সাহিত্য

গল্প : লক্ষ্যভেদ

মো. হারুন অর রশিদ
পারুলের মা যখন মারা যায় তখন ওর বয়স ৮ বছর। গ্রামের পাঠশালায় পারুল তখন তৃতীয় শ্রেণিতে। ওর মা মাত্র ৩ দিন কলেরায় ভুগে মারা যায়। গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার ফজর আলী ওষুধ দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না, টাকার অভাবে জেলা সদরের হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয়নি। অশিক্ষা আর অজ্ঞতা রোগীর সুচিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হয়। তাই সামান্য কলেরায় ওর মা ইহলোক ত্যাগ করে, মেয়েকে এতিম বানিয়ে পরলোকে গমন করলেন।
তখন গ্রামে কলেরা মহামারী আকার ধারণ করলে অনেক প্রাণ বিসর্জন দিতে হতো। পাতলা পায়খানা আর অবিরাম বমি হয়ে শরীর নিস্তেজ করে ফেলে কিন্তু টাকার অভাবে কেউ সুচিকিৎসা দিতে না পারলে অনেকগুলো মানুষের প্রাণ হারিয়ে যেত।
মায়ের মৃত্যুতে পারুলের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। সংসারে যার মা নেই সে-ই বুঝতে পারে মা কত আপনজন, কত বড় অবলম্বন। স্কুলে যেতে পারে না পারুল, ঘরেও ওর মন বসে না, সারাক্ষণ মায়ের স্মৃতি ওকে তাড়া করে ফেরে। যে মা ওকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতো, গোসল করিয়ে ফিট্ফাট করে স্কুলে পাঠাতো, সেই মা ছাড়া ও আজ সম্পূর্ণ একা। সারাক্ষণ মায়ের ব্যবহার্য জিনিসপত্র বুকে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
মেয়ের কান্নায় বাবা গহেরের বুক ফেটে যায়। স্ত্রীর জন্য মনের মধ্যে জমানো সব ব্যথা ডুকরে ডুকরে ওকে বিষাদের সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কলিজার টুকরো মেয়েকে নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় দিন কাটে। সে মেয়েকে মায়ের আদর দিয়ে মানুষ করতে উদ্যোগী হয়। কিন্তু সে তো পুরুষ মানুষ, কতটুকুই বা পারে মেয়েকে আদর-স্নেহ দিতে, মায়ের অভাব পূরণ করতে।
এদিকে মাকে হারিয়ে মেয়ে যখন পাগলপ্রায় তখন সবাই পারুলের বাবা গহেরকে বুঝিয়ে পুনরায় বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। সকলের প্রস্তাবকে সে তাচ্ছিল্যের সাথে উড়িয়ে দেয়। তার স্ত্রীর রেখে যাওয়া আমানতকে সে কোনোভাবেই ঘরে সৎ মা এনে কষ্ট দিতে পারবে না। সবাই বুঝায়, ‘সব সৎমাই তো খারাপ হয় না, মাইয়াডারে দেখাশোনার লাইগাও তো একজন লোক দরকার। সে একলা মানুষ কিভাবে সব দিক সামাল দিবে। সে ছাড়া তো এই ছোট্ট মাইয়াডাকে দেখার কেউ নেই ওর সংসারে।’
গহের আলী কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে আত্মীয়স্বজনের অনুরোধে, শুধু মেয়েকে মানুষ করার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করতে রাজি হলো।
