প্রতিবেদন

এবার হংকংয়ে গৃহকর্মী পাঠানোর সুযোগ: নিরাপত্তায় সরকারের যথাযথ তদারকি প্রয়োজন

স্বদেশ খবর ডেস্ক
সৌদি আরবের পর এবার হংকংয়ে গৃহকর্মী পাঠানোর বড় একটি দ্বার উন্মোচন হতে যাচ্ছে। দেশটিতে দিন দিন প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের দেখভালের জন্য দরকার পর্যাপ্ত লোকবল। কিন্তু সেখানে গৃহকর্মীর খুবই সংকট। এজন্য বাংলাদেশের সহায়তা নিতে পারে তারা। হংকংয়ে গৃহকর্মীর যে সংকট তার সমাধানের ক্ষেত্র হতে পারে বাংলাদেশ।
অনলাইন সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই তুলে ধরা হয়েছে।
হংকং তাদের গৃহকর্মীর সংকট পূরণ করতে দীর্ঘদিন ধরে ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে জনবল সংগ্রহ করে আসছে। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে নীতিনির্ধারণী জটিলতা দেখা দেয় তাদের। এদিকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে গৃহকর্মী পাঠিয়ে আসছে। ফলে হংকংয়ের গৃহকর্মী সংকটের সমাধানের জন্য বাংলাদেশের দিকে দৃষ্টি দিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।
জানা গেছে, এরই মধ্যে অনেক নারী এ কাজে হংকং যেতে শুরু করেছেন। তাদেরই একজন তাজমিরা (২৪)। ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমা করেছেন তিনি। তিন বছর আগে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন তাজমিরা। উপযুক্ত কোনো কাজ না পেয়ে গার্মেন্টস কারখানা বেছে নেন। মাসে বেতন পেতেন মাত্র ১০ হাজার টাকা। তার ওপর নির্ভরশীল ছোট দুই বোন স্কুলে পড়াশোনা করে। এই টাকায় ৫ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ কঠিন হয়ে পড়তো। বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলের বহু নারীর মতো তাজমিরাও জানেন না হংকং কোথায়। তার দুই বন্ধু তাকে বলেন, সেখানে তারা গৃহকর্মী হিসেবে মাসে ৪৫২০ হংকং ডলার উপার্জন করছেন। এই অর্থ বাংলাদেশে তাদের আয়ের প্রায় ৫ গুণ। শুনে তাজমিরাও হংকং যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বলেন, আমি বেশি অর্থ উপার্জন করতে চাই। আমার পরিবারকে সুন্দর জীবন উপহার দিতে চাই। এজন্য হংকং যেতে রাজি হয়েছি। নতুন দেশ নিয়ে খানিকটা দ্বিধা কাজ করলে কোনো ভয় পাচ্ছি না। তবে আমার পরিবারকে মিস করবো। হংকংয়ে কাজ করার জন্য বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে একটি প্রশিণ কেন্দ্রে প্রশিণি নিচ্ছেন তিনি। এখানে চাইনিজ রান্না ও ভাষা শিখছেন।
বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার গৃহকর্মী কাজ করছে। তাদের প্রায় অর্ধেক ফিলিপাইনের। বাকি অর্ধেক ইন্দোনেশিয়ার। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে নীতিনির্ধারণী জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার পর তাদের ওপর এেেত্র কতদিন নির্ভর করা যাবে তা পরিষ্কার নয়। হংকংয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ইন্দোনেশিয়ার গৃহকর্মী নেয়ার েেত্র কঠোরতা চান। সরকারি হিসাবে, হংকংয়ে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা। এজন্য আগামী তিন দশকের মধ্যে দেশটিতে বাড়তি ২ লাখ ৪০ হাজার গৃহকর্মী প্রয়োজন হবে।
