কলাম

রাজনীতিতে নতুন রূপে ড. কামালের আবির্ভাব: কার লাভ কার ক্ষতি?

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশিষ্ট আইনজীবী ও বাংলাদেশ সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন খুবই পরিচিত মুখ। তৃণমূল পর্যায়ে জনভিত্তি না থাকলেও দেশে-বিদেশে নানা কারণে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে তিনি খুব একটা সফলতা দেখাতে পারেননি। বারবার চেষ্টা করেও নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম সহচর এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বলে দাবিদার ড. কামাল আওয়ামী লীগ ছেড়ে গড়েছেন গণফোরাম নামে নতুন রাজনৈতিক দল। সেখানেও তেমন একটা সুবিধা করতে পারেননি ড. কামাল।
এ তো গেল স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে ২০১৮ সাল-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক যুগের কথা। এবার ২০১৮ সালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন রূপে আবির্ভাব ঘটে ড. কামাল হোসেনের।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতির আকাশে যখন কালো মেঘ ঘনীভূত হতে থাকে ঠিক তখন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম রাজনীতির মাঠে নতুন করে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের অবর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বহীনতার সুযোগে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক জটিল সমীকরণের মাঝে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে যোগ দেয় বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোট। এতে রাজনৈতিক ময়দান বেশ সরগরম হয়ে ওঠে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে যেমন বেকায়দায় বিএনপি, ঠিক তেমনি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার চ্যালেঞ্জে দেশি-বিদেশি প্রচ- চাপে ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপির নেতা হিসেবে রাজনৈতিক ময়দানে ড. কামাল হোসেনের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায় এবং সরকারের সাথে বিএনপির পক্ষে ড. কামালই মূল নেতা হিসেবে রাজনৈতিক দেনদরবার করেন। উত্তপ্ত রাজনৈতিক মাঠে আলোচনায় ড. কামাল ও সরকার মুখোমুখি হয়। রাজনৈতিক জটিল সমীকরণে নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি তাদের দলের নীতিগত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এতে করে সরকারের চাওয়া অনুযায়ী দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস পরাজয় হয়েছে এবং বিএনপি এ নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে সংসদে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে পুনরায় নির্বাচন দাবি করে। পরবর্তীতে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও নাটকীয়তার পর বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করে সংসদে যোগদানের মাধ্যমে বর্তমান একাদশ সংসদকে বৈধতা দান করে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতির চলমান ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত উদাহরণ সৃষ্টি করে এবার ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংসদে যোগ দিয়ে যে চমক সৃষ্টি করেছে তাতে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাই সন্তুষ্ট নন। তারা মনে করেন, ড. কামাল হোসেন সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে বিএনপিকে মিসগাইড করে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে সম্পৃক্ত করেছে এবং সংসদে যাওয়ার ফাঁদে ফেলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও ড. কামাল হোসেনের রাজনীতিতে নতুন রূপে আবির্ভাবকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছেন। কেউ বলছেন, ড. কামাল সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সহিংস রাজনীতি থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন। তাদের মতে, নতুন রূপে ড. কামাল হোসেন রাজনীতিতে আসার কারণে এবং বিএনপিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে কোন দলের লাভ হয়েছে আর কোন দলের ক্ষতি হয়েছে Ñ তা বিবেচনায় রাখতে হবে। সেই হিসাব বিবেচনায় নিয়ে তারা বলছেন, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বের কারণে যেহেতু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ইচ্ছা বা চাওয়ার পরিপূর্ণতা লাভ করেছে এবং বিএনপির কোনো ইচ্ছাই পূর্ণ হয়নি; তাই বিএনপির দলগতভাবে বা রাজনৈতিকভাবে এ নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বিএনপি ও রাজনৈতিক সমালোচকদের মতো দেশের অনেক রাজনীতিসচেতন মানুষও মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই অসফল ড. কামাল হোসেন নতুন রূপে রাজনীতিতে এবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য আশীর্বাদ এবং বিএনপির জন্য অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তারা বলছেন, ড. কামাল হোসেন সরকারের সাথে কোনোরূপ আঁতাত না করলেও কাকতালীয়ভাবে তার নেতৃত্ব অথবা ভূমিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের পক্ষে এবং বিএনপির বিপক্ষেই চলে গেছে। তবে ইতিহাসই একদিন বিচার করবে প্রকৃত সত্য ঘটনাটি কী?