গহের আলী বিয়ের পর বাসর রাতে তার একমাত্র বুকের ধন কলিজার টুকরা মেয়ে পারুলকে নববধূর হাতে তুলে দেয়, যেন ওর কোনো কষ্ট না হয়। নিজের সন্তান মনে করে ওকে যেন আদরযতœ করে। সে নবপরিণীতা স্ত্রীকে বলে, শুধু মাইয়াডাকে মানুষ করণের লাইগাই সকলের কথায় পুনর্বার বিয়ে করতে রাজি হইছি। তাই আমার মাইয়াডারে কোনো কষ্ট দিও না, কথা দাও নতুন বউ।’
নতুন বউ সানন্দে সম্মতি জ্ঞাপন করে, ‘হুঁ, কথা দিলাম আমি আমার আপন মাইয়ার মতনই ওরে মানুষ করুম। আপনি কোনো চিন্তা কইরেন না।’
শুনে গহের স্বস্তি পায়।
ঘরে সৎমা এসে প্রথমে পারুলকে নিজের মেয়ে হিসেবে মেনে নেয়, পারুল স্কুলে যায় লেখাপড়া করে। বরাবরই পারুল লেখাপড়ায় খুবই ভালো। তাই শিক্ষকরা ওকে খুব স্নেহ করেন। অংকে সবসময় ১০০ তে ১০০ পায়। শ্রেণিতেও সব সময় প্রথম হয়। ও যখন পঞ্চম শ্রেণিতে উঠলো তখনই ওর সৎ মায়ের কোলজুড়ে এক পুত্র সন্তানের আগমন ঘটলো আর পারুলের কপালও পুড়লো। আস্তে আস্তে সৎ মায়ের আসল চেহারা প্রকাশ পেতে থাকে। মা পারুলকে ঠিকমতো স্কুলে যেতে দেয় না, নানা ছুতোয় বাড়িতে আটকে রাখে, ছোট বাচ্চাটাকে দেখাশোনার ভার পারুলের ওপর ছেড়ে দেয়। ওর বাবাকে বুঝায়, মাইয়া মানুষের আবার এতো লেখাপড়া শিইখা কী হইবো? দুইদিন পরে তো শ্বশুর বাড়িতে চইলা যাইবো, সেইখানে তো সেই হেঁসেলেই ঢোকা লাইগবো, তাই এতো পড়াইয়া কী হইবো ওরে? ও আমার সাথে সংসারের কাজ করুক। আমি ছোট ছেলেডারে নিয়া একলা পারি না।’
দিনমজুর বাবা কোনোমতে সংসার চালায়, তাই বউয়ের যে কষ্ট হচ্ছে তা বুঝতে পারে, বাড়তি কোনো কাজের মানুষ রেখে দেয়ার ক্ষমতা তার নাই। তবু বউকে বোঝায়, ‘ও যখন পড়তে চাইতাছে আর এক ক্লাস পাস দিলেই তো প্রাইমারি শেষ হইবো। তাই অন্তত এ বছরডা পড়–ক।’
নানা বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে প্রাইমারিতে ভালো রেজাল্ট করলো পারুল, কিন্তু ধারেকাছে কোনো উচ্চ বিদ্যালয় না থাকায় দূরের কোনো উচ্চ বিদ্যালয়ে মেয়েকে দিতে রাজি হলো না গহের আলী। আর সৎমা তো কোনোমতেই পড়াবে না মেয়েকে। পারুলের বুকের মধ্যে হু হু করে কেঁদে ওঠে ওর জীবনের লক্ষ্য, ‘ও লেখাপড়া শিখে মানুষ হবে, ডাক্তার হবে। ওর মা বিনা চিকিৎসায় ওর চোখের সামনে মারা গেছে। তাই ডাক্তার হয়ে অন্য কোনো মাকে যেন অকালে পারুলের মতো অবুঝ সন্তানকে এতিম বানাতে না পারে তাই সেবা দিয়ে রোগীকে সারিয়ে তুলবে।’
কিন্তু ওর সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এখন শুধু চোখের জল ফেলে আর সৎ মায়ের মুখ ঝামটা আর কটু কথা সহ্য করে, মুখ বুজে সংসারের কাজগুলো করে যায়। সৎমায়ের ইচ্ছে, আপদ বিদায় করতে পারলে বাঁচে, তাই স্বামীকে বোঝায় মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্য। পারুল দেখতে তেমন সুন্দরী না। গায়ের রঙ শ্যামলা; বরং কালোই বলা চলে। তাই পাত্র পাওয়াও মুখের কথা না। আত্মীয়স্বজনকে বলে রাখে, ভালো পাত্র পেলে মেয়েকে বিয়ে দেবে।
কোরবানীর ঈদে মোল্লাবাড়ির বড় ভাইজান সপরিবারে গ্রামে এসেছেন ঈদ করতে। মোল্লা বাড়িতে কাজকর্ম করেই গহেরের দিন চলে। ভাইজান খুব অমায়িক মানুষ, গহেরকে স্নেহ করেন। সেই ভাইজান তার বাসার জন্য একটা কাজের মেয়ে খুঁজছে। বড় বিবি গহেরকে ডেকে বললেন, ‘গহের, তোর মাইয়াডা তো লেখাপড়া বাদ দিয়া ঘরে বইসা আছে, আমার বড় খোকার বাসার জন্য তোর মাইয়াডাকে দিয়ে দে, খুব ভালো থাকবো, মাসে মাসে বেতন দিবো, কাপড়চোপড় দিবো, তোরাও কাপড়চোপড় পাইবি।’
গহের কাচুমাচু করে বলে, ‘আম্মা, মাইয়ারে তো বিয়ে দেওনের জন্য ছেলে দেখতাছি।’
রেগে গিয়ে মোল্লা গিন্নি বললেন, ওরে হারামজাদা, এতটুকুন বাচ্চা মাইয়াকে বিয়ে দিবি কিরে? দেশের আইনকানুন কী কিছু জানোস? আঠারো বছরের কম বয়সের মাইয়া বিয়া দিলে জেলে যাওন লাগবো, বুজছোস? তারচেয়ে তোর বড় ভাইজানের বাসায় দিলে দুইডা ভালা-মন্দ খাইতেও পারবো, ভালা ভালা কাপড়চোপড় পিন্দতেও পারবো। আর তোরাও নগদ কিছু ট্যাকা পাইবি।
গহের আর কী বলবে, বাড়িতে পরামর্শ করে পরে জানাবে বলে আসে। বাড়িতে এসে বউয়ের সাথে আলাপ করে, ‘কী করা যায় বলোতো? বড় বিবি পারুলরে তার বড় পুলার বাসায় কাজের জন্য চাইতাছে। কিন্তু নাও তো করতে পারি না, আবার মাইয়াডারে কেমনে পরের বাড়িতে কাজে পাঠাই কওতো?
সব শুনে গহের গিন্নি এককথায় রাজি হয়ে বলে, ‘এই সুযোগ হাতছাড়া করেন ক্যান? হেরা বড়লোক, হেগো বাড়িতে পারুল ভালাই থাইকবো। মাইয়ারে দিয়া দেন, আমার আপত্তি নাই।’
মনে মনে গহের গিন্নি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, আপদ বিদেয় হলে সব একার মতো করে ভোগ করতে পারবে, তাই সে আরও উৎসাহ দেয় মেয়েকে কাজে পাঠানোর জন্য। গহের অবশেষে চোখের জলের মধ্যে দিয়ে মেয়েকে বড় ভাইজানের হাতে তুলে দেয়।
পারুল ঢাকায় এলো। জীবনে প্রথম ট্রেনে চড়লো, বাসে চড়লো। তারপর এতো বড় শহরে এসে সবকিছু দেখে তাজ্জব হয়ে গেলো। অবশেষে বাসার কাজের মেয়ে হয়ে ওর শহুরে জীবন শুরু করলো।
বেগম সাহেবাও খুব ভালো মানুষ, ওকে দিয়ে ভারী কাজ তেমন একটা করান না। তবু যতটুকু পারে ওর সাধ্যমতো চেষ্টা করে সব কাজ করতে। বাসার বড় আপা আর ছোট ভাইজান যখন কলেজে যায় তখন ওর বুকের ভেতর একটা বেদনা টন্টন্ করে ওঠে। ‘ইস্ যদি এভাবে স্কুলে যাইতে পারতাম।’ সন্ধ্যায় যখন ওরা পড়তে বসে তখন মনটা ছট্ফট করে বই পড়ার জন্য। ওর ইচ্ছের কথা কাউকে বলতে পারে না, জানাতে পারে না ওর মনের বেদনা।
যখন সময় পায় তখনই একটা বই নিয়ে পড়তে চেষ্টা করে। ওর ইচ্ছা হয় যদি ক্লাস সিক্সের কোনো বই পাওয়া যেতো তাহলে ও পড়তে পারতো। কিছুদিনের মধ্যে সেই সুযোগও পেয়ে গেল। বড় আপা একদিন লক্ষ্য করলো পারুল মাঝে মাঝে বই পড়ে আবার কোনো সময় সাদা কাগজ নিয়ে লেখালেখি করে। তাই পারুলকে জিজ্ঞেস করে, এই পারুল তুই কি পড়তে পারিস?
হ্যাঁ আপা, আমি তো ক্লাস ফাইভ পাস করছি।
পারুল উৎসাহের সাথে বলে।
তাই! তাহলে তো ভালোই। এক কাজ কর বাসায় ক্লাস সিক্সের বই খুঁজলে পাওয়া যাবে তুই আমার কাছে সন্ধ্যায় সব কাজ শেষ করে পড়তে বসবি, কেমন?’
তারপর কবির সাহেবের বড় মেয়ে লিজা পারুলকে পড়াতে শুরু করে দিলো। লিজা ভার্সিটিতে পড়ে। কিছুটা সংস্কৃতিমনা হওয়ার দরুণ ওকে সবাই সমীহ করে, স্নেহ করে। কবির সাহেবের ছেলে সুমন এবার ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা নিয়ে সে ব্যস্ত থাকে, কিছুটা রগচটা স্বভাবের। কবির সাহেবের স্ত্রী এমনিতে ভালো কিন্তু সামান্যতেই রেগে যান। তাই কিছুদিনের মধ্যে পারুলের সামান্য দোষ-ত্রুটি হলেই রাগারাগি শুরু করে দেন। সুমনও পারুলকে দু’চোখে দেখতে পারে না।
একদিকে পারুলের চেহারা দেখতে শ্যামলার ওপর একটু বেশ কালোই, তারপর গ্রাম থেকে এসেছে শহরের অনেক কিছুই এখনো রপ্ত করতে পারেনি। তাই মাঝে মাঝে ভুল করে ফেলে; যার জন্য ধমক আর রাগারাগি শুনতে হয়। ও সব মুখ বুজে সহ্য করে।
দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে যায়। পারুলও কঠোর পরিশ্রমের মাঝে যখনই সময় পায় তখনই বই নিয়ে বসে কিংবা লিখতে বসে। ওর হাতের লেখা চমৎকার। তাই লিজা ওকে উৎসাহ দেয়।
একদিন পারুল সাহস করে লিজাকে বলে, আপা আমারে কোনো রাইতের স্কুলে ভর্তি কইরা দেন না! আমি সব কাজ শেষ কইরা রাতের বেলায় পড়মু। আমার জন্য খালুজান যে বেতন দিবো তা আর দিতে হইবো না, আমার শুধু একটু লেখাপড়ার সুযোগ কইরা দেন।’
লিজা শুনে খুব খুশি হয়। এখন লেখাপড়ার বিকল্প নেই। মেয়েরা যদি একটু লেখাপড়ার সুযোগ পায় তাহলে নিজেকে যৎসামান্য স্বাবলম্বী করতে পারবে। ওকে যদি একটু সুযোগ দেয়া যায় তাহলে শিখুক না যতটুকু পারে। লিজা ওর বাবাকে সব বুঝিয়ে বলে, প্রস্তাবটা দেয়। বাবা পারুলের যে মেধা তাতে ওকে যদি স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করা যায় তাহলে একদিন মানুষ হবে। তুমি একটা ব্যবস্থা করে দাও না বাবা!