অনলাইন চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, হংকংয়ে গৃহকর্মী প্রেরণের জন্য সেখানকার এজেন্সিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি চুক্তি হয়। ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি গৃহকর্মী হংকং যাওয়া শুরু করে। এর মধ্যে দিয়ে আশা করা হয়েছিল, দেশটির গৃহকর্মীর যে সংকট তা পূরণ করতে পারবে বাংলাদেশ। কিন্তু বিপুল পরিমাণ গৃহকর্মী পাঠানোর প্রত্যাশায় তেমন সাড়া মেলেনি। হংকং ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টের তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশি মাত্র ২৭৫ জন গৃহকর্মী গিয়েছেন সেখানে। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ৫৯৪। ২০১৫ সালে ৬৫০। ২০১৬ সালে ৫১৭। ২০১৭ সালে ৫০৭। ২০১৮ সালে ৫০১ এবং এ বছর ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত এ সংখ্যা ৫০৭।
হংকং গমনে ইচ্ছুক নারী ও এজেন্সিগুলো বেশ সমস্যায় পড়ছেন। যে কারণে হংকংগামী গৃহকর্মীর সংখ্যা কম বলে জানালেন রিক্রুটমেন্ট বিষয়ক কোম্পানি ইউনিভার্সেল ওভারসিসের ঢাকা অফিসের প্রধান নির্বাহী জিয়াউর রহমান। তিনি বলেন, হংকংয়ে বাংলাদেশি নারীদের কাজ করার আগে ৩ মাসের একটি প্রশিণ নিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ভাষা ও রান্না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যারা যান তাদের জন্য এই প্রশিণের মেয়াদ মাত্র ১ মাস। ৩ মাস এসব নারীর জন্য লম্বা সময়। এ জন্য তাদের ঝরে পড়ার হার বেশি। তাই তার এজেন্সি কয়েক বছরে মাত্র ১০০ নারী গৃহকর্মী হংকংয়ে পাঠাতে পেরেছে।
বিদেশে নারী শ্রমিকদের গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানোর েেত্র মধ্যপ্রাচ্যকে আকর্ষণীয় হিসেবে দেখে এজেন্সিগুলো। ওই অঞ্চলে ১ একজন নারী শ্রমিককে পাঠিয়ে এজেন্সিগুলো আয় করে ৪০০ ডলার থেকে ৫০০ ডলার। যেখানে হংকংয়ের েেত্র এজেন্সির আয় হয় ১০০ ডলার থেকে ১২০ ডলার।
তারপরও নারীদের সমৃদ্ধি ও ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে গৃহকর্মী পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। তাদের প্রশিণ দেয়া হচ্ছে। এজেন্সিগুলোতে খবর নিয়ে জানা গেছে, হংকংয়ে বাংলাদেশি নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া খুব বেশিদিন হয়নি। এ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণাও অনেক কম। তবে হংকংয়ের বাজার নিয়ে এজেন্সিগুলোর আগ্রহ আছে। ১০ বছর আগেও এদেশের নারীদের কাজ করতে বিদেশে যাওয়ার অনুমোদন দেয়া হতো না। কারণ বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। বিদেশে গিয়ে কাজ করার েেত্র এখানে নারীদের বিষয়ে রণশীলতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি পুরো বদলে গেছে। যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া নারী গৃহকর্মীদের মধ্যে শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগই যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন রকম নির্যাতনের শিকার হন সেখানে হংকংয়ের চিত্র পুরোটাই উল্টো। হংকং নিরাপদ ও সভ্য একটি দেশ। এজন্য মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে হংকং একটি প্রত্যাশিত গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
