রাজনীতি

কর্নেল অলির (অব.) ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ?

সোহরাব আলম
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ (অব.) বীরবিক্রম ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে পৃথক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে এখন আলোচনায়। দেশের রাজনীতির নতুন মেরুকরণে তার এই প্লাটফর্ম কী ধরনের ভূমিকা রাখে Ñ তা-ই এখন দেখার বিষয়। রাজনীতির মাঠে এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা, জল্পনা-কল্পনা। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে গত ২৭ জুন জাতীয় প্রেসকাব মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে নতুন মঞ্চের ঘোষণা দেন সাবেক বিএনপি নেতা ও বর্তমান এলডিপি সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ।
পৃথক মঞ্চ তৈরি করলেও ২০ দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের কোনো আভাস দেননি বিএনপির এক সময়ের প্রথম সারির অন্যতম নেতা কর্নেল অলি আহমদ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমান্তরালে পৃথক এই মঞ্চ ঘোষণা করে মোট ১৮টি দফা তুলে ধরেছেন তিনি। ২০ দলীয় জোটের সব দল প্রকাশ্যে অলির সঙ্গে নেই। তার ভাষ্যে, ২০ দলীয় জোটের বাইরের কিছু দলও ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চে’ যোগ দেবে, যা সময় হলে সবাই দেখবে। এমনকি তিনি তার নেতৃত্বে নতুন মঞ্চে বিএনপিকেও পেতে আগ্রহী। তবে অলির বক্তব্যের বড় চমক বিতর্কিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। অলি আহমেদ বর্তমান জামায়াতকে ‘দেশপ্রেমিক শক্তি’ বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ এক সময় জামায়াত প্রশ্নে বিপরীত অবস্থানে ছিলেন খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অলি আহমদ বলেন, নাজুক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা নির্বিকার থাকতে পারি না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, খালেদা জিয়াকে মুক্ত ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে। খালেদা জিয়া যদি কারাগার থেকে মুক্ত হন, একনায়কতন্ত্র থেকে যদি দেশ মুক্ত হয়, ‘দেন দ্য নেশন উইল বি ফ্রি’।
এই ল্য অর্জনে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ ঘোষণা করে কর্নেল অলি বলেন, আশা করি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সকল শক্তি আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে জাতিকে মুক্ত করার জন্য এগিয়ে আসবে। বিশেষ করে, গণতন্ত্রপ্রেমী ও দেশপ্রেমী সকল রাজনৈতিক দল, সকল নাগরিক, সামাজিক সংগঠন, সকল প্রবীণ ও তরুণদের প্রতি আমাদের এই আহ্বান।
লিখিত বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এলডিপি সভাপতি বলেন, ‘নিশ্চয়ই দেখছেন আমাদের পাশে কারা, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তিই জাতিকে মুক্ত করতে পারে। অনেকেই মত দিয়েছেন, অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে, অনেকে সময় নিয়েছেন। কারা কারা এই মঞ্চে থাকবেন সেটি যথাসময়ে জানাব।’
এক প্রশ্নের জবাবে অলি আহমদ বলেন, আমরা ২০ দলে আছি, থাকব। বিএনপি মূল দল, কিন্তু বিএনপিও ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে আলাদাভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করেছে। এছাড়া কয়েক দিন আগে ২০ দলের বৈঠকে জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান স্পষ্ট করে বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য যে যার মতো করে কাজ করতে পারে, কর্মসূচি দিতে পারে।
লিখিত বক্তব্যে অলি আহমদ বলেন, অনেক বড় ইস্যু থাকার পরও সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি আন্দোলন করতে পারেনি। কারণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে অনেকে সম্পদ রায় সরকারের হয়ে সুকৌশলে কাজ করেছেন।
‘অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী কারা’ Ñ এমন প্রশ্নের জবাবে অলি আহমদ বলেন, আমাদের অনেকে সরকারের দালালি করেছেন বলে আজ এই অবস্থা। আপনারাও এই দেশে থাকেন, দালালদের আপনারাও চেনেন। দেশকে ও খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে সবাই আসবে, তবে দালালরা নয়।
জামায়াত সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে এলডিপি প্রধান বলেন, দেশপ্রেমিক যারাই আসতে চান, সবাই এই মঞ্চে আসতে পারেন। বিভক্ত করে এবং অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে জাতিকে দুর্বল করা হচ্ছে। ১৯৭১ সালের জামায়াত আর ২০১৯ সালের জামায়াত এক নয়। আমি জানি, জামায়াতও নিজেদের মধ্যে বসে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কারণ তারাও দেশপ্রেমিক শক্তি।
সংবাদ সম্মেলনে অলি আহমদের পাশে ছিলেন ২০ দল শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম (অব.), জাগপা’র পতিষ্ঠাতা মরহুম শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে তাসমিয়া প্রধান, খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা আহমদ আলি কাসেমী, ইসলামী সংগীতশিল্পী মুহিব খান, এলডিপি মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ ও সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম।
এদিকে মঞ্চে না বসলেও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা গোলাম মাওলা রনি এবং বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জেবেল রহমান গাণির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাপ ২০ দল থেকে বেরিয়ে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টে যোগ দেয়। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল অলির হাতে ফুল দিয়ে এলডিপিতে যোগ দেন।
একটি সূত্র বলছে, পৃথক মঞ্চ ঘোষণা উপলে অলি আহমদের সংবাদ সম্মেলনে ২০ দলের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর নেতাদেরও উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে কৌশলগত কারণে তারা উপস্থিত না হলেও মিলনায়তনে দর্শক সারিতে দলটির বহু কর্মীর উপস্থিতি ছিল লণীয়। অলি আহমদ তার বক্তব্যে জামায়াতকে ‘দেশপ্রেমিক শক্তি’ আখ্যা দিলে ওই কর্মীরা হাততালি দেয়।
প্রসঙ্গত, ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই অনড় অবস্থান থেকে হঠাৎ ইউ টার্ন নিয়ে দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপি সংসদে যোগ দেয়ায় ক্ষুব্ধ হন অলি আহমদ। গত ১৬ মে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বিএনপির উদ্দেশে অলি আহমদ বলেন, বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়ার পে জেলে থেকে আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া সম্ভব না, তারেক রহমানের পওে লন্ডন থেকে সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকা সম্ভব নয়, সুতরাং আমাদেরকে সেই দায়িত্ব নিতে হবে এবং আমি সেই দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত। বিএনপি নেতাদের অনুরোধ করবো, হয় আপনারা নেতৃত্ব দিন, নইলে আমাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করুন।
অলি আহমদের ওই বক্তব্যের পরই রাজনৈতিক মহলে তাকে নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়, তিনি কি ২০ দলীয় জোট ছেড়ে নতুন প্লাটফর্ম তৈরি করবেন! ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে পৃথক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ঘোষণার মাধ্যমে সেই ধারণার আংশিক পূর্ণতা পেল। এখন দেখার পালা তিনি শেষ পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটে থাকেন কি না। ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটায় কি না সেদিকেও দৃষ্টি থাকবে সবার।