কবির সাহেব তার মেয়ের কথায় রাজি না হয়ে পারলেন না। লিজা ওর বাবা কবির সাহেবকে সাথে নিয়ে পাশের একটা বিদ্যালয়ে ওকে ভর্তি করে দিলেন। ওকে প্রতিদিন ক্লাস করতে হবে না শুধু মাসিক বেতন ঠিকমতো পরিশোধ করতে হবে, মাঝে মাঝে ক্লাস করতে হবে। বইও কিনে দেয় লিজা। কিন্তু কবির সাহেবের স্ত্রী এটা ভালোভাবে নিতে পারলেন না। তিনি চটে গিয়ে স্বামীকে বোঝান, কাজের মেয়ে কাজের মেয়ের মতোই থাকবে, তার আবার লেখাপড়া কিসের জন্য?
শিখুক না যা পারে একটু। তাছাড়া তোমার মেয়ে যখন চাচ্ছে মেয়েটা একটু লেখাপড়া করুক তাতে তোমার একটু কষ্ট হলেও চালিয়ে নিও। মেয়েটার দেখলাম বেশ মেধা আছে।
আরে ওদের মেধা দিয়ে কি আর ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাবে? সেই তো পরের বাড়ি ঝি গিরি করা নয়তো বিয়ে দিলে স্বামির ঘরে হাঁড়ি ঠেলার কাজই করতে হবে।
তা হোক তবু তোমার মেয়ে যখন চাইছে ও লেখাপড়া করুক। একটু চেষ্টা করে দেখুক না হয় কতটুকু পারে। দু’দিন পর আপনিই সব বাদ দিয়ে দেবে।
তারপর শুরু হলো পারুলের লেখাপড়া শেখার অভিযান। বাড়ির গিন্নির শত বাধা আর ভাইজানের উৎপীড়ন তার লেখাপড়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালো। তবু সে দমবার পাত্রী নয়। লেখাপড়া তাকে শিখতেই হবে, মানুষের মতো মানুষ হতেই হবে। তার মনে লুক্কায়িত স্বপ্ন ওকে কুড়ে কুড়ে খায়। একাকী নিরবে বসে বসে ভাবে, ‘ইস যদি আমি কোনো দিন ডাক্তার হইতে পারতাম তা হইলে অন্তত গরিব মানুষগুলানরে সেবা দিয়া রোগ সারাইতে পারতাম। কিন্তু গরিবের কপালে তো তা নাই তবু যতটুকু পারা যায় তা শিখতে হইবো।’
শত বাধা ওর সামনে তারপরও পারুলের অদম্য উৎসাহ আর উদ্দীপনা ওকে লেখাপড়ার শক্তি যোগায়। ওকে যেভাবে বাসার কাজে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয়, এতটুকু সময় হয় না বই নিয়ে বসার। শুধু সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন একটু বই নিয়ে পড়তে বসে। আবার সবাই যখন টিভি দেখে ওর সেই দিকে কোনো নেশা নেই। ওর নেশা শুধু একটু লেখাপড়া করা, তখন বই নিয়ে পড়তে বসে। অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করে পারুল। আবার খুব সকালে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন পারুল ঘুম থেকে উঠে বাসনকোসন ধোয়া, ঘর ঝাড়– দেয়া, চায়ের পানি চড়ানো, নাস্তা তৈরি করা সব যেন ওর এখন মুখস্থ হয়ে গেছে। ছুটা বুয়া আগে অনেক কাজ করতো, এখন সে শুধু কাপড় ধোয়া আর ঘর মোছার কাজটুকু করেই তার কাজ শেষ, বাকি সব কাজ পারুলকেই করতে হয়। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে রাতে আর লেখাপড়া করার মতো ধৈর্য্য থাকে না। তবু লেখাপড়া ঠিকই চালিয়ে যায়। তারপর ঠিকই স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে।
