রাজনীতি

বিএনপির অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে সংসদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় না হওয়ার কারণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি বিএনপি। অতীতের ন্যায় তাদের পুরনো দাবি না মানার কারণে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনার অধীনে এবারও জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বিএনপি। তবে নানা নটকীয়তার পর অবশ্য শেষ মুহূর্তে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট। অংশগ্রহণমূলক এ নির্বাচনে প্রত্যাশিত জয় না পেয়ে, বিশেষ করে ভূমিধস পরাজয়ের কারণে বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা বর্তমান সরকারকে বৈধতা না দেয়ার যুক্তিতে শপথ গ্রহণ না করা এবং সংসদে না যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে রহস্যজনক কারণে বিএনপির এমপিরা শপথ গ্রহণ করে শেষ মুহূর্তে সংসদে যোগদান করে নির্বাচন, সংসদ ও সরকারকে বৈধতা দেন।
উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদে দুই অংকেরও কম আসন পেয়ে কোণঠাসা বিএনপি। তাই বলে চুপ নেই তারা। নানা নাটকীয়তার পর দেরিতে সংসদে যোগ দিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা বাকপটুতার স্বাক্ষর রাখছেন। নিজেদের দল ও দেশের মানুষের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরা ছাড়াও কিছু বিতর্কিত মন্তব্য করে সংসদ উত্তপ্ত করে রেখেছেন তারা। আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছেন সংসদের বাইরেও।
চলতি বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিএনপির সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। বিএনপি দলীয় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেন, ‘বর্তমানে সংসদের কেউ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নন। নির্বাচনে ৩০০ আসন লুট করা হয়েছে।’
তাঁর এ বক্তব্য সংসদের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। এ নিয়ে বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের বক্তব্য হলো, নির্বাচনকে বিতর্কিত করার অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৌশলী ও উদারনীতির কারণে তাদের সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেছে। সংসদে শপথ নিয়ে, সব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে সংসদকে অবৈধ বলা বিএনপির নির্লজ্জতা-দ্বিচারিতা ছাড়া কিছুই নয়।
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে গত ১৩ জুন ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এরপর ১৭ জুন ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সম্পূরক বাজেট পাস হয়। সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সময় সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। পরে বিএনপির রুমিন ফারহানার সব অসংসদীয় বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করে দেন ডেপুটি স্পিকার।
রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সমালোচনা করে মতিয়া চৌধুরী বলেন, আজকে অনেকে বলছেন সংসদ অবৈধ। অবৈধ হলে সংসদে এলেন কেন? কেউ তো চরণ ধরে সাধাসাধি করেছে এমন নয়। আসছেন গণতন্ত্রের চর্চা করলে সেটি ভালো কথা। কিন্তু অবৈধও বলবেন আবার শপথও নেবেন, এমপি হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা নেবেন। আপনাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়, জলে নামব জল তো ছুঁব না। আমার মাথার বেণী শুকিয়ে রবে চুলতো ভিজাব না। মাথার বেণী ঠিক রেখে চুল না ভেজানোর গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ করছেন। সুন্দর নির্বাচন উপহার দেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ। তাদের এ খরচ প্রাপ্যই ছিল তাই সবাই মিলে অনুমোদন দেব।
আলোচনায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদ এমপি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সরকারের রাজনৈতিক হয়রানির শিকার। তাকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। উচ্চ ও নিম্ন আদালত কোনোটাই স্বাধীন নয়।
তিনি বলেন, গত ১০ বছরে কত লাখ টন চাল, গম ও ডাল আমদানি করা হচ্ছে তার হিসাব চাই। তাই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এটি ঠিক নয়। আমি সংসদ নেতাকে আহ্বান জানাচ্ছি, আশা করছি দেশে সুশাসন ফিরিয়ে আনার জন্য সংসদ নেতা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। তিনি জাতীয় নেতাদের সংলাপের আহ্বান জানিয়ে দেশে একটি আবহাওয়া তৈরি করবেন, সুবাতাস বয়ে আনবেন।
বক্তৃতার শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকা-কে জাতীয় ট্র্যাজেডি আখ্যায়িত করে হারুনুর রশীদ বলেন, সংসদ নেতা আপনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে বেদনার। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিএনপি দেয়নি। দিয়েছে আওয়ামী লীগের একটি অংশ। খন্দকার মুশতাক ক্ষমতায় থাকাকালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সম্পর্কে হারুনুর রশীদ বলেন, জিয়াউর রহমান দেশে যে প্রক্রিয়াতেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ক্ষমতায় আসার পর উনি দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। এখন সেই গণতন্ত্র অনুপস্থিত।
বরাদ্দকৃত অর্থের চেয়ে বেশি খরচ করায় নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এবার জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। হ্যাঁ নির্বাচন করেছেন স্বাভাবিকভাবেই খরচ বাড়তে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, বৈধতা অর্জন করতে পেরেছেন? এই নির্বাচন কমিশন অযোগ্য ব্যর্থ। নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছেন? কাজেই যে টাকা খরচ করেছে তা সম্পূর্ণ অপচয় করা হয়েছে। চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলব, এ টাকা অপচয় করা হয়েছে। তাদের দ্রুত পদত্যাগ করা উচিত।
