আন্তর্জাতিক

মিশরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসির প্রশ্নবোধক বিদায়!

মেহেদী হাসান : আরব বসন্তের গণবিপ্লবের সময়ে মিশরের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতন হয়। সেটা ছিল ২০১১ সাল। পরের বছর নির্বাচনের মাধ্যমে ২০১২ সালে মিশরে প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসেছিলেন মোহাম্মদ মুরসি। কিন্তু পরের বছরই ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তারপর থেকেই তিনি কারাগারে ছিলেন। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দায়েরকৃত একটি মামলার শুনানি চলাকালে গত ১৭ জুন আদালতকক্ষে মোহাম্মদ মুরসির মৃত্যু হয়।
মুরসির পরিবার ও মুসলিম ব্রাদারহুডের অভিযোগ, কারাগারে আটক রেখে তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধা দেয়া হয়নি তাকে। মুরসির মৃত্যুকে পরিবার ও মুসলিম ব্রাদারহুড হত্যাকা- হিসেবে অভিহিত করেছে। একই দাবি করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। এমনকি আদালত কক্ষে সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসির ওপর ‘বিষাক্ত রশ্মি’ প্রয়োগে বা স্লো পয়জনিংয়ে হত্যার অভিযোগও তোলা হয়েছে। জাতিসংঘ মুরসির মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অনেক প্রশ্ন রেখেই বিদায় নিলেন ৬৭ বছর বয়সী মুরসি। এটা কি স্বাভাবিক মৃত্যু? নাকি হত্যাকা-?
বার্তা সংস্থা এপি জানায়, আদালতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি পাচার মামলার শুনানি চলছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসি বিচারকের কাছে অনুমতি নিয়ে ২০ মিনিট বক্তব্য দেন। বক্তব্যের মধ্যেই বুকে ব্যথা অনুভব করেন তিনি। একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানেই মারা যান মুরসি। অভিযোগ রয়েছে, মুরসিকে হাসপাতালে নেয়ার আগে অজ্ঞান অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখা হয়েছিল।
মুরসি অন্য তিন মামলায় কারাদ- ভোগ করছিলেন। বিচারে একবার তার মৃত্যুদ-ের আদেশ হলেও পরে তা বদলানো হয়।
আদালতে মারা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে কায়রোতে সমাহিত করা হয়েছে। পূর্ব কায়রোতে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই সাবেক এ মুসলিম ব্রাদারহুড নেতার দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে সারকিয়া প্রদেশের নিজ শহরে তার দাফনের আবেদন জানালে তা নাকচ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। তবে কায়রোর নসর এলাকায় গোপনীয় ওই দাফনে অবশ্য মুরসির পরিবারের সদস্যদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়া হয়। মুরসির ছেলে আহমেদ মুরসি এবং তার আইনজীবীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মিশরের ৫ হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মুরসি। এক সামরিক অভ্যুত্থানে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাল আল সিসি। তারপর সিসি প্রেসিডেন্ট হন।
প্রসঙ্গত, মুরসিকে উৎখাতের পর মিশর সরকার তার সমর্থক এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর দমনপীড়ন শুরু করে। মুরসির বিরুদ্ধে আনা হয় ষড়যন্ত্র, দেশদ্রোহিতা, গুপ্তচরবৃত্তি, জেল থেকে পালানোর চেষ্টাসহ একাধিক অভিযোগ। নিষিদ্ধ করা হয় মুসলিম ব্রাদারহুড দলকে।
মুরসির পরিবার ও সমর্থকরা আগে থেকেই তার স্বাস্থ্য এবং তাকে দীর্ঘ দিন ধরে নির্জন প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। কিন্তু সাবেক সেনাপ্রধান আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি সরকার তা কানে তোলেনি।
জাতিসংঘ মুরসির মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করতে ঘটনাটি তদন্তের আহ্বান জানায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে ১৮ জুন এক বিবৃতিতে মিশর একজন বন্দির মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রায় ৬ বছরের বন্দিদশায় মুরসির পরিবার এবং তার আইনজীবীরা কারাকক্ষের পরিবেশ, সেখানে তার চিকিৎসার সুযোগ এমনকি পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে না দেয়া নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করে গেছে। তাকে দীর্ঘদিন নির্জন কারাবাসও করতে হয়েছে।’
মিশর মোহাম্মদ মুরসির মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ তুলেছে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের বিবৃতির নিন্দা জানিয়ে মিশর বলছে, ‘মুরসির মৃত্যু হয়েছে স্বাভাবিক কারণেই।’ জাতিসংঘ মিশরের বিচার প্রতিষ্ঠান নিয়ে সংশয় তৈরির চেষ্টা করছে বলে তারা অভিযোগ করেছে।
কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনও মুরসির মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
মোহাম্মদ মুরসির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। এ সময় মুরসিকে শহীদ আখ্যায়িত করেন তিনি। মুরসির মৃত্যুর পর দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি জনগণের ভোটে নির্বাচিত মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল, গণতন্ত্রকে পদদলিত এবং ক্ষমতায় এসে ৫০ জনকে ফাঁসি দিয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমালোচনা করে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, সিসি ক্ষমতায় আসার পর মিশরীয়দের ফাঁসি দিলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ বিষয়ে নীরব থেকেছে।
তিনি বলেন, মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি তার হাজার হাজার বিপ্লবী সমর্থককে নিয়ে গত ৫ বছর ধরে কারাগারে ছিলেন, কিন্তু পাশ্চাত্যের কেউ তাঁর পক্ষে কথা বলেনি।
মুরসির মৃত্যুতে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি তার নিজ ভ্যারিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্টে শোক জানিয়ে লিখেন, ‘মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসির হঠাৎ মৃত্যুর খবর পেয়ে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। তার পরিবার ও মিশরবাসীর জন্য সমবেদনা জানাই। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার কাছে সবাইকে ফিরে যেতে হবে।’
যথাযথ চিকিৎসা না দেয়ায় মুরসির অকাল মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ রাজনীতিক ও আইনজীবীদের একটি প্যানেল। ব্রিটিশ ইন্ডিপেনডেন্ট ডিটেনশান রিভিউ প্যানেল বিবৃতি দিয়েছে। মুরসির মৃত্যুতে ফিলিস্তিনে ৩ দিনের শোক ঘোষণা করে ফিলিস্তিনি যুবকদের কয়েকটি সংগঠন। মুরসির মৃত্যুতে শোক ও ক্ষোভ জানিয়েছেন মুসলিমবিশ্বের শীর্ষ ইসলামিক স্কলাররা।