প্রতিবেদন

দিনাজপুরে দেশের প্রথম লোহার খনি আবিষ্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক
কয়লা ও কঠিন শিলার পর দিনাজপুরের মাটির নিচে এবার সন্ধান মিললো লোহার আকরিকের। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো লোহার খনির সন্ধান পেলো বাংলাদেশ।
দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার ইসবপুর গ্রামে লোহার আকরিকের (ম্যাগনেটাইট) খনি আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি)। এর আগে দীর্ঘ ২ মাস ধরে কূপ খনন এবং অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জিএসবি। এরপর ১৮ জুন এ তথ্য নিশ্চিত করেন জিএসবির কর্মকর্তারা।
দিনাজপুরের এই এলাকায় লোহার আকরিক থাকার কথা প্রথম জানা যায় ২০১৩ সালে। তখন ভূতাত্ত্বিক জরিপ চালাতে গিয়ে খনিজ পদার্থের উপস্থিতি ধরা পড়েছিলো।
তারা জানান, সেখানে ভূগর্ভের ১,৭৫০ ফুট নিচে ৪০০ ফুট পুরুত্বের লোহার একটি স্তর পাওয়া গেছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা এবং দেশের প্রথম লোহার খনি আবিষ্কার।
১৮ জুন দুপুরে খননকাজে নিয়োজিত জিএসবির উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মাসুম জানান, বিশ্বের যে কয়েকটি দেশে লোহার খনি আবিষ্কার করা হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশের আকরিকে লোহার শতাংশ ৬৫-র ওপরে। কানাডা, চীন, ব্রাজিল, সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়ার খনির লোহার মান ৫০ শতাংশের নিচে। জয়পুরহাট বিসিএসআইআর পরীক্ষাগারে পরীক্ষায় এ তথ্য পাওয়া গেছে।
ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদ রানা এই কাজের সমন্বয়কের ভূমিকায় রয়েছেন। তিনি জানান, ড্রিল করতে গিয়ে তারা ১৩৩৪ থেকে ১৭৮৬ ফুট গভীরতায় লোহার বিশুদ্ধ আকরিকের সন্ধান পেয়েছেন। খনির আয়তন প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার হতে পারে। থাকতে পারে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন টন লোহা ও আরও কিছু মূল্যবান পদার্থ ।
মাসুদ রানা স্বদেশ খবরকে বলেন, যে আকরিক উঠে এসেছে তাতে লোহার গড় পরিমাণ ৬০ শতাংশেরও বেশি। উত্তোলনের জন্য বিশ্বব্যাপী যে মানদ- ধরা হয় তাতে এই মাত্রা পর্যাপ্ত। কিছু স্তরে লোহার পরিমাণও অনেক বেশি। চুম্বকের সঙ্গে খুব শক্তভাবে আটকে যাচ্ছে এই আকরিক। তবে ১৭০০ ফুটের নিচে লোহার পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। খনির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান থাকায় এ ব্যাপারে এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তার নেতৃত্বে অধিদপ্তরের ২২ জনের একটি দল এখন দিন-রাত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞরা গত ১৯ এপ্রিল উপজেলার মুর্শিদপুর গ্রামে প্রথম ড্রিলিং শুরু করেন। এই কাজ শেষ করে ২ কিলোমিটার দূরে ইসবপুর গ্রামে আরেকটি ড্রিলিং কাজ এখন চলছে। সেখান থেকে আরও ২ কিলোমিটার ব্যবধানে আরেকটি ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে খনির ব্যাপ্তি ও আকরিকের পরিমাণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলে তারা জানান। লোহা ছাড়াও খনিটিতে মূল্যবান কপার, নিকেল ও ক্রোমিয়াম রয়েছে বলেও জানান খননকারী বিশেষজ্ঞরা। ১১৫০ ফুট গভীরতায় চুনাপাথরের সন্ধানও মিলে।
তিনি আরও জানান, ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ২০১৩ সালে এ গ্রামের ৩ কিলোমিটার পূর্বে মুশিদপুর এলাকায় কূপ খনন করে খনিজ পদার্থের সন্ধান পেয়েছিল। ১৩৮০-১৫০০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত খননকালে আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়। এ খবর পেয়ে ২৬ মে জিএসবির মহাপরিচালক জিল্লুর রহমান চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওখানে পরিদর্শনে যান। এসময় মহাপরিচালক সাংবাদিকদের সুখবর না দিলেও লোহার খনি আবিষ্কার হতে চলেছে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ চেষ্টার ফলে ১৭৫০ ফুট গভীরে খনন করে লোহার খনির সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে প্রায় ৪০০ ফুট পুরুত্বের লোহার আকরিকের এ স্তরটি পাওয়া গেছে। এ অঞ্চলে ৬০ কোটি বছর আগে সমুদ্র ছিল। সে কারণে এখানে জমাট বাঁধা আদি শিলার ভেতরে লোহার আকরিকের সন্ধান পাওয়া যায়।
উপজেলা সদর থেকে ১১ কিলোমিটার পূর্বে ইসবপুর গ্রাম। এ গ্রামের কৃষক ইছাহাক আলীর কাছ থেকে ৫০ শতক জমি ৪ মাসের জন্য ৪৫ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে খনিজ পদার্থের অনুসন্ধানে কূপ খনন শুরু করে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর। জিএসবির উপ-পরিচালক (ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ার) মাসুদ রানা জানান, গত ১৯ এপ্রিল থেকে ইসবপুর গ্রামে কূপ খনন শুরু করা হয়। ৩০ সদস্যের বিশেষজ্ঞ একটি দল ৩ শিফটে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
আলীহাট ইউনিয়ন ও ইসবপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আমরা জানতে পারলাম এখানে লোহার খনি পাওয়া গেছে। এখান থেকে লোহা উত্তোলন করা হলে এখানকার মানুষের জীবনমান পাল্টে যাবে। কর্মসংস্থান হবে এখানকার মানুষদের। দেশের জন্যও লাভজনক হবে। এমনই আশায় বুক বাঁধছেন এখানকার সর্বস্তরের মানুষ। তাই গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারের কাছে খনি বাস্তবায়নে জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। লোহার খনির সন্ধান মেলার খবরে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে। এতে এলাকার উন্নয়ন ও বহু মানুষের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছেন এলাকাবাসী।