প্রতিবেদন

সিআইসিএ সম্মেলন: বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের তাগিদ

বিশেষ প্রতিবেদক
কনফারেন্স অন ইন্টারেকশন অ্যান্ড কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজারস ইন এশিয়া (সিআইসিএ)-এর পঞ্চম সম্মেলনে যোগ দিতে ১৩ জুন স্থানীয় সময় রাত ১০টায় তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। দুশানবেতে নামার পর রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান তাজিকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষের চেয়ারম্যান এবং দুশানবের ডেপুটি মেয়র। বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতিকে স্ট্যাটিক গার্ড ও লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। বিমানবন্দর থেকে মোটর শোভাযাত্রা করে হোটেল আভেস্তায় যান রাষ্ট্রপতি।
১৫ জুন তাজিকিস্তানে এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ ও আস্থা সৃষ্টি বিষয়ক সম্মেলন সিআইসিএ-তে যোগ দিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের আহ্বান জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে এশিয়ার শান্তি-স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতেরও তাগিদ দেন তিনি।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও আস্থা সৃষ্টি বিষয়ক সিআইসিএ’র ৫ম সম্মেলনে যোগ দিতে তাজিকিস্তানের দুশানবেতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন, ইরান, তুরস্ক, কাতারসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা একত্রিত হন। তাদের স্বাগত জানান তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান। পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়াও দেশগুলোর যোগাযোগ, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদার করাই এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য। সম্মেলনে দেয়া ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটকে সামনে আনেন রাষ্ট্রপতি। রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু সমাধানে সিআইসিএভুক্ত দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গারা তাদের পূর্বপুরুষদের ভিটা থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং খাদ্যসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। বাংলাদেশ এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ একট সমাধান চায়।
সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিসহ অন্যান্য দেশের নেতারা তাদের বক্তৃতায় এশিয়া অঞ্চলের শান্তি স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ।
উল্লেখ্য, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রসারে কাজ করে সিআইসিএ। কাজাখস্তানের রাজধানী নূর সুলতানে এই সংস্থার সদর দপ্তর অবস্থিত। বর্তমানে ২৭টি দেশ এই সংস্থার সদস্য। দেশগুলো হলো আফগানিস্তান, আজারবাইজান, বাহরাইন, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, চায়না, মিসর, ভারত, ইরান, ইরাক, ইসরাইল, জর্ডান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, মঙ্গোলিয়া, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, তাজিকিস্তান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। এছাড়া, বেলারুশ, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, লাওস, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র এর পর্যবেক্ষক হিসেবে রয়েছে। জাতিসংঘ ছাড়াও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা-আইওএম, লিগ অব আরব স্টেটস, অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ, পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বলি অব দ্য টার্কিক স্পিকিং কান্ট্রিজ সিআইসি’র পর্যবেক্ষক। এশিয়াভিত্তিক এই সংস্থার বর্তমান সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে তাজিকিস্তান।
পরে তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমানের কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সিআইসিএ সম্মেলন আয়োজনের জন্য রাষ্ট্রপতি তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান। এসময় বৈঠকে বাংলাদেশ ও তাজিকিস্তানের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলো কাজে লাগাতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্র“প গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশ সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। টেকসই উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশ ও তাজিকিস্তান একসঙ্গে কাজ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে বাংলাদেশ ও তাজিকিস্তানের পারস্পরিক সমর্থন ও সহযোগিতার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলেই তার বিশ্বাস। বাংলাদেশে বিশ্বমানের তৈরী পোশাক, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনের কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। এসব পণ্য আমদানির জন্য তাজিকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, বাণিজ্য সম্ভাবনা বাড়াতে দুই দেশে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সফর বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন দুই রাষ্ট্রপ্রধান। তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমান বৈঠকে বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য তার দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে আগ্রহী। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। সাক্ষাতে আবদুল হামিদ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তাজিকিস্তানের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। ইমামোলি রাহমান এ বিষয়ে তার দেশের সমর্থনের আশ্বাস দেন। এসময় তাজিকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিরোজিদিন মুহরিদিন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব সম্পদ বড়–য়া, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপাক্ষিক) কামরুল আহসান উপস্থিত ছিলেন। সিআইসিএ সম্মেলন শেষ করে ১৩ জুন উজবেকিস্তানে যান রাষ্ট্রপতি। সেখান থেকে ১৯ জুন তিনি দেশে ফেরেন।