প্রতিবেদন

হাইকোর্টে রেকর্ডসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির অনন্য নজির

আদালত প্রতিবেদক
সরকারের সদিচ্ছা, আইন মন্ত্রণালয়ের সহায়তা ও বিচার বিভাগের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে সম্প্রতি মামলা নিষ্পত্তির হার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে অমীমাংসিত ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তির হার যথেষ্ট পরিমাণে কমেছে। ১৯৯৪ সালে এই হার ছিল ৫২.১২ শতাংশ, ১৯৯৫ সালে নিষ্পত্তির এই হার ৫৬.৬৬ শতাংশে উন্নীত হয়। ১৯৯৭ সালে তা ৪৬.৮৮ শতাংশে হ্রাস পায়। ২০০২ সালে তা ৫০.১৬ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০০৪ সালে ৪০.০০ শতাংশ, ২০০৫ সালে ৩৭ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৩৪.০০ শতাংশ, ২০০৯ সালে ৩২.০০ শতাংশ, ২০১২ সালে ৩৫.০২ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে তা আরো কমে ৩৫.০০ শতাংশে নেমে আসে।
এ সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী উচ্চ আদালতে গত ৫ মাসে রেকর্ডসংখ্যক মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হাইকোর্টের ১৬টি দ্বৈত বেঞ্চের বিচারপতিরা নিষ্পত্তি করেছেন অর্ধ লাখের বেশি ফৌজদারি মামলা। এছাড়া রিট ও দেওয়ানি অন্য বেঞ্চগুলো প্রায় কয়েক হাজার মামলা নিষ্পত্তি করেছেন, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
সূত্রমতে, মামলা দায়েরের বিপরীতে এই প্রথম নিষ্পত্তির হারও বেশি। বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এটাকে আশার আলো হিসেবে দেখছেন।
সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেছেন, আমাদের দেশে অপরাধ করে কেউ দোষ স্বীকার করতে চায় না। সবাই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে, যার কারণে ৯০ ভাগ মামলাই বিচারে যাচ্ছে। আর ১০ ভাগ মামলা ট্রায়ালে যাচ্ছে না। বিচারে যাওয়ার যে সংস্কৃতি এটার পরিবর্তন না হলে মামলার জট লেগেই থাকবে।
তিনি বলেন, আমরা শিতি হচ্ছি, মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে, এখন যদি দোষ স্বীকারের সংস্কৃতি চালু হয় তাহলে মামলাজট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের মাসিক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সাল শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলা ছিল ৫ লাখ ১৬ হাজার ৬৫২টি। চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়েছে ২৯ হাজার ৭৭৭টি। এই ৩ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ৮১১টি মামলা। এর আগে গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে ২৫ হাজার ২৬৩টি। এ সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৬ হাজার ৩০৬টি মামলা।
মামলা দায়েরের বিপরীতে নিষ্পত্তির হার না বাড়ায় তা ভাবিয়ে তুলছিল বিচার প্রশাসনকে। এ নিয়ে বৈঠকও হয়। পরে প্রধান বিচারপতি মামলাজট কমাতে পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টের ১৬টি দ্বৈত বেঞ্চকে ১ লাখ ১ হাজার ১৯৬টি মামলা নিষ্পত্তির জন্য পাঠান তিনি। পরে এসব বেঞ্চের বিচারপতিগণ ৫৭ হাজার ৬০৯টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫ লাখ ৬ হাজার ৬৬৪টি। এর আগে ২০১৫ সালে ৩৭ হাজার ৭৫৩টি, ২০১৬ সালে ৩৯ হাজার ৮৭৮টি, ২০১৭ সালে ৩৫ হাজার ৪৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয় হাইকোর্টে।
প্রসঙ্গত, দেশের অধস্তন ও উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তির হিসাব রাখে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। তারা প্রতি ৩ মাস পরপর মামলার মাসিক বিবরণী প্রকাশ করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এভাবে উচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হতে থাকলে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, সৈয়দ মাহমুদ হোসেন প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলাজট নিরসনে বেশকিছু পদ্ধতি অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এর ফলে দ্রুত মামলাজট হ্রাস পাচ্ছে।