প্রতিবেদন

বিদ্যুৎসংকট উত্তরণে একযোগে কাজ করছে নেপাল ও বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ফলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান এ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারও নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করা এবং পরবর্তীতে সে বিদ্যুৎ দেশে ব্যবহারের জন্য নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। আর এ ধরনের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এবার এ বিষয়ে নেপালের সাথে বাংলাদেশ সরকারের আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগুচ্ছে।
জানা যায়, ৪২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে নেপালের। কিন্তু মাত্র ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশটি। বাকি ৪০ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্য দেশের বিনিয়োগ চাইছে নেপাল। সম্প্রতি জলবিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশকে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। ১৯ জুন কক্সবাজারে নেপাল-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ খাত বিষয়ক কারিগরি কমিটির এক বৈঠকে দেশটির তরফ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে অংশ নেয়া কারিগরি কমিটির একজন সদস্য স্বদেশ খবরকে বলেন, নেপাল ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের বিদ্যুৎ খাত সম্পর্কে কমিটির সদস্যরা ধারণা নিয়েছেন। নেপাল বলছে, তাদের দেশে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ নীতিতে অন্য দেশের বিনিয়োগের সুযোগ রেখেছে। চাইলে বাংলাদেশের সরকার বা বেসরকারি পর্যায় থেকেও যে কেউ নেপালে এ খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের ৩ দিনের এই বৈঠক ২১ জুন শেষ হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে এ খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা দরকার। তাই বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিবেচনায় নিয়েছে বাংলাদেশ। আর এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দুই দেশের মধ্যকার এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে যে স্টিয়ারিং কমিটি করা হয়েছে সেই কমিটির এটি দ্বিতীয় সভা।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নেপাল-বাংলাদেশ যৌথ স্টিয়ারিং কমিটি গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বৈঠক করে। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় নেপালের কোন কোন জায়গায় বিনিয়োগ সম্ভব, সে বিষয়ে দুই দেশের কারিগরি কমিটি প্রতিবেদন দেবে। একই সঙ্গে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কোন পথে বাংলাদেশে আনা যায় সে বিষয়েও প্রতিবেদন দেবে।
সূত্র জানায়, এক ইউনিট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ১ টাকার কম। তাই এই খাতে বিনিয়োগ করে পরে সেই বিদ্যুৎ আমদানি করলে তা লাভজনকই হবে। বাংলাদেশে ডিজেলে ১ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২২ টাকা, ফার্নেস অয়েলে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১০ টাকা বা তার কাছাকাছি এবং গ্যাসে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩ থেকে ৪ টাকা খরচ হয়। নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে কিলোওয়াটপ্রতি বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮০ পয়সা থেকে ১ টাকা খরচ হবে। দীর্ঘ মেয়াদে নেপালে কেন্দ্র নির্মাণ করে বিদ্যুৎ আমদানি করলে তা লাভজনক হবে বলে ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি নেপালের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বিনিময় চুক্তি হলে শীতের সময় দেশটিতে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে বাংলাদেশ।
কারিগরি কমিটির ওই সদস্য জানিয়েছেন, ৩ ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে নেপাল। আগামী ১০ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনায় নেপাল ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রথম ৩ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট, ৫ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট এবং ১০ বছরে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে দেশটি। এর মধ্যে নেপালের চাহিদা মেটাতে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। বাকি বিদ্যুৎ তারা প্রতিবেশী দেশে রপ্তানি করতে চায়। সে ক্ষেত্রে নিকটতম প্রতিবেশী ভারত ও বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিতে চায় নেপাল।
৪২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বিশাল জলরাশিকে কাজে লাগাতে পারছে না নেপাল। দেশটিতে বিশে^র সব থেকে কম খরচে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আলোচনা শুরু করেছে। সেখানে বাংলাদেশও যুক্ত হতে পারে।
বৈঠকে জানানো হয়, দুই দেশ এবার এক সঙ্গে এসব বিষয়ে গবেষণা করে বিনিয়োগের খাত নির্ধারণ করবে।
নেপালের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিনিময় সম্ভব হলে দুই দেশই উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে যেমন বাংলাদেশ গ্রীষ্মকালে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে পারবে আবার শীতে একইভাবে রপ্তানি করতে পারবে। কারণ শীতের সময় নেপালে পানির স্তর নেমে যায়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। তখন বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকে।
জানা গেছে, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে বেশ আগে থেকেই কাজ করছে বাংলাদেশ। নেপাল থেকে বিদ্যুৎ কেনার পথ প্রশস্ত করতে বাংলাদেশ সরকার বহুদিন ধরেই ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ দিয়ে আসছিল। এরপর ভারত জানায়, ভারতের বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল তাদের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ এখন থেকে বাংলাদেশে বিক্রি করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত গত বছর তাদের বিধিমালা পরিবর্তন করার ফলে এটা সম্ভব হচ্ছে। নেপালের কার্নালি নদীর ওপর ৯০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আপার কার্নালি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির কাজ চলছে। জিএমআর গ্রুপ নামে যে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী আপার কার্নালি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বেচার ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে আগেই ঢাকার নীতিগত সমঝোতা হয়েছে।
সূত্রমতে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এরপর থেকেই বিদ্যুৎ বিভাগ প্রতিবেশী দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিল। তাছাড়া ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনাতে বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এজন্য ভারত ছাড়াও নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে ভারত থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে।