কলাম

শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন নিশ্চিত সুফল বয়ে আনবে

খোরশেদ মাহমুদ
তৃতীয় বিশ্বের দেশ বাংলাদেশ। এদেশের অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি। কৃষিনির্ভর এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিালাভের একমাত্র আশ্রয়স্থল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গরিব মানুষের শিার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য, প্রাথমিক শিাকে জাতীয়করণ করেছেন। বিনামূল্যে বই বিতরণসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষা খাতের এই বড় পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার শিাবান্ধব হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। এটি আমাদের জন্য বড় একটি পাওয়া বলে আমি মনে করি।
বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের হাত ধরেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা প্রত্যহ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। সেই সাথে প্রাথমিক শিাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে এই বছর থেকেই। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে কোনো ধরনের পরীা থাকছে না। এবছরের চলতি শিাবর্ষ থেকেই এই তিন শ্রেণিতে সব ধরনের পরীা তুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই তিনটি শ্রেণির শিার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি, স্কুল থেকে দেয়া ডায়েরির রিপোর্টই মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পরীার চাপ যেন শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হতে না পারে, সেজন্যই এ পদপে নেয়া হচ্ছে। কারণ, সারাদেশে ৭০ হাজারেরও অধিক কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনের দৌরাত্ম্য কমিয়ে ৪ বছরের বেশি বয়সী শিশুকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী করতেই এ পদপে নেয়া হচ্ছে। চলতি বছর থেকেই তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিার্থীদের পরীা দিতে হবে না।
উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, শিশুদের তেমন কোনো পরীক্ষার চাপ থাকে না। শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য পরীক্ষা না নিয়ে স্কুলে উপস্থিতি, স্কুল থেকে দেয়া ডায়েরির রিপোর্টকেই মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুর ওপর থেকে পরীার চাপ কমাতে ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরসহ উন্নত বিশ্বের আদলে শিাব্যবস্থা সাজানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কোনোমতেই যেন কোমলমতি শিশুকে কোনো অতিরিক্ত চাপ না দেয়া হয়। তাহলেই তাদের শিার ভিতটা শক্তভাবে তৈরি হবে। শুধু চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পরীা নেয়া হবে।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা শিশু কিশোরদের জন্য মানসিক অত্যাচারের সামিল। কারণ বাংলাদেশের শিাব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে মূলত পরীার ওপর। প্রাথমিক থেকে শুরু করে একজন ছাত্রছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ৪টি পাবলিক পরীা দিতে হয়। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই সকল পরীক্ষা দিতে তাদের কোচিং, গাইড, বইয়ের পেছনে দৌড়াতে হয়। পরীা ও পাঠ্যবই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। নেই বিনোদন ও খেলার সামান্য সময়টুকুও। আর শহুরে জীবনের অবস্থা আরো নাজুক। শহুরে বিদ্যালয়গুলোতে সুদৃশ্য বহুতল ভবন থাকলেও নেই খেলার মাঠ। রয়েছে আলোবাতাসহীন রুদ্ধ পরিবেশ, একেবারে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে স্কুলে যাওয়া, ঘরে ফেরা। এ যেনো রোবট মানবে পরিণত হচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। এতে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য তিগ্রস্ত হচ্ছে, শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। খেলার মাঠ, আলো বাতাসময় খোলা পরিবেশ না থাকায় শিশুরা ঝুঁকে পড়ছে ভিডিও গেম ও সেল ফোনের দিকে। নানামুখী চাপে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব-কৈশোর। লেখাপড়ার অতিরিক্ত চাপ শিশুর পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিশুরা পড়ালেখা শিখতেই বিদ্যালয়ে যাবে। তারা তো আগে থেকে পড়ে আসবে না। বিদ্যালয়ের পড়া বিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে অন্তত কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমবে, সেই সাথে ভূঁইফোড় কিন্ডারগার্টেনমুখী হবে না শিশুরা। এ জন্য শিক্ষকদের আরো দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের পড়া বিদ্যালয়ে শেষ করতে পারলে শিশুরা পাবে খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য অনেক সময়। তাদের মেধা বিকাশে আর কোনো বাধা থাকবে না।
পৃথিবীর অনেক দেশেই ৭ বছরের আগে শিশুকে স্কুলে পাঠানো হয় না। সব শিার্থীর সমান মেধা থাকবে না এবং সবাই সবকিছু একরকম করায়ত্ত করতে পারবে না।
কিন্তু আমাদের শিশুদের বাবা-মায়ের এই বিষয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই । তাই আমাদের অধিকাংশ অভিভাবকের মধ্যে এমন একটি ধারণার জন্ম নিয়েছে যে, আমার সন্তান যদি এ-প্লাস না পায় আমি মনে হয় মুখ দেখাতে পারব না। এ জন্য কোমলমতি শিশুদের প্রতি তারা অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। একাধিক জায়গায় কোচিং করাতে হবে, না হয় ভালো ফল করবে না। যে প্রতিযোগিতাটা শিশুর মধ্যে হওয়ার কথা, তা আমরা দেখি বাবা-মায়ের মধ্যে একটু বেশি হয়ে যায়। এটাকে আমি একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা বলে মনে করি। আমাদের বাবা-মাকে অবশ্যই এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অমুকের বাচ্চা ভালো রেজাল্ট করেছে, আমার বাচ্চা পারবে না কেন? এই মানসিকতা আমাদের আগামী প্রজন্মের স্বাভাবিক বিকাশের যেমন তি করছে তেমনি শিাজীবনে শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বর্তমান শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই যুগোপযোগী শিক্ষাভাবনার পদক্ষেপটি ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার। কারণ ব্যাগভর্তি বই, একাধিক কোচিং, গাইড বই, প্রচ- পড়ার চাপ এগুলো থেকে অনেকটা মুক্তি দেবে আমাদের শিশুদের। তারা পাবে খেলা ও বিনোদনের জন্য সময়। এই আমূল পরিবর্তন আমাদের মা-বাবাদের ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্তি দেবে। সেই সাথে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় এই পরিবর্তন শিশুদের মন ও মেধা বিকাশে ভূমিকা রাখবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট