আন্তর্জাতিক

ব্রেক্সিট: ক্যামেরনের পথে মে: আর কী বিকল্প হাতে আছে ব্রিটেনের?

শাহিনা মনি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ (ব্রেক্সিট) নিয়ে গৃহবিবাদের জের ধরে জুনে পদত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। মন্ত্রিসভা ও দলীয় আইনপ্রণেতাদের প্রবল চাপের মুখে ৭ জুন পদত্যাগ করবেন বলে ২৪ মে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে জানিয়েছেন থেরেসা মে। এর মাধ্যমে কার্যত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে যাচ্ছেন মে। ২০১৬ সালের জুন মাসে ব্রেক্সিট গণভোটের পরাজয় মেনে নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তার উত্তরসূরী হিসেবে ক্ষমতায় বসেছিলেন থেরেসা মে। কিন্তু প্রায় ৩ বছরের মেয়াদে তিনিও ব্রেক্সিট কার্যকর করতে পারেননি, বরং এ নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় আসার ৩ বছরের মাথায় ব্রেক্সিট গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন মে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইইউ ছাড়ার ব্যাপারে নেতাদের মধ্যে কোনো মতৈক্য না হওয়ায় তৃতীয়বারের মতো ব্রেক্সিট বা ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার পর দেশটির পার্লামেন্টে কার্যত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। কিন্তু বিভিন্ন প্রস্তাবের ওপর কয়েক দফা ভোটের মাধ্যমেই কী ব্রিটেনের ইইউ ছাড়ার এই সংকটের সমাধান হবে? যদিও এরই মধ্যে ইঙ্গিতসূচক ভোটের এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি ঐক্যমত্যে পৌঁছার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটাও ব্যর্থ হয়। এমন অবস্থায় আর কী কোনো পথ খোলা আছে থেরেসা মে’র সামনে? নাকি এরই মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার সব পথই বন্ধ হয়ে গেল?
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে আরেক দফা ইঙ্গিতসূচক ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর প্রক্রিয়াও আগের বারের মতোই হবে। এমপিরা স্পিকারের কাছে নিজেদের প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন। এরপর স্পিকার সিদ্ধান্ত নেবেন কোন প্রস্তবের ওপর ভোট হবে আর কোনটিতে নয়। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র তৃতীয় প্রস্তাবও ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে পার্লামেন্টে।
ব্রেক্সিট নিয়ে এখন যুক্তরাজ্যের যে মরিয়া অবস্থা তাতে পথ খুঁজে পেতে এমনই আরো বেশ কয়েকটি প্রস্তাব ছিল। কিন্তু ২৪ মে রাতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সে থেরেসা মে’র আনা চুক্তিটির পক্ষে ২৮৬ এবং বিপক্ষে ৩৪৪ ভোট পড়ে। ব্রেক্সিটের জন্য এটিই ছিল একমাত্র চুক্তি যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের সাথে ব্রিটেনের মতৈক্য হয়েছিল। কিন্তু এ চুক্তিটি পার্লামেন্টে এতটাই সমালোচিত হয় যে পরপর ৩ বার ভোটে দিয়েও এটি পাস করাতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।
অতঃপর ২৪ মে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, আগামী ৭ জুন তিনি কনজারভেটিভ দলের প্রধানের পদ ছাড়বেন। তবে নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল থাকবেন। এদিকে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি জানিয়েছে, জুলাইয়ের মধ্যেই থেরেসা মের উত্তরসূরি নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেরেসা মে-র গত ৩ বছরের পুরোটাই যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এক বিচিত্র অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ সময় তার মন্ত্রিসভা থেকে ৩৬ জন পদত্যাগ করেন, যাদের ২১ জন শুধু ব্রেক্সিট বিরোধের জের ধরে পদত্যাগ করেছেন। দেশটিতে এত অল্প সময়ে এত বেশি মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। কেবল বিরোধী লেবার দলকে কোণঠাসা করতে ২০১৭ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়েছিলেন মে। কিন্তু নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে মে নিজেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন। মাত্র ১০ আসন জেতা উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সঙ্গে সমঝোতা করে তিনি সরকারে বহাল থাকেন। ওই নির্বাচনই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। গত জানুয়ারি মাসে তার উত্থাপিত ব্রেক্সিট চুক্তি ২৩০ ভোটের ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হয়। এটিও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সরকারের সবচেয়ে শোচনীয় পরাজয়ের রেকর্ড। এছাড়া স্বল্পতম সময়ে বিদায় নেয়া প্রধানমন্ত্রীদের তালিকার পঞ্চম স্থানে যুক্ত হতে যাচ্ছেন মে।
জাতির উদ্দেশে দেয়া আবেগঘন বক্তব্যে মে বলেন, ২০১৬ সালের গণভোটে যুক্তরাজ্যের মানুষ যে রায় দিয়েছিলেন, তা কার্যকরে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। এই ‘গভীর বেদনাদায়ক’ ব্যর্থতা তাকে বাকি জীবন পীড়া দেবে।
ইইউর সঙ্গে সম্পাদিত বিচ্ছেদ বিলে সমর্থন আদায়ে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতার সব চেষ্টা করেছেন জানিয়ে মে বলেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যিনিই দায়িত্ব নেন না কেন, পার্লামেন্টে সমঝোতার ভিত্তিতেই ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন করতে হবে।
ব্রেক্সিট কার্যকরে মে দীর্ঘ প্রায় ৩ বছরের চেষ্টায় ইইউর সঙ্গে একটি বিচ্ছেদ চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও তিনি এই চুক্তিতে নিজ দলের কট্টর ব্রেক্সিটপন্থি ও পার্লামেন্টের বিরোধী দলগুলোর সমর্থন নিতে পারেননি। এখন থেরেসা মের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের কাজটি আরও জটিল হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।