প্রতিবেদন

রেলকে অধিকতর নিরাপদ করতে সরকারের নানা উদ্যোগ

বিশেষ প্রতিবেদক
তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে রেল এদেশে পরিচিত। তবে আবার রেলসেবার মান নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগও বেশ পুরনো। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় একটি কালভার্ট থেকে ঢাকা-সিলেট রুটের আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস ছিটকে পড়ে হতাহতের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর রেলকে আরও নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রেল ও সড়কপথের সমস্ত সেতু ও কালভার্ট জরিপ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি নড়বড়ে সেতু চিহ্নিত করে বর্ষার আগেই সেগুলো মেরামতের নির্দেশনা দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের ২ হাজার ৯২৯ কিলোমিটার রেলপথে ছোট-বড় কালভার্ট ও ব্রিজ রয়েছে ৩ হাজার ১৪৩টি। এ সব সেতুর অধিকাংশেরই নির্মাণকাল ব্রিটিশ আমলে হওয়ায় সেতুগুলোর বয়স বর্তমানে ৮০-১০০ বছর। বেশিরভাগ সেতু নির্মাণ করা হয় ১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে। এর মধ্যে স্বাধীনতাপূর্বকালে ১৯৩৫ সালের মধ্যে তৈরি ৯০ শতাংশ। স্বাধীনতাপূর্বকালে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দেশে রেলপথ নির্মিত হয় ২ হাজার ৮৫৮ দশমিক ২৩ কিলোমিটার এবং স্বাধীনতার পর নির্মাণ করা হয় ৯৭ দশমিক ৩ কিলোমিটার। এসব রেলপথে নির্মিত ৩ হাজার ১৪৩ ছোট-বড় সেতুর মধ্যে বর্তমানে ৪০২টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর সেতুগুলো সংস্কার না করার কারণে এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রেল কর্তৃপরে বছরভিত্তিক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৪০০ ব্রিজ ও কালভার্ট এখন চলাচলের অনুপযোগী বা ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো সংস্কার না হওয়ায় রেল চলাচলে ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) রেলের গতি ও যাত্রীসেবার মান বাড়াতে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২১টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ নবরূপায়ণসহ সম্প্রতি ১০ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৯৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কে একনেক চেয়ারপার্সন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গত ২৫ জুন অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন ও নির্দেশনা দেয়া হয়। সভাশেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রকল্প সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা সচিব নুরুল আমিন, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
জানা গেছে, ট্রেন চালকদের ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম গতিতে ট্রেন চালানোর নির্দেশ দিয়ে থাকেন রেল কর্তৃপ। স্বাভাবিক নিয়মে সেতুর ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৭০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন পরিচালনার কথা থাকলেও শুধু ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ট্রেনচালকরা ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতিতে এ সব সেতু পার করেন। এ সব ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর সংস্কার বা কোনো কোনো সেতু পুনর্র্নির্মাণের ল্েয প্রকল্প হাতে নিলেও তা বছরের পর বছর ধরে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে।
একনেকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, কুলাউড়ায় উপবন এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে রেল ও সড়কের সমস্ত সেতু ও কালভার্ট সার্ভে করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বর্ষার আগেই নড়বড়ে সেতু ও কালভার্ট চিহ্নিত করে সংস্কার করতে বলেছেন। কারণ, বর্ষা আরম্ভ হলে বৃষ্টিতে ভেঙ্গে পড়ার প্রবণতা বাড়বে।
প্রসঙ্গত, সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি গত ২৩ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল স্টেশন অতিক্রম করে কুলাউড়া আসার পথে রেলপথের একটি কালভার্ট ভেঙে পেছনের কয়েকটি বগি খালে পড়ে যায়।
মন্ত্রী জানান, রেলের বগি পড়ে হতাহতের ঘটনার পরিপ্রেেিত প্রধানমন্ত্রী দেশের সবগুলো রেলসেতু জরিপ করার দায়িত্ব দিয়েছেন রেলপথ এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে। জরিপের মাধ্যমে যেসব সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উঠে আসবে, সেগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া দেশের কোন কোন সড়ক অধিদপ্তর দেখাশোনা করবে, আর কোন কোন সড়ক এলজিইডি দেখাশোনা করবেন তা জরিপের পর ভাগ করে নিতেও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, একনেকে অনুমোদিত ১০ প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ৬ হাজার ৯৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে খরচ করা হবে ৬ হাজার ৬৮৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হবে ২৪১ কোটি ৫২ লাখ এবং প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া যাবে ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২১ রেল ইঞ্জিনের সমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে পুরাতন রেল ইঞ্জিনগুলো আরও ২০ বছর রেলপথে পরিচালনা করা যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ২৭২ ডিজেল ইঞ্জিন ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৬টির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এ অবস্থায় রেলের গতি বাড়াতে নতুন ইঞ্জিন কেনার পাশাপাশি এগুলো মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে এই ইঞ্জিনগুলো আরও ২০ বছর সেবা দিতে পারবে।
‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ২১টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ নবরূপায়ণ’ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২২ সাল নাগাদ এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। জানুয়ারি ২০১৯ হতে জুন ২০২২ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এতে লোকোমোটিভগুলোর কর্মমতা যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি চলাচলে গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে যাত্রীসেবা নিশ্চিত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।