তাজমিরা যেখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তার নাম এভারগ্রিন হাউজকিপারস ট্রেনিং সেন্টার। এর মালিক ফেলিক্স চ্যাং ইয়োই-চোং। তিনি বলেন, হংকংয়ের মানুষের কাছে বাংলাদেশি গৃহকর্মীরা চাহিদায় অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। ২০১৩ সালে প্রথম দফায় যাদের পাঠানো হয়েছে তারা প্রশিতি ছিলেন না। ফিলিপাইনের গৃহকর্মীরা ইংরেজিতে পারদর্শী। পক্ষান্তরে বাংলাদেশি নারীরা ইংরেজিতে ততটা দক্ষ নন। গৃহকর্ম বলতে কি বোঝায় বাংলাদেশি অনেক গৃহকর্মী জানেন না। তা সত্ত্বেও আগামী দিনগুলোতে হংকংয়ে বাংলাদেশি গৃহকর্মী বাড়বে। ফিলিপাইন চীনে তাদের গৃহকর্মী পাঠাতে চেষ্টা করছে। এতে বাংলাদেশি গৃহকর্মীদের প্রচুর চাহিদা সৃষ্টি হবে। ফলে তাদের পাঠানো গৃহকর্মীর ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। এজন্য হংকংয়ে গৃহকর্মী পাঠানোর বাণিজ্যে তিনি ১০ লাখ হংকং ডলার বিনিয়োগ করেছেন।
এরই মধ্যে চীনে ফিলিপিনো গৃহকর্মী পাঠানো নিয়ে আলোচনা করেছেন ফিলিপাইন ও চীনা কর্মকর্তারা। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে বিদেশি হিসেবে হংকং ও ম্যাকাও থেকে চীনের নির্বাচিত কিছু শহরে বিদেশি গৃহকর্মী নিয়োগ দেয়া অনুমোদিত।
হংকংয়ে বাংলাদেশি গৃহকর্মী নিয়োগ দেয়ার জন্য অনুমোদিত প্রথম হংকংভিত্তিক এজেন্সি টেকনিক এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস সেন্টার। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তেরেসা লিউ সুই-লান। তার মতে, গৃহকর্মী নিয়োগ দেয়ার েেত্র একটি সমস্যা আছে। প্রথম দফায় যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তাদের অনেকেই কয়েক দিনের মধ্যে নিয়োগকারীর কাছ থেকে পালিয়ে অবৈধভাবে কাজ করছেন। কেউ রেস্তরাঁয় কাজ করেন। হংকংয়ে গৃহকর্মীদের মাসে সর্বনিম্ন বেতন ৪৫২০ হংকং ডলার। কিন্তু রেস্তরাঁয় কাজ করে তারা অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারেন।
সুই-লান বলেন, এর প্রভাব পড়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানের ওপর। গৃহকর্মীরা পালিয়ে যাওয়ায় কায়েন্ট নাখোশ হন। তাই হংকংয়ের খুব কম এজেন্সি এখন বাংলাদেশি গৃহকর্মী নিচ্ছে।
তবে এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে সরকার। হংকংয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মেহদি হাসান কিছু গৃহকর্মীর হংকংয়ে অবৈধ উপায়ে কাজ করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এমনটা আর ঘটবে না। গৃহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রা করতে ২০১৫ সালে কনসুলেট একটি লেবার অফিস স্থাপন করেছে। ৩ বছরের মধ্যে হংকংয়ে বাংলাদেশি গৃহকর্মীর সংখ্যা ১০০০ এ দাঁড়াবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মেহদি হাসান। এ বিষয়ে তিনি হংকংয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা কেরি লাম চেয় ইউয়েত-নগর এবং ম্যাথিউ চিউং কিন-চুং-এর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
হংকংয়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অপরদিকে বাংলাদেশ হচ্ছে তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। তাই দ গৃহকর্মীর জন্য একটি উত্তম উৎস হতে পারে বাংলাদেশ। তবে এক্ষেত্রে হংকং যাওয়া বাংলাদেশি নারীরা যাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও বেতন বৈষ্যমের শিকার না হন সেজন্য সচেষ্ট থাকতে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রিক্রুটিং এজেন্সিসহ মানবাধিকার নেতারা। তারা বলছেন, উন্নত বাংলাদেশ গড়তে এবং বেকার সমস্যা নিরসনে বিদেশে দক্ষ জনগোষ্ঠী পাঠানোর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের জনসংখ্যাকে জন সম্পদে পরিণত করার এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এজন্য সরকারের যথাযথ তদারকি ও সদিচ্ছা প্রয়োজন।