ফিচার

ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

মেহেদী হাসান
তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত অগ্রসরমান বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও লেগেছে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া। বিগত কয়েক বছর ধরে শিক্ষিত তরুণদের একটা অংশ ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত হয়ে সফল হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের উন্নয়নে বড় ধরনের অবদান রাখতে শুরু করেছে ‘ডিজিটাল অর্থনীতি’। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে আভাস দেয়া হয়েছে, আউটসোর্সিংয়ের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক খাতে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি রচিত হচ্ছে।
শিতি বেকার জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানে অনন্য অবদান রাখছে ইন্টারনেটভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং। এেেত্র উন্নত দেশগুলোও বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিকের লেখা ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, ডিজিটাল অর্থনীতিতে দুর্দান্ত অবদান রাখতে শুরু করেছে উন্নয়নশীল দেশগুলো, যেখানে প্রশ্নাতীতভাবে এশিয়া এগিয়ে রয়েছে।
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অনলাইন শ্রমশক্তির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ ভারত, যাদের প্রায় ২৪ শতাংশ গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সার ওয়ার্কার আছে। এর পরের অবস্থানটিই বাংলাদেশের। অনলাইন শ্রমশক্তিতে বাংলাদেশের অবদান ১৬ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যাদের ফ্রিল্যান্সার হচ্ছে ১২ শতাংশ।
কম্পিউটার প্রোগ্রামিং থেকে শুরু করে ট্যাক্স প্রিপারেশন, সার্চইঞ্জিন অপটিমাইজেশনসহ বহু কাজ অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের আওতাভুক্ত। এই পদ্ধতিতে গ্রাহক ও কাজের পরিসর অনেক মুক্ত। বিশ্ববাজারে কাজ করা যায়, কাজের স্থান নিয়েও ভোগান্তি নেই। ঘরে বসে কাজের সুযোগ থাকায় ফ্রিল্যান্সারদের ঢাকার মতো জনবহুল শহরের রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম ঠেলে অফিসে যেতে হয় না। এতে নতুন চাকরির বাজার তৈরি হয়েছে, তৈরি হয়েছে অনেক সুযোগ। এশিয়াতেই এখন আউটসোর্সিংয়ের বাজার সবচেয়ে বড়।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ওই নিবন্ধে বলা হয়, খরচ ও ঝুঁকি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অনেক উন্নত দেশও এখন বাংলাদেশের মতো আইটি আউটসোর্সিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং পেশা দিনকে দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখতে এখান থেকে ভালো আয় করার সুযোগ রয়েছে। দ্রুতগতিতে বাংলাদেশে ডিজিটাল রূপ লাভ করায়, শহরে ইন্টারনেট সুবিধা, সরকারি-বেসরকারি প্রচারণায় এই খাত ধীরে ধীরে পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন কর্মী সরবরাহে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। এখানে নিয়মিত কাজ করছে ৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার। আর মোট নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ৬ লাখ ৫০ হাজার।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৪ কোটি ৪০ লাখ তরুণের প্রতি ১০ জনের একজন বেকার। প্রতি বছরই বিশ্ববিদ্যালয় পেরোনো হাজার হাজার শিার্থী মনের মতো চাকরি না পেয়ে বেকার হয়ে বসে আছেন। ফলে শিতি বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে খুব সহজেই আইটি প্রশিণের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে।
বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, প্রতি বছর ফ্রিল্যান্সাররা ১০ কোটি ডলার আয় করে থাকেন। একেক দেশ একেক বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে এই পেশা নিয়ে কাজ করছে। যেমন ভারতীয় ফ্রিল্যান্সারদের দতা প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট। আর বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা মূলত সেলস ও মার্কেটিং সেবায় পারদর্শী। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই নিবন্ধে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, ফ্রিল্যান্সিং করে বাংলাদেশি তরুণরা শুধু নিজের জীবিকাই নিশ্চিত করবে না, বরং দেশে অনেক বৈদেশিক মুদ্রাও আনতে সমর্থ হবে, যা ‘নতুন বাংলাদেশ’র অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশের নারীদের জন্যও ফ্রিল্যান্সিং দারুণ সুযোগ হিসেবে সামনে এসেছে। ঘরে বসেই কাজের সুযোগ থাকায় নারীরা এখন তাদের প্রথাগত সাংসারিক দায়িত্বের গ-ি পেরিয়ে ফ্রিল্যান্স কাজকে ক্যারিয়ার সংকটের সমাধান হিসেবে দেখছে।
গবেষণা বলছে, নারীদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এ দেশের নারীরা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে পুরুষের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য।
তথ্যপ্রযুক্তি সেবা নিশ্চিতে সরকার প্রতি জেলায় আইসিটি পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে শ্রমব্যয় কম থাকায় বিশ্বের আউটসোর্সিং বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে বাংলাদেশ। তবে নারী ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও তা কিন্তু যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের ১৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশেরই বয়স ২৫ বছরের নিচে। এই বিশাল তরুণ ও শক্তিশালী জনসম্পদ এখনও এই ফ্রিল্যান্স বাজারের সম্ভাবনা পুরোপুরি অবগত নয়। বিগত বছরগুলোতে ফ্রিল্যান্সিং জনপ্রিয় হলেও এখনো বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণকে এটা নিয়ে উপযুক্ত প্রশিণের প্রয়োজন রয়েছে। এই সুযোগ যেন তারা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে সেজন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বেকার তরুণদেরকে প্রযুক্তি বিষয়ক প্রশিণ দিয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ে উদ্বুদ্ধ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তারা বলছে, এতে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন আরও বাস্তব হতে শুরু করবে। জনসম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ডিজিটাল অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে বাংলাদেশ।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। ফ্রিল্যান্সিংয়ে এমন সফটওয়্যারে কাজ করতে যেখানে মনোযোগ খুবই জরুরি। সেখানে বিদ্যুৎ চলে গেলে কাজের তি হয়। এছাড়া ইন্টারনেট সেবার মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মূল্যও অনেক বেশি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটা অনেক বড় সমস্যা। ব্রডব্যান্ড সুবিধা থাকলেও অনেক সময় তা ধীরগতির হয়। বড় সমস্যার মধ্যে আরেকটি হচ্ছে টাকার সহজ লেনদেনের ব্যবস্থা। বিদেশ থেকে টাকা গ্রহণের সহজ কোনো উপায় নেই। এসব ব্যাপারে সরকার অধিক মনযোগী হলে ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশ অনেক ভালো করতে করবে।