দেখতে দেখতে ৩টা বছর কেটে গেল। স্কুলের টিচাররা ওর লেখাপড়ার আগ্রহ আর ক্লাসের রেজাল্ট দেখে হতবাক হয়ে যান। ওর মাঝে একটা আশার আলোর স্ফুলিঙ্গ দেখতে পান। তাই ক্লাসটিচার প্রধান শিক্ষকের সাথে আলোচনা করে স্থির করে পারুলকে জুনিয়র বৃত্তি পরিক্ষা দেয়াবে। স্কুল থেকে সেই ব্যবস্থা করা হলো এবং পারুল অষ্টম শ্রেণিতে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা দিলো। পরীক্ষার দিনগুলোতে লিজা ওকে সাথে নিয়ে যেত আর সুমন নাক সিটকাতো, বোনকে তিরস্কার করতো।
তারপর জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ ওকে নিয়ে সংবর্ধনার আয়োজন করে, পুরস্কার দেয়। চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে যায়। সবাই ওকে বাহবা দেয়, একটা কাজের মেয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। সবাই ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সেই সাথে কবির সাহেবকেও সবাই ধন্যবাদ জানায়। কারণ এতো বড় কৃতিত্বের অধিকারী শুধু পারুল একা না। কবির সাহেবের বাসা থেকে যদি সেই সুবিধাটুকু না দেয়া হতো তাহলে তো ও পড়াশোনা করার সুযোগই পেতো না। সেই সাথে কবির সাহেবের মেয়ে লিজার অনুপ্রেরণাকে সবাই কৃতজ্ঞতার সাথে উল্লেখ করে। খবরের কাগজগুলোতে ফলাও করে ওর কৃতিত্বের কথা প্রচার করা হয়। তাই দেখে সমাজকল্যাণমূলক অনেক প্রতিষ্ঠান ওর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। শুধু কবির সাহেব ওকে আশ্রয় দিবেন, আর সব সহযোগিতা করবে নারী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান। তারা ওকে মানুষ করার জন্য সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ওকে আরও আর্থিক সাহায্য করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়।
সেভাবেই ও যাত্রা শুরু করলো, ওর এগিয়ে যাওয়ার পালা শুরু হলো।
বাসায় ও যেভাবে কাজ করছিল তাই করতে থাকে। মিসেস কবির আগের চেয়ে এখন অনেক উদার হয়েছেন পারুলের প্রতি। কারণ মেয়ের মধ্যে যে এতো প্রতিভা লুকিয়ে আছে তা তিনি আগে বুঝতে পারেননি। তাই এখন আর ওকে কাজের জন্য বেশি চাপ দেন না। যৎসামান্য কাজ ও করে তাতেই তিনি খুশি। কারণ এখন ওকে নিয়মিত ক্লাস করতে হয়, ক্লাস শেষে বাসায় এসে যা করতে হয় তার চেয়ে পারুল বেশিই করে থাকে। এসএসসি পরীক্ষার আগে কিছুদিন প্রাইভেট পড়তে হয় একটা কোচিং সেন্টারে। তার ব্যবস্থাও আপামণি করে দেন।
এসএসসি পরীক্ষায় সবাইকে চমকে দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের মেয়েদের মধ্যে দ্বিতীয় এবং সম্মিলিত মেধা তালিকায় ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে কাজের মেয়ে পারুল। জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্র ও মিডিয়ার সংবাদকর্মী, ক্যামেরাম্যানরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে কবির সাহেবের বাড়িতে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ওর সাক্ষাৎকার নেয়, সব পত্রিকাতে পারুলের ছবি ছাপা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে ওর চোখে জল এসে যায়। ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। কেঁদে কেঁদে বলে, আজ আমার এই ভালো রেজাল্টের জন্য আমার লিজা আপুর অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনি আমাকে উৎসাহ দিয়ে অনুপ্রেরণা দিয়ে লেখাপড়ায় উদ্বুদ্ধ করেছেন।
বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার আশা ব্যক্ত করে পারুল।
গ্রাম থেকে ওর বাবা আর সৎ মা ছুটে আসে ঢাকায়। তারাও মেয়ের এতো বড় সাফল্যে আশ্চর্য হয়ে যায়।
তারপর কলেজে ভর্তি হওয়া। এখন পারুল আর কাজের মেয়ে নয়, সবাই এখন ওকে পরিবারের একজন সদস্য বলেই মনে করে। কিন্তু একজন ওকে আড়চোখে দেখে আর মুগ্ধ হয়। এখন পারুলের গায়ের রঙ আর আগের মতো কালো নেই, ফুটন্ত যৌবনের আলোকরশ্মির মতো উদ্ভাসিত হয়ে উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করেছে। তাই মাঝে মাঝে সুমনের মনে কোথায় যেনো ঝড় ওঠে। মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকে পারুলের দিকে আর ভাবে, সেদিন অজপাড়াগাঁয়ের মেয়ে শহরে এসে ঠিকই ওর প্রতিভার উপযুক্ত স্বাক্ষর রেখেছে। তাই যতটুকু সহযোগিতা করার দরকার তারচেয়ে এখন একটু বেশিই করে, ওর হৃদয়ের তন্ত্রীতে যে সুর বাজে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। পারুলের প্রতি এখন সুমনের নজর একটু সৌহার্দপূর্ণ ও সহানুভূতির আবেশ মাখানো। মাঝে মাঝে সুমনের মটরসাইকেলের পেছনে পারুলের স্থান হয়েছে কলেজে পৌঁছে দেয়ার জন্য।
দেখতে দেখতে এইচএসসি পরীক্ষা এসে গেল। কঠোর পরিশ্রম আর নিয়মিত লেখাপড়া করে পরীক্ষা দিলো পারুল। এইচএসসিতেও মেধা তালিকায় অষ্টম হয়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যায়। মায়ের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু ও নিজের চোখে দেখেছে তাই আর কোনো মাকে বিনা চিকিৎসায় যেন মরতে না হয়। শত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে কঠোর পরিশ্রম করে ডাক্তারি পড়ায় মনোনিবেশ করে। পারুল আর এখন গ্রামের সেই কালো মেয়েটি নেই, এখন আর ওকে কালো মেয়ে বলে কেউ অবজ্ঞা করে না, ও এখন বেশ ফর্সা।
দেখতে দেখতে কত জল গড়িয়ে গেলো নদী থেকে সমুদ্রে আর এই নব জাগরণে পারুলের জীবনে কখন যে সুমনের প্রবেশ ঘটেছে তা সে নিজেও জানে না। সুমন ভাই আর আগের মতো ওকে দেখে তাচ্ছিল্য করে না, বরং কেমন যেন মায়াভরা মুখে মুগ্ধ নয়নে ওকে আহ্বান করে কাছে টানে। তাই একদিন নিজেকে সমর্পণ করে সুমনের কাছে। ওর হৃদয়ের অপ্রকাশিত বাসনাগুলো একসময় প্রকাশিত হয়ে ধরা দেয় নিজের অজান্তেই।
ডাক্তারি পাস করে মানুষের সেবা করার ব্রত নিয়ে আত্মনিয়োগ করে। সে জন্য সেবার পেশাকেই বেছে নেয় ডা. পারুল আকতার। তারপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ হাসপাতলের গাইনি বিভাগে যোগদান করে। ওর অদম্য স্পৃহা আর অধ্যবসায় ওর সাফল্যের শিখরে তুলে দিয়েছে। তারপর যে ভাইজান ওকে দেখতে পারতো না সেই ভাইজানের অর্ধাঙ্গনী, কবির সাহেবের পুত্রবধু হয়ে থেকে যায় পারুল ‘কবির মহলেই।’