রাজনীতি

ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় বারবার হোঁচট খাচ্ছে বিএনপি

বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রায় দেড় বছর ধরে কারাবন্দি। একাধিক মামলার আসামি হওয়ায় তিনি জামিনে মুক্তি পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বয়সজনিত অসুস্থতায় খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো নয় বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে বিএনপি। দলীয় চেয়ারপারসনকে আদালত কারাগারে পাঠানোর পর বিএনপি নানা কর্মসূচি দেয়, কিন্তু খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে এখন আর রাজপথের কোনো কর্মসূচি নেই বিএনপির। সামনে কী ধরনের কর্মসূচি থাকবে তাও স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা, একাংশ ক্ষুব্ধও।
এদিকে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হিসেবে লন্ডনে পলাতক জীবনযাপন করছেন। সেখান থেকেই তিনি দল পরিচালনা করছেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে অনেক জটিলতা। এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার সাথে তারেক রহমানের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের একক কিছু সিদ্ধান্তে দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি খালেদা জিয়াও অসন্তুষ্ট হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আলাপকালে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের এক নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে বিএনপি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ সময় পার করছে। তিনি বলেন, যে যাই বলুক না কেন, প্রকৃত সত্য হলো কারাগারে থেকে বা দেশের বাইরে অবস্থান করে বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলকে পরিচালনা করা বেশ কঠিন কাজ। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলে যেসব নেতা দ্বিমত করার সাহস পেতো না তারাও এখন বিদ্রোহ করছে। তার মতে, বিএনপির অনেক নেতা এখনও মনে করেন, ড. কামাল হোসেন সরকারের চাওয়া অনুযায়ী একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে বিএনপিকে নানাভাবে মিসগাইড করেছে। বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া, এমনকি নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ ছাড়া আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে পরিচালিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা আদৌ ঠিক হয়নি। এভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারেনি এবং এখনও দলের ওই নেতৃত্বকে সহজে গ্রহণ করতে পারছে না। এমনকি নির্বাচন-পরবর্তী দলের নির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণ ও সংসদে গিয়ে একাদশ সংসদকে বৈধতা দেয়ার প্রশ্নে সারাদেশের বিএনপি নেতাকর্মীরা এখনও বেশ দ্বিধাবিভক্ত। ফলে বিএনপির বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের খুব একটা আস্থা-বিশ্বাস নেই। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কেউ তারেকপন্থি, কেউবা খালেদাপন্থি আবার কেউবা সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত রয়েছে Ñ এসব কারণে দলের সাংগঠনিক অবস্থা দিন দিন শক্তিশালী না হয়ে উল্টো দুর্বল হচ্ছে। বিশ দল, ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপির অভ্যন্তরে কোথাও আস্থা-বিশ্বাসের ছায়া দেখছেন না দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। ফলে নেতৃত্বশূন্যতার কারণে বিএনপি কার্যত ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। গত কয়েক বছর ধরে সংকটের বেড়াজালে আটকে থাকা দলটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও বারবার হোঁচট খাচ্ছে। সম্প্রতি দলের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটি গঠনের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দলটিকে নতুন করে জটিলতায় ফেলেছে।
ঈদুল ফিতরের একদিন আগে হঠাৎই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়ায় উত্তেজনা চলছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রায় প্রতিদিনই বিােভ করছেন বিলুপ্ত কমিটির বিক্ষুব্ধ নেতারা। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মারধরের অভিযোগও বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধে। এর প্রভাব পড়েছে বিএনপিতে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে স্থায়ী কমিটিকে নির্দেশনা দিলেও কার্যত তার কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন মাঠে নেই। বরং নানামুখী দ্বন্দ্ব-গ্রুপিংয়ের জেরে এখনও উত্তপ্ত বিএনপির নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয় চত্বর।
বিএনপির একটি সূত্র বলছে, দলটি আপাতত জেলায় জেলায় সভাসমাবেশ, মানববন্ধন ও প্রতীকী অনশন কর্মসূচি দেবে। চলতি বছরের অক্টোবর-নভেম্বরের ভেতর দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত করার চিন্তাভাবনা চলছে। এর আগে বিএনপির সাংগঠনিক ৮১টি জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটির কাজ শেষ করা হবে। এরই মধ্যে কমিটি গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে। বেশ কয়েকটি সহযোগী সংগঠনও ঢেলে সাজানো হয়েছে। শিগগিরই ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি দেয়া হবে। এরপর ঢাকা মহানগরীর অসম্পূর্ণ কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে।
সূত্র আরও জানায়, সারাদেশে বিএনপি, ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে চাঙা করতে পৃথক কর্মসূচির চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সবাইকে দলগতভাবে শক্তি সঞ্চয় করতে বিএনপির প থেকে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দলের প থেকে সারাদেশে আবারও সাংগঠনিক সফরের কথা ভাবা হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য একজন সদস্য স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা এখন দল গোছানোর কাজ করছি। দল পুনর্গঠন করে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে নামব। পাশাপাশি আইনি লড়াইও চলবে। তবে দল গুছিয়ে রাজপথে নামার বিকল্প কোনো পথ নেই। নতুন নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি মাঠে সরব থাকবে বলেও জানান এই নেতা।
বিএনপির যুগ্মমহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্যই দলকে শক্তিশালী করতে হবে। তৃণমূল বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা চান কর্মসূচি। কিন্তু বিএনপি হাইকমান্ড বাস্তবতার নিরিখেই কাজ করে যাচ্ছেন। আশা করি, শিগগিরই গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম জিয়া মুক্তি পাবেন।
বিএনপি নেতারা মুখে যা-ই বলুন, খালেদা জিয়ার মুক্তি কিংবা দলে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্র ঘোষিত বিগত দিনের কর্মসূচিগুলো তৃণমূল নেতাকর্মীদের সন্তোষ্ট করতে পারেনি। আগামী দিনে ঘোষিত কর্মসূচি প্রত্যাশা পূরণ করে কাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনতে পারে কি না Ñ সেটাই এখন দেখার বিষয়।