প্রতিবেদন

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
সবাইকে নিয়ে উন্নয়ন ও সবার উন্নয়ন Ñ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের এ আদর্শ সামনে রেখে দারিদ্র্য বিমোচন ও ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।
শহর ও গ্রামের তফাৎ কমিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করার উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য হ্রাস এবং প্রান্তিক জনগণের সুরায় আমরা ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছি।
সংসদে সরকারদলীয় সদস্য বেনজীর আহমদের প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা অনুধাবন করেছিলেন যে, গ্রামীণ উন্নয়ন ব্যতীত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা সম্ভব নয়। জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার ল্েয পরিকল্পিত ও সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার ল্েয আমরা রূপকল্প-’২১ ঘোষণা করি। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা।
শেখ হাসিনা বলেন, এবারের নির্বাচনের আগে আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার-২০১৮, সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ-এ প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। যার স্লোগান হলো, আমার গ্রাম, আমার শহর। এ ল্য পূরণের উদ্দেশ্যে আমরা গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন করছি। আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার হলো প্রতিটি গ্রামে আধুনিক শহরের সুবিধা সম্প্রসারণ। এ ল্েয আমরা গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত এক দশক ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। গ্রামীণ জনগণের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন, শিার হার ও গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ। নগর উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামে নগর সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আমাদের সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১৯ জুন টেবিলে উত্থাপিত প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
জাতীয় পার্টির এমপি ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের লিখিত জবাবে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা জানান, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ল্েয বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য বীমা চালু করার পরিকল্পনা আছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমরা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর, ঘাটাইল ও কালিহাতি উপজেলায় ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য বীমা কার্যক্রম পরীামূলকভাবে চালু করেছি।
সরকারদলীয় এমপি মমতাজ বেগমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দতা উন্নয়নে নির্বাচনি ইশতেহার ২০১৮, প্রেতি পরিকল্পনা ২০২০-২১ ও টেকসই উন্নয়ন ল্েযর (এমডিজি) আলোকে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জনপ্রশাসনকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ল্েয আমরা ই-নথি ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে জনপ্রশাসনে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের ই-নথি সংক্রান্ত প্রশিণ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া গণমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ল্েয আমরা জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন করেছি।
গণফোরাম এমপি মোকাব্বির খানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলার ল্েয বর্তমান সরকার বিগত দুই মেয়াদে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়ন ও কানেক্টিভিটি, দ মানবসম্পদ উন্নয়ন, ই-গভর্নমেন্ট এবং আইসিটি শিল্পের উন্নয়ন এই চার স্তম্ভের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ ও কার্যক্রম গ্রহণ করে সফল হয়েছি।
তিনি বলেন, মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর সফল উৎপেণ করতে সম হয়েছি। বাংলাদেশের সকল সরকারি-বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। ইউএন ই-গভর্নমেন্ট উন্নয়নসূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশকে পেছনে ফেলে ১৫০তম অবস্থান হতে ২০১৮ সালে ১১৫তম অবস্থানে পৌঁছাতে সম হয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫০তম। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়।
আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে মতায় এসে ১৯৯৮ সালে বয়স্কদের জন্য ভাতা চালু করে। মাসে ১০০ টাকা করে ৪ লাখ অসহায় প্রবীণ মানুষকে সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল সামাজিক সুরার এ কার্যক্রম। বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা এবার বেড়েছে ৪ লাখ, ভাতা এখন ৪০০ টাকা। বিত্তহীন পরিবারে প্রতিবন্ধী সন্তানকে বোঝা মনে করা হয়। প্রতিবন্ধী সন্তানের সুরায় সরকার এবার ভাতাভোগীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ লাখ বাড়িয়েছে। বাড়ানো হয়েছে প্রতিবন্ধী শিার্থীর উপবৃত্তিও।
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন করা প্রান্তিক মানুষের জন্য দুষ্কর। জটিল রোগ হলে তার চিকিৎসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ক্যান্সার, লিভার সিরোসিসের মতো রোগে আক্রান্ত মানুষের সহায়তায় হাত বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বাজেটে।
এভাবে প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। কৃষকের জন্য পণ্য রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা ও সেচের বিদ্যুৎ বিলে ছাড়, সামাজিক সুরার আওতা বাড়ানো এবং ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ কর্মসূচির আওতায় প্রান্তিক মানুষের প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের সাড়ে ৩ কোটির বেশি মানুষ এই প্রণোদনার মধ্যে পড়ছে।
১৩ জুন সংসদে উপস্থাপিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক সুরা খাত অন্যবারের চেয়ে আরো শক্তিশালী এবং আওতা বাড়ানো হয়েছে। এ খাতে ৮৯ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ভাতা সুবিধা পাবে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২০ লাখ বেশি। আগের বছর বাজেটে ৬৯ লাখ ১৯ হাজার মানুষ সামাজিক সুরার আওতায় ভাতা পেয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক সুরা খাতে চলতি বছরের চেয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ৬৪ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, এবার তা ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৪.২১ শতাংশ আর জিডিপির ২.৫৮ শতাংশ।
বাজেটে বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা ৪ লাখ বাড়িয়ে ৪৪ লাখ করা হয়েছে। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতাভোগী ১৪ লাখ, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১৫.৪৫ লাখ করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিার্থীদের উপবৃত্তির পরিমাণ ৩টি স্তরেই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ৫০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে, বেদে ও অনগ্রসর গোষ্ঠীর ভাতাভোগীর সংখ্যা ৬৪ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮৪ হাজার; ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড ও জন্মগত হৃদরোগী ভাতাভোগী ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার, চা শ্রমিক ভাতাভোগী ৪০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার, দরিদ্র মায়ের মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগী ৭ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭ লাখ ৭০ হাজার এবং কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার (স্তন্যদানরত মা) সহায়তা ভাতাভোগী ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৭৫ হাজার করা হয়েছে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪০.৬২ শতাংশ কৃষি েেত্র নিয়োজিত। ১০ বছরে কৃষি খাতে ৩.৭ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফসলহানি হলে বা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে কৃষকদের আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা না থাকলেও সরকার কৃষি ভর্তুকি, সার-বীজসহ কৃষি উপকরণে প্রণোদনা ও সহায়তা কার্ড, কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণসুবিধা প্রদান করছে। নতুন বাজেটে কৃষি খাত ও এ খাতে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে নিতে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা এবং কৃষি েেত্র সেচ যন্ত্রের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন।
মূলত স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য দূর করার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা করছে। ২০২০ সালের মধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ৪২টি গ্রাম সংগঠনের মাধ্যমে ৬০ লাখ পরিবার এ সহায়তা পাবে। এ প্রকল্পে এরই মধ্যে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত ৯৫ হাজার ৩৮৬ সমিতির মাধ্যমে ২ কোটির বেশি মানুষ উপকার পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলছেন, সামাজিক সুরার আওতা বাড়ানো ভালো দিক। তবে ভাতাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা বাড়ানো ও নিশ্চিত করতে পারলেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঘরে সুফল নিশ্চিতভাবে পৌঁছবে।