কলাম

শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর রোজ গার্ডেন প্যালেসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার মুকুল প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ছিলো তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। শুরুর দিকে দলটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি, এক ব্যক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালের মার্চের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়। এর মধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ।
১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্র“য়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। এই ৬ দফাকে বলা হয় ‘বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ’। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এ সময় কিছু ছাত্রসংগঠন এক সাথে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে তাদের ঐতিহাসিক এগারো দফা কর্মসূচি পেশ করেন, যা মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সহায়তা করে।
গণআন্দোলন ও আইয়ুবের পতনের পটভূমিতে ’৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন দখল করে আওয়ামী লীগ ৩১৩ আসনবিশিষ্ট পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং সরকার গঠনে ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যোগ্যতা অর্জন করে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে আমন্ত্রণ জানানোর পরিবর্তে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালির অধিকার নস্যাৎ করার পথ বেছে নেয়, যার ফলস্বরূপ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় স্বাধীনতার আন্দোলন। রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধশেষে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগকে নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয়। কিছুসংখ্যক পথভ্রষ্ট সামরিক অফিসার, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের সহায়তায় রাতের অন্ধকারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করেন। ওই দিন প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যাকা-ের পর থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এতটাই অগোছালো ছিল যে দলটি নানা উপদলে বিভক্ত হয়ে প্রায় নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছিল। তণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ, সকলের একটা ধারণা ছিল যে, আওয়ামী লীগের পরিণতি হয়তোবা শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগের মতোই হবে। তার ওপর এই দলটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার এতো ব্যাপকভাবে চলছিল যে, সেসবকে প্রতিহত করে রাজনীতির মাঠে নতুনভাবে দাঁড়ানো তখনকার আওয়ামী লীগের জন্য মোটেই সহজ ছিল না। তাছাড়া শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন এবং তারই প্রেক্ষাপটে দেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি নতুন সামরিক শক্তি। এমনি এক ঘোর সঙ্কটজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দলের হাল ধরলেন, নতুন করে সবকিছু গোছাতে লাগলেন, যদিও অভিজ্ঞতা ছিল কম। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দল চালানো অনেক কঠিন ছিল। তখন ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছিলেন কেবল একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে নয়, জাতীয় রাজনীতির হাল ধরতে, সেনাশাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে এবং অগোছালো আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করার পর আওয়ামী লীগকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য একই বছরের ৩ নভেম্বর জেলখানায় হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। অধিকন্তু পিতার মতো বরাবরই শেখ হাসিনাও ছিলেন ঘাতকের ষড়যন্ত্রের টার্গেট। একবার নয়, শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত অসংখ্য জনপ্রিয় নেতা ও দলীয় কর্মীকে হত্যা করা হয়। নির্যাতন, অপহরণ, বিনা অপরাধে মামলা-হামলায় দলীয় নেতাকর্মীদের বিপর্যস্ত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় নিহত হন সাবেক অর্থমন্ত্রী ড. এ এম এস কিবরিয়া, শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার ও আইভী রহমানসহ ১৯ জন নেতাকর্মী এবং আহত হন আরো অসংখ্য আওয়ামী লীগকর্মী। এ সবই ছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রচেষ্টা।
সকল বাধাবিপত্তি ও দেশি-বিদেশি চক্রান্ত উপেক্ষা করে অবশেষে দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের জুন মাসে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে আবার ষড়যন্ত্র করে (২০০১-০৮) পর্যন্ত ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়। আবারও শুরু হয় দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন, হামলা-মামলা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ব্যাপক হত্যাকা-। সারাদেশে ছাত্রদল, জামায়াত-শিবিরের তা-ব জাতি দেখেছে। ২০০৭ সালের ১/১১-এ সেনাশাসিত সরকার আবারও আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে চেয়েছে, শেখ হাসিনাসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে জেলে আটক করেছে, হত্যা, নির্যাতন, হামলা মামলা চালিয়েছে; কিন্তু কোনো কিছুই আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে পারেনি; বরং সময়ের সাথে সাথে আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী এবং মানুষের আশ্রয় ও শেষ ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। শত বাধাবিপত্তি, জেল-জুলুম ও নির্যাতন উপেক্ষা করে ২০০৮ সালের সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। পরবর্তীতে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি নিরঙ্কুশ সংখাগরিষ্ঠতা নিয়ে এদেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায় এবং শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এদেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে এবং ধাপে ধাপে তার বাস্তবায়ন করছে। দেশের মানুষ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে উন্নয়ন এগিয়ে যাচ্ছে, তথ্যপ্রযুক্তিতে, শিক্ষার আধুনিকায়ন ও কর্মমুখী শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও এর আওতা বৃদ্ধিতে, খেলাধুলার উন্নয়নে, দারিদ্র্য দূরীকরণে, নারীর ক্ষমতায়নে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে, গড় আয়ু বৃদ্ধিতে, মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে এবং মেগা প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নে যথা: ১. পদ্মাসেতু, ২. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ৩. রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ৪. গভীর সমুদ্রবন্দর, ৫. ঢাকায় দ্রুত গণপরিবহনের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ, ৬. এলএনজি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট, ৭. মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন, ৮. পায়রা সমুদ্রবন্দর, ৯. পদ্মাসেতু রেল সংযোগ এবং ১০. চট্টগ্রাম হতে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২৯ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপন করাসহ সারাদেশে অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দ্রুত উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার। উন্নয়ন যাত্রার এ শুভক্ষণে (২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও শুভ জন্মদিনে) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ
ও সাবেক প্রভোস্ট
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়