প্রতিবেদন

দ্রুত এগিয়ে চলছে নির্মাণকাজ ॥ নদীর দুই পাড়ে এখন দৃশ্যমান পদ্মাসেতু ২০২০ সালে যান চলাচলের আশাবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নদীর তীরে সচরাচর জেগে ওঠে চর। কিন্তু এবার খরস্রোতা পদ্মা নদীর ওপর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে স্বপ্নের সেতু। এটি এখন শত কোটি মানুষের স্বপ্নেরই বাস্তব রূপ।
স্মরণ করা যেতে পারে, প্রথম দিকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে পদ্মাসেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা অর্থ সহায়তা করতে অপারগতা প্রদর্শন করে এবং সেতু নির্মাণে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সংশ্লিষ্ট সকল মহল যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলো ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্তে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে দ্রুত এগিয়ে চলছে পদ্মাসেতুর কাজ। নির্মাণকাজের ধারাবাহিকতায় গত ২৯ জুন পদ্মাসেতুর ১৫ ও ১৬ নম্বর পিয়ারের (খুঁটি) ওপর বসানো হয়েছে ১৪তম স্প্যান। এ নিয়ে চলতি বছরের ৬ মাসে ৮টি স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। এই স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে পদ্মাসেতুর ২১শ মিটার দৃশ্যমান হলো। নদীর দুই পাড়ে সেতু দৃশ্যমান হয়েছে। ইতোমধ্যে সেতুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ পাইল ডাইভিং শেষ। তাই ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে পদ্মাসেতুর ওপর দিয়ে যান চলাচল করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পদ্মাসেতু প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ জুন ৩-সি নম্বর ১৪তম স্প্যানটি বসানোর নির্ধারিত দিন ছিল। এ জন্য ওই দিন সকালে মাওয়ার কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে ৩৬০০ টন ধারণমতার ভাসমান ক্রেন ‘তিয়ান ই’ দিয়ে ১৫ ও ১৬ নম্বর পিয়ারের কাছে নেয়ার কাজ শুরু হয়। কিন্তু পিয়ারের কাছে ডুবো চরে ক্রেনটি আটকে গেলে নদী খননের কাজ শুরু হয়।
পদ্মাসেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী স্বদেশ খবরকে বলেন, মূল বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সেতুর পাইল ডাইভিং। এটি সম্পন্ন হয়েছে। এখন প্রকল্পের কাজ দ্রুত চলছে। জাজিরায় অনেক স্প্যান বসে গেছে। মাওয়ার কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে দূরত্ব কমে এসেছে। তাই কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে দুই-একদিনের মধ্যেই একটি করে স্প্যান পিয়ারের ওপর বসানো সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, ১৩টি পিয়ার নির্মাণকাজ শেষ হলে আশা করা যায় ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে পদ্মাসেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে পারবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিয়ারে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো দৃশ্যমান হয় পদ্মাসেতু। এরপর ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি ৩৮ ও ৩৯ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় দ্বিতীয় স্প্যান। গত বছরের ১১ মার্চ ৩৯ ও ৪০ নম্বর খুঁটির ওপর বসে তৃতীয় স্প্যান। ১৩ মে ৪০ ও ৪১ নম্বর খুঁটির ওপর চতুর্থ স্প্যান বসানো হয়। পঞ্চম স্প্যান বসানো হয় গত বছরের ২৯ জুন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায়। ২০১৮ সালের শেষ দিকে মাওয়া প্রান্তে ৪ ও ৫ নম্বর পিয়ারের ওপর একটি স্প্যান বসানো হয়। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি জাজিরা প্রান্তের তীরের দিকের সপ্তম স্প্যান বসে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি জাজিরা প্রান্তে ৩৬ ও ৩৫ নম্বর পিয়ারের ওপর অষ্টম স্প্যান বসানো হয়। সেতুর ৩৫ ও ৩৪ নম্বর পিয়ারের ওপর গত ২২ মার্চ নবম স্প্যান বসে। ১০ এপ্রিল মাওয়া প্রান্তে ১৩ ও ১৪ নম্বর পিয়ারের ওপর ১০ম স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে সেতু ১ হাজার ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যে রূপ নেয়। ২৩ এপ্রিল পদ্মাসেতুর জাজিরা প্রান্তে ৩৩ ও ৩৪ নম্বর পিয়ারের ওপর বসানো হয় ১১তম স্প্যান। ৬ মে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের মাঝামাঝি স্থানে ২০ ও ২১ নম্বর পিয়ারের পর ১২তম স্প্যান বসানো হয়। গত ২৫ মে ১৪ ও ১৫ নম্বর পিয়ারের ওপর ১৩তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে পদ্মাসেতুর ১ হাজার ৯৫০ মিটার অংশ দৃশ্যমান হয়।
বহুল আলোচিত পদ্মাসেতু প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই বছরের ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। বর্তমান ব্যয় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। মূল সেতু নির্মাণে কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। আর নদীশাসনের কাজ করছে চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দুই প্রান্তে টোল প্লাজা, সংযোগ সড়ক, অবকাঠামো নির্মাণ করছে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।