প্রতিবেদন

বিএসটিআইকে কার্যকর করতে এবার আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাজারে খাদ্যের গুণগত মান ও ভেজাল নিয়ন্ত্রণে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও খাদ্যপণ্যের নিম্নমান ও ভেজাল নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এমনকি এক্ষেত্রে আতঙ্কের বিষয় হলো, নামিদামি কোম্পানি ও তাদের নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য এবং নামিদামি সুপারশপের ওপরও এখন আর নির্ভর করা যাচ্ছে না। এসব জায়গাতেও নিম্নমানের ও ভেজাল পণ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বাজারের বর্তমান হালচাল যখন এমন, ঠিক তখন নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে এবার ঢাকাসহ সারাদেশে নামিদামি ব্র্যান্ডসহ সকল পণ্যের মান ঠিক রাখতে বছরজুড়ে এর ল্যাব পরীক্ষা করার ওপর তাগিদ দিয়েছে হাইকোর্ট। বিএসটিআইকে নিয়মিত এ পরীক্ষা চালাতে বলা হয়েছে। আদালত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এরকম অভিযোগ পাই যে পণ্যের ওপর ল্যাব পরীক্ষা করার আগে লেনদেন হয়ে থাকে। যদি এরকম কিছু শুনতে পাই তাহলে দুদকে নয়, সরাসরি কারাগারে পাঠিয়ে দেব, এই লেনদেনের সঙ্গে যত বড় কর্মকর্তাই জড়িত থাকুক না কেন।
বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গত ১৬ জুন এই আদেশ দেন।
বিএসটিআইর উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেছে, কোম্পানিগুলোর দেয়া স্যাম্পলের ভিত্তিতে ল্যাবে পুনরায় পরীক্ষা করে ৫২ পণ্যের মধ্যে ২৬টি মান উত্তীর্ণ করেছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো মান ঠিক না রেখে আবার পণ্য বাজারে ছাড়তে পারে। সেজন্য বাজার থেকে দফায় দফায় স্যাম্পল সংগ্রহ করে পণ্যের ল্যাব পরীক্ষা করতে হবে।
ভেজাল খাদ্যপণ্য ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে ভোক্তারা যাতে যেকোনো সময় অভিযোগ জানাতে পারে সেজন্য ২ মাসের মধ্যে হটলাইন সার্ভিস চালু করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আদালত বলেছেন, ওই হটলাইন চালুর পূর্ব পর্যন্ত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নম্বর (০১৭৭৭৭৫৩৬৬৮), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৩৩৩ এবং জাতীয় হটলাইন ৯৯৯-এর মাধ্যমে ভোক্তারা যেন ছুটির দিনসহ ২৪ ঘণ্টাই অভিযোগ জানাতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে। এছাড়া এই অধিদপ্তরকে এখন থেকে উপজেলা পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করতে বলেছে আদালত। একইসঙ্গে আগামী ১৯ আগস্ট এই আদেশের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২ মে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বিএসটিআই এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়, রমজানকে সামনে রেখে বিএসটিআই বাজার থেকে ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্য পরীক্ষার পরে সংস্থাটি দেখেছে এর ৫২টি পণ্যই নিম্নমানের। এরপর সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হলে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মে ওই ৫২ ভোগ্যপণ্য অবিলম্বে বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। ৫২টি পণ্যের মধ্যে বহুল বিক্রিত কয়েকটি ব্র্যান্ডের লবণ, মশলা এবং তেলও রয়েছে। ১২ মে ওই সব ভোগ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার আদেশ দিয়ে হাইকোর্ট ১০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে এসব খাদ্যপণ্য বিক্রি ও সরবরাহে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছিল।
বিএসটিআই কর্তৃক পরীক্ষায় নিম্নমানের বলে প্রমাণিত ৫২টি ভোগ্যপণ্য ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য ১৬ মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে একটি নোটিশ দেয় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। কিন্তু মানহীন ৫২টি খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার ও জব্দে হাইকোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন না করায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের প্রতি আদালত অবমাননার রুল দিয়েছে হাইকোর্ট। কেন তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু করা হবে না, তা জানাতে চেয়ারম্যানকে ১৬ জুন সশরীরে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৩ মে এ আদেশ দেন।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘পণ্য জব্দ ও প্রত্যাহার করতে আদেশ দেয়া হয়েছিল। আপনারা একটি মশলার প্যাকেটও জব্দ করতে পারেননি। ভদ্রতার একটি সীমা আছে। ভদ্রতাকে দুর্বলতা মনে করবেন না। আপনারা চিঠি দিয়েছেন, অনুরোধ করেছেন, কিন্তু পণ্য জব্দ বা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেননি। ইস্কাটনের অফিসের পাশে ১৭ জন ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশ মিলে একটি পণ্যও জব্দ করতে পারলেন না? আপনাদের অফিস রাখার দরকার কী? ভয় পাচ্ছেন? বড় বড় ব্যবসায়ী (পণ্য উৎপাদনকারী) কী করে ফেলেন বা কী করবেন। এমনটি হলে চাকরি করার দরকার কী? ঘরে গিয়ে রান্নাবান্নার কাজ শুরু করে দেন। নতুবা ব্যাংকে গিয়ে কেরানির চাকরি করতে বসেন। বসে বসে টাকা গুণবেন, টাকার হিসাব রাখবেন।’
আদালত এও বলেছেন, ‘হাইকোর্টকে কি হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন? আমরা এগুলো বুঝি। বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সোজা না বলে বাঁকাভাবে বলছেন।’
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবী জানান, তিনি রাতে নির্দেশনা বাস্তবায়ন বিষয়ক প্রতিবেদন পেয়েছেন। এই আইনজীবীকে আদালত বলেন, ‘আরেকটা অজুহাত দিলেন।’
সেই আদেশে ১৬ জুন আদালতে হাজির হন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক। ভেজাল ও মানহীন পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে আদালতের আদেশ অমান্য করেছিলেন। সে কারণে তলব আদেশে ১৬ জুন তিনি হাইকোর্টে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান।