আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার শেষ কোথায়?

বিশেষ প্রতিবেদক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার অবসান শিগগিরই হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দেশ দুটির বিরোধ সম্প্রতি নতুন গতি পেয়েছে। ওমান উপসাগরে দুইটি জাহাজে বিস্ফোরণের কিছুদিনের মধ্যেই মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করে ইরান। এ ঘটনার পর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। এর প্রেেিত ইরানের তিনটি স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়। তবে শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প মত পরিবর্তন করায় কোনো হামলা হয়নি।
এদিকে ড্রোন ভূপাতিত করার পর ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এর জেরে ইরানি প্রেসিডেন্টের দেয়া বিবৃতিতে চটেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাঁর ভাষায়, রুহানির কথাতেই বোঝা যায়, ইরানের নেতারা বাস্তবতা বোঝেন না। এ সময় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার জন্য ইরানকে আবার দায়ী করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে ইরানের প্রধান নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্প দাবি করেন, এই ব্যক্তিরা ওই অঞ্চলের যুদ্ধাবস্থার জন্য দায়ী।
এর মধ্য দিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে চলে এলো, ট্রাম্প কি সত্যিই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছেন?
বিবিসি অনলাইন গত ২৬ জুন এক খবরে জানায়, ইরানের বিবৃতিকে ‘মূর্খ ও অপমানজনক’ উল্লেখ করে ােভে ফেটে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর দেশটি ওই বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, এই পদপে প্রমাণ করল হোয়াইট হাউস ‘মানসিক সমস্যায়’ আছে।
রুহানির বিবৃতিকে ‘মূর্খ ও অপমানজনক’ উল্লেখ করে ২৫ জুন টুইট করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এতে বোঝা গেল ইরানের নেতারা ‘বাস্তবতা বোঝেন না’।
মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনায় ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত দিয়ে তা বাতিল করার ঘটনায় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেশ অবাক হয়েছেন। এ বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি, ১৫০ মানুষ মারা যাবে শুনে হামলা বন্ধ করা হয়েছে। কারণ ভূপাতিত ড্রোনের সঙ্গে এতো মানুষের হতাহতের বিষয়টি যুক্তিযুক্ত নয়। তিনি বলেন, ইরানে হামলার ব্যাপারে কোনো ব্যস্ততা নেই। অবরোধ কাজ করছে। ইরান কখনোই পরমাণু শক্তিধর হবে না।
পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমাদের সঙ্গে চলা ইরানের টানাপড়েনের অবসান হয় ২০১৫ সালে এক বহুপাকি চুক্তির মধ্য দিয়ে। চুক্তি অনুযায়ী ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করে। এর বদৌলতে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা। কিন্তু গত বছর ওই চুক্তি থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। একইসঙ্গে তিনি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে এনেছেন। কোনো দেশ যাতে ইরান থেকে তেল কিনতে না পারে, সেজন্যও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেেিত ইরান আবারও পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করার হুমকি দিয়েছে। একইসঙ্গে বলেছে, ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে তারা। এরপরই হরমুজ প্রণালির কাছে এক মাসের ব্যবধানে ৬টি তেল ট্যাংকারে হামলা হয়েছে। এ ঘটনায় ইরানকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা। হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ‘সব ব্যবস্থা’ নেয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। ইতোমধ্যে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ, পেণাস্ত্র প্রতিরা ব্যবস্থা ও বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে চললেও বিশ্লেষকেরা এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে নিয়ে কী করতে চাচ্ছেন। কারণ ইরানকে প্রতিনিয়ত হুমকি-ধমকি দিলেও ট্রাম্প নতুন আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চান না, এ কথা নানা সময়ে বলেছেন। সম্প্রতি ফোরিডায় তাঁর পুনর্র্নির্বাচনি ক্যাম্পেইন শুরুর ঘোষণার সময়ও ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এ অঞ্চলে প্রাণহানির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে তিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি বিশ্বে তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার কারণে ইতোমধ্যে তেলের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে তিকর প্রভাব ফেলবে।
ইরানের রেভোলুশনারি গার্ডের মেজর জেনারেল হুসেন সালামির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ড্রোন ভূপাতিত করে ইরান এটা স্পষ্ট করেছে যে, বিদেশি আগ্রাসন মোকাবিলায় তারা সম।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ২০০৩ সালে ইরাকের সাথে যুদ্ধে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যদি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ায় তাহলে এর ধরন ভিন্ন হবে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ‘প্রক্সি’ ফোর্সকে ব্যবহার করতে পারে। এ ফোর্স তেহরানের অনেক দূর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের ল্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম।
বিবিসির বিশ্লেষক জোনাথন মার্কাসের মতে, ইরানে হামলা হলে দেশটি নিশ্চয়ই পাল্টা আঘাত হানতো। হয়ত কোনো মার্কিন জাহাজ বা বিমান আক্রান্ত হতো। ইরান উপসাগরে জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল বিঘিœত করতে মাইন, ছোট আকারের নৌকা বা সাবমেরিন দিয়ে আক্রমণ চালাতো।
তার মতে, এ যুদ্ধ হবে অসম অর্থাৎ একটি প খুবই শক্তিশালী, অন্যপ অপোকৃত দুর্বল। চাপের মুখে পড়লে ইরান এই সংঘাতকে ছড়িয়ে দিতে পারে। এর ল্য হবে ওয়াশিংটনকে এটা দেখানো যে, ইরানের ওপর কোনো ছোট আকারের আঘাতও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে।
আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র হয়ত এটা বুঝেছে যে, আধুনিক যুগে কোনো যুদ্ধে প্রচলিত অর্থে জয়ী হওয়া যায় না। প্রকৃতপে দু’পই চায় কৌশলগত বিজয়। তবে সব সংঘাতেরই এমন কিছু পরিণতি হয়, যা পরিকল্পিত হিসাব-নিকাশে বোঝা যায়নি।
এদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস দিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ। তার দাবি, এই উত্তেজনার জন্য উসকানি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনবিসিকে দেয়া সাাৎকারে তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ালে তা কেবল ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেবে। সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধে ঠেকাতে বিশ্বের সব দেশকে এগিয়ে আসতে হবে।