প্রতিবেদন

কঠোর অবস্থানে দুদক: কোনো অপরাধীকেই ছাড় না দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার পর অনমনীয় কঠোর অবস্থান নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। দুর্নীতিবাজ যত বড় এবং যে দলেরই হোক না কেন, তাকে কোনো ছাড় নয় Ñ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন নির্দেশনার পর থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান আরো জোরালো করেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। শুধু তাই নয়, নিজেদের কোনো কর্মচারী-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠামাত্র তার বিরুদ্ধেও কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিচ্ছে দুদক। তারই প্রমাণ মিললো প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচালককে সম্প্রতি সাময়িক বরখাস্ত করার মধ্যে দিয়ে।
পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানের কাছে তথ্য ফাঁস করায় দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করছে দুদক। গত ১০ জুন বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় প্রধান কার্যালয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ এ তথ্য জানান।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় কমিশনের সচিব দিলওয়ার বখতকে প্রধান করে ৯ জুন ৩ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুদক পরিচালক এনামুল বছিরকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ইকবাল মাহমুদ আরও জানান, ডিআইজি মিজানুর রহমানের দুর্নীতির তদন্ত থেকে এনামুল বছিরকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কমিশনের তথ্য পাচার এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।
জানা যায়, ডিআইজি মিজানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এতদিন জব্দ থাকলেও বিপুল পরিমাণ টাকার উৎস তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে দুদক। এছাড়াও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের মুখে থাকা ডিআইজি মিজানুর রহমান দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার যে অভিযোগ তুলেছেন, তার তদন্তে কমিটি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। বিতর্কিত ডিআইজি মিজান ৯ জুন একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেন। টেলিভিশনে প্রচারিত ওই বিশেষ সংবাদে ঘুষ লেনদেনের পক্ষে ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মোবাইল কথোপকথনের কয়েকটি অডিও ক্লিপও শোনানো হয়। দুদক পরিচালক অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে ফরেনসিক পরীক্ষায় এই কথোপকথনের সত্যতা পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য যে, গত বছর নারী নির্যাতনের অভিযোগে তৎকালীন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার পদ থেকে ডিআইজি মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর তার বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের তথ্য প্রকাশ পেলে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে দুদক। এই তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। তবে তদন্ত চলাকালেই প্রাপ্ত তথ্য অভিযুক্তের কাছে চালান করে দিয়ে আপসরফার মাধ্যমে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেন তিনি। ডিআইজি মিজান নিজেই এমন অভিযোগ করেছেন দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, মিজানের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছিলেন দুদক পরিচালক এনামুল। তবে পরবর্তীতে ডিআইজি মিজানের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দুদক পরিচালক এনামুলের সঙ্গে তার চুক্তি হয় টাকার বিনিময়ে মিজানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাইয়ে দেবেন। তবে টাকা নিয়েও শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দেন এনামুল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অবৈধ লেনদেনের এ ঘটনা দুদকের কাছে ফাঁস করেন ডিআইজি মিজান। এদিকে এক দুদক কর্মকর্তাকে ‘ঘুষ দেয়ার কথা’ ফাঁস করে নতুন করে আলোচনায় আসা পুলিশের উপমহাপরিদর্শক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘আইন অনুযায়ী শাস্তির’ ব্যবস্থা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠায় গত বছরের জানুয়ারিতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় মিজানকে। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়, ডিআইজি মিজানের ব্যক্তিগত কোনো কাজের দায় পুলিশ বাহিনী নেবে না। পুলিশ হিসাবে বাড়তি কোনো সুযোগও তিনি পাবেন না। দোষী প্রমাণিত হলে সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত কমিটি ডিআইজি মিজানুর রহমানের ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ১৭ জুন ‘উচ্চ পর্যায়ের’ একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি মইনুর রহমান চৌধুরীর (অ্যাডমিন অ্যান্ড অপারেশনস) নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ওই কমিটি ‘ঘুষের অর্থের উৎস’ জানতে ইতোমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা। অতিরিক্ত আইজিপি (ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) শাহাবুদ্দীন কোরেশী ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এসপি মিয়া মাসুদ হোসেন ওই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দুদক পরিচালক এনামুল বাছিরকে সাময়িক বহিষ্কার এবং তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করার মধ্যে দিয়ে দুদক নিজেদের অনমনীয় অবস্থানেরই একটি স্পষ্ট বার্তা দিল। পাশাপাশি ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও আমলে নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ সদরদপ্তর এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে দুদক। দুদক বলছে, ঘুষ দিয়েও শেষ রক্ষা হবে না ডিআইজিপি মিজানের।
সরকার ও দুদক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি ঘরে-বাইরের দু’জন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সেরই স্পষ্ট বার্তা দিলো দুদক। এতে আশাবাদী হয়ে উঠছে দেশের সাধারণ মানুষ।

নতুন অডিও রেকর্ড ফাঁস
পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত থেকে নিষ্পত্তি পেতে সরাসরি ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘুষ লেনদেন করেছেন। গোপনে ধারণ করা কিছু অডিও রেকর্ডে সে প্রমাণ উঠে এসেছে। তা সম্প্রতি ফাঁস করেছে দেশের একটি অনলাইন পোর্টাল। ঘুষ লেনদেনের সাথে ডিআইজি মিজানকে সহযোগিতা করেন আব্দুল দয়াছ নামে লন্ডন প্রবাসী এক ব্যবসায়ী। ফাঁস হওয়া এসব অডিওতে দুদক কর্মকর্তা এনামুল বাছির ছাড়াও এলপিআরে থাকা দুদক পরিচালক আব্দুল আজিজ ভুঁইয়া ইকবাল, শফিক, নাসিম, জাহিদ ও পাটোয়ারির নাম এসেছে। তারা এসব আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে দুদক এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।