বর্তমান সংসদের বৈধতা প্রসঙ্গে হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আর বর্তমান সংসদে আমরা ৬ জন (বিএনপি) প্রবেশ করলেও সংসদ বৈধতা পাবে না। জাতীয় আলোচনার মাধ্যমে দেশে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সুবাতাস আসবে এমন প্রত্যাশা করি।’
বিএনপির সংরক্ষিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক এবং সংসদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অধিবেশনকক্ষ।
রুমিন ফারহানা বলেন, এই সংসদের কেউ বলতে পারবে জনগণের প্রত্যেক্ষ ভোটে নির্বাচিত? না, পারবে না।
এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি দলের সদস্যরা হইচই করতে থাকেন। একপর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার তার বক্তব্য থামিয়ে বলেন, আপনি বাজেটের বাইরে কোনো কথা বলবেন না, যেন সংসদ উত্তপ্ত হয়।
১০ মিনিটের বক্তৃতায় তিন দফায় বাধার সম্মুখীন হন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, এই সংসদে আসার আগে সংসদ নেতা বলেছিলেন আমাদের কথা বলতে দেবেন। কিন্তু প্রথম বক্তৃতার দুই মিনিটের মধ্যে এক মিনিটও শান্তিমতো কথা বলতে পারিনি। একই ঘটনা আজকেও। আমরা কথা বলতে পারছি না। কোন গণতন্ত্রের কথা বলছি। আমি আমার দলের কথা বলব, তারা তাদের দলের কথা বলবে। আমি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো সংসদ যদি উত্তেজিত হয়ে যায়, তাহলে কিভাবে কথা বলব? পুরো ১০ মিনিটের বক্তৃতায় কয়েক সেকেন্ড শুধু সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা করেন।
রুমিন বলেন, ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে এ পর্যন্ত বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ৭৬ শতাংশ। সরকারের সক্ষমতা দিন দিন কমছে।
নির্বাচন কমিশনে ব্যয় বাড়ানোর কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। কী নির্বাচন তারা করেছে? আমার একটা কথায় পুরো সংসদ উত্তপ্ত। কলামের পর কলাম লেখা হয়। এই সংসদে যারা আছেন তারা আল্লাহকে হাজির-নাজির করে বলুক জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন? তারা নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুক। সবাই উত্তর পেয়ে যাবেন।
পরে ডেপুটি স্পিকার তাকে উদ্দেশ করে বলেন, বাজেটের বাইরে ও সংসদীয় ভাষার বাইরে আপনার কথাগুলো সংসদীয় প্রসিডিউর থেকে এক্সপাঞ্জ করা হলো।
এ কথা বলার পর বিএনপির সবাই অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান। পরে অবশ্য আবার অধিবেশনে ফেরেন।
কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, আন্দোলনের নামে অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে বিএনপি শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। সারাদেশে ভয়াল নাশকতা চালিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় বিএনপি নেতারা নানা হুমকি দিয়েছে। বিএনপি নেত্রী দুর্নীতি করেছেন, আদালতের রায়ে দ-িত হয়েছেন। সেখানে সরকারের কী অপরাধ? বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় রয়েছে। জনগণ থেকে আপনারা (বিএনপি) প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।
তিনি বলেন, বিএনপির অনেকে এখনো জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলতে চান। কিন্তু কট্টর বিএনপি-জামায়াত যাদের ঘাড়ে এখনো পাকিস্তানের ভূত চেপে বসে আছে, তারাও যদি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়েন, তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন স্বাধীনতার ঘোষণাসহ প্রতিটি কর্মকা-ে রয়েছে একটিমাত্র নাম – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার দীর্ঘ আন্দোলন ও ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার আগে কেউই জিয়াউর রহমানের নামটি পর্যন্ত জানত না।
প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, সংসদে বিএনপির চরম মিথ্যাচার ও অসংসদীয় উসকানিমূলক বক্তব্যেই প্রমাণ করে বাজেট নিয়ে তাদের অন্য কোনো কথা নেই। তাদের খুন, দুর্নীতি, অগ্নিসন্ত্রাস ও দুঃশাসনের কারণেই গত নির্বাচনে দেশের জনগণ বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বিরোধী দলের আসনেও বসার সুযোগ পায়নি।
জাপার সাংসদ পীর ফজলুর রহমান বলেন, এই সংসদ অবৈধ হলে তারা (বিএনপি) আসেন কিভাবে? সংসদে থাকা আপনারা সবাই তো অবৈধ। সংসদ কখনো অবৈধ হতে পারে না, ব্যর্থতা থাকলে সেটি বিএনপির। সংসদ বৈধ বলেই তারা শপথ নিয়েছেন, কথা বলছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি দিয়েছিলেন। কেননা বঙ্গবন্ধু হত্যার বেনিফিশিয়ারি একমাত্র বিএনপি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের ওপর গ্রেনেড হামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়াকে গ্রেনেড হামলা করে হত্যা, অগ্নিসন্ত্রাস, পুড়িয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার কথা কি বিএনপি নেতারা ভুলে গেছেন? আগে আয়নায় নিজের চেহারা দেখে পরে কথা বলুন।
গণফোরামের মোকাব্বির খান বলেন, সাধারণ মানুষ নয়, কয়েকটি স্বার্থান্বেষী ও ব্যবসায়ী মহলের দিকে তাকিয়ে বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারের নানা পর্যায়ে দুর্নীতি হচ্ছে। তাই সরকারের ব্যয় সঠিক ও নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে উচ্চমূল্যে চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার ওপর ক্ষতি হচ্ছে। স্মার্ট বাজেটের নামে গরিবকে আরও গরিব, ধনীকে আরও ধনী করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ডা. রুস্তম আলী ফরাজী এবং বিএনপির মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া।