খেলা

বিশ্বকাপ না বৃষ্টিকাপ!

নিজস্ব প্রতিবেদক
বৃষ্টির বাগড়ায় এবারের বিশ্বকাপে একের পর এক ম্যাচ পরিত্যক্ত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ, দণি আফ্রিকা-ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর সর্বশেষ ভারত বনাম নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার ১৩ জুনের খেলাটিও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বিশ্বকাপের মতো এত বড় আসরে একের পর এক ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়াতে হতাশ খেলোয়াড়, সমর্থক, সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমী থেকে শুরু করে সেলিব্রেটিরাও। এ নিয়ে রসিকতা করে বিশ্বকাপের এবারের আসরটিকে ‘বৃষ্টিকাপ’ (!) বলেও অভিহিত করছেন কেউ কেউ।
ক্রিকেটভক্ত বলে আলাদা পরিচয় আছে ভারতের বিগ বি খ্যাত অমিতাভ বচ্চনের। এবারের বিশ্বকাপে ভারতের ম্যাচ প- হওয়াতে ভীষণ বিরক্ত এই তারকাও। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে তিনি লিখেছেন, টুর্নামেন্টটি ভারতে সরিয়ে আনা হোক।
অমিতাভের এমন টুইটে কেউ কেউ মনে করছেন ভারতে তীব্র দাবদাহের প্রতি ইঙ্গিত করতেই এমনটা করেছেন তিনি। আবার আইসিসির মতো একটি বড় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বকাপ আয়োজনে বৃষ্টির বাগড়া মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকার বিষয়ে কটা করেছেন তিনি Ñ এমন ধারণাও অনেকের। কেননা ভারতে বৃষ্টি মোকাবিলা করে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে খেলা শুরু করার সমতা রয়েছে।
বৃষ্টির মৌসুমে বিশ্বকাপ আয়োজনকে ব্যঙ্গ করেছেন খোদ ইংল্যান্ডেরই সাবেক অধিনায়ক কেভিন পিটারসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে হাস্যকর একটি ছবি পোস্ট করেছেন তিনি। তাতে দেখা গেছে, ব্যাটসম্যান ব্যাটিং করছেন, পেছনে ক্যাচ ধরার অপোয় উইকেটরক। আর এই খেলাটি হচ্ছে পানির নিচে মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরে। ছবিটির ক্যাপশন দেয়া হয়েছে, ‘ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফাইনাল ২০১৯’!
শুধু তাই নয়, কেউ আইসিসির বিশ্বকাপ লোগোতে ফটোশপ করে ছাতা লাগিয়ে দিয়েছেন। কেউ আবার মাঠে ক্রিকেটারদের সাঁতার কাটার ছবি পোস্ট করেছেন!
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এতদিন খেলা শুরুর আগেই ম্যাচ ভেসে গিয়েছিল মাত্র দুটি। অথচ এবারের বিশ্বকাপে এখনই তিন-তিনটি ম্যাচ পরিত্যক্ত টস হওয়ার আগেই। সব মিলিয়ে ভেসে গেছে চার-চারটি ম্যাচ, যা কিনা যেকোনো বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিত্যক্তের রেকর্ড। ১৯৭৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বৃষ্টিতে ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছিল ৯টি।
১৩ জুন ভারত-নিউজিল্যান্ডের ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। বৃষ্টিতে ভেসে গেছে সেটিও। তাতে ােভ ঝেড়েছেন ভারতীয় ফিল্ডিং কোচ শ্রীধর। তিনি জানান, মাঠ স্কেটিং রিংয়ের মতো পিচ্ছিল হয়ে পড়েছিল। এখানে খেললে চোটে পড়ার শঙ্কা ৯০ শতাংশ।
অথচ বৃষ্টি মোকাবিলা করেও খেলা শুরু করা যায় – তার উদাহরণ দেখিয়েছে ভারত। বৃষ্টির সময় পুরো মাঠ ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দিলেই বৃষ্টি শেষে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে খেলা শুরু করা যায়।
আইসিসি কেন পুরো মাঠ ঢাকার ব্যবস্থা করছে না এমন প্রশ্ন তুলেছেন ব্রায়ান লারা, সৌরভ গাঙ্গুলির মতো খ্যাতিমান ক্রিকেটাররা। পুরনো আমলের মতো পিচ আর বোলিং মার্ক কাভার দিয়ে ঢেকে পুরো মাঠ উন্মুক্ত রাখার সমালোচনা করেছেন তারা। শুধু তাই নয়, কলকাতার ইডেন গার্ডেনসের উদাহরণও দিয়েছেন ব্রায়ান লারা। তিনি জানিয়েছেন, বৃষ্টি হলেও কিভাবে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ম্যাচ শুরু করা যায়, ইডেন থেকে আইসিসির তা শেখা উচিত। এতগুলো ম্যাচ বৃষ্টিতে প- হওয়ার পরও আইসিসির বোধোদয় না হওয়ায় বিস্মিত এই তারকা খেলোয়ার।
উল্লেখ্য, বৃষ্টির সময় শুধু বোলিং মার্ক আর পিচ নয়, পুরো মাঠ ঢাকার মতো আচ্ছাদন রয়েছে ইডেন গার্ডেনে। সৌরভ গাঙ্গুলি তো চোখে আঙ্গুল দিয়েই দেখিয়ে দিয়েছেন ইংলিশ ক্রিকেট বোর্ডকে। পুরো মাঠ ঢাকার কাভার ইংল্যান্ড থেকেই কিনেছিল ভারত Ñ এমন তথ্য প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ভারতের অনেক মাঠের মতো পুরো ইডেন ঢাকার কাভার রয়েছে। মজার ব্যাপার, আমরা এগুলো ইংল্যান্ড থেকেই কিনেছি। অথচ তাদেরই কিনা মাঠ ঢাকার পর্যাপ্ত কাভার নেই।
বিশ্বকাপের মাঝপথে এসে তাই আইসিসিকে সাহায্য করতে চান সৌরভ গাঙ্গুলি। তিনি বলেন, আমরা ইংল্যান্ড থেকেই কাভারগুলো কিনেছি। সেগুলো চাইলে ইংল্যান্ডে আনা যায়। তাতে অর্ধেক খরচ পড়বে আর ট্যাক্সও লাগবে না। এগুলো ব্যবহার করে বৃষ্টি শেষে ১০ মিনিটের মধ্যে ম্যাচ শুরু করতে পেরেছিলাম আমরা।
২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল ভারত। তখন বর্ষাকালও নয়। তারপরও বৃষ্টিতে ম্যাচ ভেসে যাওয়া ঠেকাতে একেকটি কাভার ১ কোটি রুপিতে কিনেছিল বিসিসিআই।
ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের কি তবে টাকার অভাব? বিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি অনুরাগ ঠাকুর এ নিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছেন, ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমরা আইসিসির কাছ থেকে যত টাকা পেয়েছিলাম ইংল্যান্ড এবার পেয়েছে এর তিনগুণ। এরপরও জুনে বৃষ্টির শঙ্কা জেনে পুরো মাঠ ঢাকার ব্যবস্থা করেনি তারা।
১৯৭৫, ১৯৭৯ ও ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ হয়েছিল ইংল্যান্ডে। তিন-তিনটি আসরে শুধু ১৯৭৯ সালে বৃষ্টিতে ভেসেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ-শ্রীলঙ্কার একটি ম্যাচ। খেলা শুরুর আগেই ম্যাচ ভেসে গিয়েছিল মাত্র দুটি। প্রথমটি ১৯৭৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-শ্রীলঙ্কা, অপরটি ২০১৫ সালে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার। খেলা শুরুর পর ১৯৯২ ও ২০০৩ বিশ্বকাপে পরিত্যক্ত হয়েছিল সর্বোচ্চ সমান দুটি করে ম্যাচ। এবার প্রথম রাউন্ডেই পরিত্যক্ত চারটি ম্যাচ। বৃষ্টির যা পূর্বাভাস তাতে আরো বেশি ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার শঙ্কা আছে। তা হলে বৃষ্টিভাগ্যই কি নির্ধারণ করবে এবারের বিশ্বকাপ কার হাতে যাবে?