যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে যাবে।
প্রথমে উদ্যোগটি শুরু হয়েছিল মূলত ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর পক্ষ থেকে। ভারত স্বাধীন হওয়ার আগ থেকেই নেহরুর পা-িত্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ছিল। দুই ব্লকের বাইরে বড় একটি তৃতীয় ব্লক সৃষ্টি হলে বিশাল আয়তন, বড় জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে ও জওয়াহেরলাল নেহরুর কারিশমায় অতি সহজেই বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গনে ভারত একটি অন্যতম ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। সেই সুযোগে ভারত প্রথম পক্ষ ও দ্বিতীয় পক্ষ; অর্থাৎ উভয় ব্লক থেকে সমাদর পাবে এবং নবগঠিত সংস্থা বা তৃতীয় পক্ষের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়ন করা সহজ হবে।
আজ বিশ্ব অঙ্গনে ভারতের যে অবস্থান তার শুরুটা হয়েছিল এখানেই এবং তা জওয়াহেরলাল নেহরুর দূরদর্শিতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। নেহরুর মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং সম্মেলনে। ওই সম্মেলনে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্নসহ উপস্থিত নেতারা বিশ্বে একটি তৃতীয় বলয় সৃষ্টিতে একমত হন। বান্দুং সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালে যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন। সেদিন যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল জোসেফ ব্রজ টিটো, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ন, মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের, ঘানার প্রেসিডেন্ট নক্রুমা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু যৌথভাবে দুই ব্লকের বাইরে থেকে একটি মধ্যম পথে চলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। আন্দোলনের আদর্শ হিসেবে জাতিসংঘের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ৫টি নীতি গ্রহণ করা হয়, যার অন্যতম ছিল সবার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং কেউ কারো অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা।
নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া এবং কমিউনিস্ট বিশ্বের পতনের পর জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন অনেকটাই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে ওয়ারশ সামরিক জোটও ভেঙে যায়। তখন ধারণা করা হয়েছিল ওয়ারশ জোটের বিলুপ্তির সঙ্গে ন্যাটো, সামরিক জোটেরও বিলুপ্তি ঘটবে এবং বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের খুঁটি কোনো একটি অথবা দুটি রাষ্ট্রের হাতে থাকবে না। দুই পক্ষের প্রক্সি ও আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলো মুক্ত থাকবে। আর বৈশ্বিক সংকট সমাধানে শক্তিশালী ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হবে জাতিসংঘ। কিন্তু বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সেই আশা পূর্ণ হয়নি। কেন হয়নি, সে তো বিশাল ইতিহাস। কমিউনিস্ট বিশ্বের পতন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া, ওয়ারশ সামরিক জোটের বিলুপ্তিকে যুক্তরাষ্ট্র বিশাল বিজয় হিসেবে ধরে নেয় এবং ভীষণভাবে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক ও সামরিক পন্থায় ও কৌশলে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পুরো বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র একক ক্ষমতাবলয় প্রতিষ্ঠার অভিযানে নেমে পড়ে। একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ন্যাটো বাহিনীকে শক্তিশালী এবং পূর্ব ইউরোপের সব দেশকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৯১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই আড়াই দশকে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় যে রকম ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে এবং ভূ-রাজনীতির কূটকৌশলের পরিণতিতে যেভাবে ইসলামিস্ট উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী এবং তার পাল্টা হিসেবে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে, তার কোনো কিছুই বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের সমীকরণের বাইরে নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একক ক্ষমতাবলয়ের বিপরীতে চীনের মহা-উত্থান, ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক যোগাযোগ স্থাপনের মহাপরিকল্পনা (বিআরআই) এবং ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন সমীকরণের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই যাত্রায় এখন সর্বদাই নতুন নতুন অনুষঙ্গ যোগ হচ্ছে। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নতুন সামরিক নীতিতে আটলান্টিক ও ইউরোপের পরিবর্তে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়ায় এতদঞ্চলের দেশগুলোর ভূমিকা আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে চীন-রাশিয়ার একই বলয়ে অবস্থানের বিষয়টি এখন স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়া, ন্যাটো বাহিনীর ব্যয়ভার নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের মতপার্থক্য এবং সর্বশেষ ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে যাওয়ার কারণে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আগের মতো আর দহরম-মহরম সম্পর্ক নেই। আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো অন্য কোনো ইস্যুতে এখন আর ইউরোপ অন্ধভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করবে না। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির কারণে এতদঞ্চলের বড় দেশ অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ের মধ্যে থাকলেও ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে এসব দেশের জন্য চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য।
প্রশান্ত মহাসাগরের উদীয়মান শক্তি ভারত পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিসহ ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকলেও চীনের সঙ্গে একটি সহযোগিতার করিডর ভারত খোলা রাখতে চায়, যার প্রমাণ পাওয়া যায় চীনের পর্যটননগরী উহানে ২০১৮ সালে নরেন্দ্র মোদি ও শি চিন পিংয়ের হৃদ্যতাপূর্ণ বৈঠকের মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে বিশাল ভূমিধস বিজয় নিয়ে নরেন্দ্র মোদি টানা দ্বিতীয়বার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন। গত মেয়াদের ধারাবাহিকতায় আগামী ৫ বছরে মোদির লক্ষ্য হবে ভারতকে মর্যাদাপূর্ণ নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ারস গ্র“পের সদস্য করা এবং নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের অন্তর্ভুক্তি। এ কারণেই আপাতত চীনের সঙ্গে ভারত কোনো সংঘাতে জড়াবে না। ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের সামরিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার ঘোষণা ও তার কৌশল আগামী দিনে বৈশ্বিক ক্ষমতাবলয়ের নতুন মেরুকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে।
লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক