প্রতিবেদন

নুসরাত হত্যাকান্ড: অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে। বিদায়ী ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনের পর বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে নতুন বছর ২০১৯-এর শুরু থেকেই পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা।
নতুন সরকারের ৩ মাস যেতেই দেশ-বিদেশে আলোড়ন তোলে ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকা-। এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বিচারের সম্মুখীন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন, যা বিচার প্রক্রিয়ার সকল প্রতিবন্ধকতা নিরসনে সহায়ক হয়েছে।
মাদ্রাসা-অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের শিকার নুসরাত মামলা করায় দুষ্টচক্র তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে মারে। অভিযুক্ত অধ্যক্ষ সিরাজ কারাগারে বসে বিশ্বস্ত কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং সুবিধাভোগী একটি চক্রের সাহায্যে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারে। যৌন নিপীড়নের আগে-পরে নুসরাত ও তার পরিবারের জন্য ক্ষতিকর কর্মকা-ে জড়িত ছিল সোনাগাজী থানার তখনকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) কয়েকজন। জড়িতদের মধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতারও নাম আসে। এই ঘটনায় বিব্রত হয় নবগঠিত সরকার। ব্যথিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘটনার পরপরই অপরাধীদের দলমত নির্বিশেষে দ্রুত খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্টদের। ‘অপরাধী যে-ই হোক, কোনো ছাড় নয়’ – শেখ হাসিনার এমন ঘোষণার পর দ্রুত গ্রেপ্তার হতে থাকে অভিযুক্তরা। মামলার তদন্ত ও আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নজির সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। আদালতে অপরাধীরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমীনসহ এ মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৬ জন আসামির সবাইকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সর্বশেষ গ্রেপ্তার হলেন সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম। এতে করে নুসরাত হত্যাকা-ের বিচারে সন্দেহের কালো মেঘ অনেকটাই কেটে গেল। আর সরকার রাফি হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর Ñ ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সেই বার্তাই দেয়া হলো। নারায়াণগঞ্জের আলোচিত ‘সাত খুন’ মামলার মতো এই মামলায়ও অপরাধ প্রমাণসাপেক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কিংবা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেউ ছাড় পাবে না Ñ এমনটাই মনে করছে সাধারণ মানুষ।
প্রসঙ্গত, সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে গত ৬ এপ্রিল গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয় তারই সহপাঠী এবং অধ্যক্ষের ধামাধরা চার শিক্ষার্থী। পরে ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে মারা যায় নুসরাত। এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ জনকে আসামি করে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়। পুলিশ ও পিবিআই তদন্ত চলাকালে এ মামলায় ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে ১২ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এ ঘটনায় করা হত্যামামলায় তদন্ত শেষে ১৬ জনের বিরুদ্ধে ২৯ মে ফেনীর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই ওসি মোয়াজ্জেমকেও অভিযুক্ত করে। সবশেষ ১৬ জুন গ্রেপ্তার করা হলো ওসি মোয়াজ্জেমকে।
অভিযোগসূত্রে জানা যায়, এর আগে গত ২৭ মার্চ নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতকে শ্লীলতাহানি করে অধ্যক্ষ সিরাজ। ওসি মোয়াজ্জেমের কাছে দেয়া নুসরাতের ঘটনা বর্ণনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা হয়। জানা যায়, ওসি মোয়াজ্জেম তার মোবাইলে ঘটনার বিবরণ ও ছবি ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।
রাফি হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর সরকার। তারই প্রমাণ মিললো সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে। সাবেক এই ওসির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর বেশ কয়েক দিন কেটে গেলেও তাকে গ্রেপ্তার না করা নিয়ে জনমনে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, গত ১৬ জুন ঢাকার হাইকোর্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তা কেটে গেল।
এদিকে ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। ১৭ জুন দুপুরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় সোনাগাজীর পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করলে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন এই আদেশ দেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রিজন ভ্যানে করে ওসি মোয়াজ্জেমকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। এর আগে মোয়াজ্জেমকে সোনাগাজী পুলিশের একটি প্রতিনিধি দলের কাছে হস্তান্তর করে শাহবাগ থানা পুলিশ।
এদিকে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর খবরে নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মামলা পরিচালনাকারী ব্যারিস্টার সাইয়েদুল হক সুমনসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমার মেয়ে হত্যার বিচারের দায়িত্ব নিয়েছেন। উনার কারণে মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। ওসি মোয়াজ্জেম আমার মেয়ের হত্যাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেছে। অবৈধভাবে ভিডিও ধারণ করেছে। আমরা এর আগেও ওসি মোয়াজ্জেমের বিচার চেয়েছি। আমি তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।
নুসরাত হত্যামামলার বাদি নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম নুসরাতকে তার অফিসে নিয়ে আপত্তিকর ছবি তুলেছে এবং নাজেহাল করেছে, যেটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার পরই তার জবানবন্দির (ওসির কাছে দেয়া) বিষয়টি সবার সামনে আসে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে গত ১৫ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে পিবিআই গত ২৭ মে প্রতিবেদন দাখিল করে, যেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬, ২৯ ও ৩১ নম্বর ধারা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়। ওই দিনই সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এর আগে সোনাগাজী থানা থেকে গত ১০ এপ্রিল মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজসহ আসামিদের সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত কমিটির সুপারিশে গত ৮ মে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে রংপুরে সংযুক্ত করা হয়। গত ১২ মে তিনি রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে যোগদান করেন।
শুধু তা-ই নয়, সুবিচার নিশ্চিত করতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ফেনী জেলার পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।