প্রতিবেদন

সেইভ দি চিলড্রেনের প্রতিবেদনের পর আদালতে রিট : অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান বন্ধ হবে তো?

নিজস্ব প্রতিবেদক
অনেক রোগী এবং তাদের আত্মীয়স্বজনরা মনে করেন, আমাদের দেশে কারণে-অকারণে রোগীর সিজারিয়ান করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে রোগী এবং রোগীর আত্মীয়স্বজন বেশ অসহায়। এমনকি সংশ্লিষ্ট অনেক চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট গবেষকরাও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন এবং এর আশু করণীয় নির্ধারণে মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল আদালতের শরণাপন্ন হতেও দেখা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২১ জুন। ওই দিন ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে গত ২ বছরে শিশুজন্মের েেত্র সিজারিয়ানের হার ৫১ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শিশুবিষয়ক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন। বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার বলে উল্লেখ করে সংস্থাটি বলছে, এতে বাবা-মায়েদের সন্তান জন্মদানে বিপুল খরচের ভার বহন করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে প্রসূতি মায়ের প্রয়োজন ছাড়া সিজার কার্যক্রম বন্ধে যাবতীয় নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন এক আইনজীবী। গত ২৫ জুন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।
শিশুজন্মের েেত্র অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার বাড়ার বিষয়ে সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তাই জনস্বার্থে রিট করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। তিনি জানান, আবেদনটি বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে। রিটের প্রেক্ষিতে আদালত জনস্বার্থে নির্দেশনা দেবেন এবং অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান নিয়ন্ত্রণ হবে বলে প্রত্যাশা সুমনের।
ব্যারিস্টার সুমন বলেন, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশুজন্মের েেত্র সিজারিয়ানের হার বেড়েছে ৫১ শতাংশ।
তিনি আরো বলেন, প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার উল্লেখ করা হয়েছে। তাই প্রতিবেদনটি সংযুক্ত করে হাইকোর্টে রিটটি করা হয়েছে।
সেভ দ্য চিলেড্রেনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিজারিয়ানে সন্তান জন্মদানে রয়েছে নানা রকম ঝুঁকি। মা ও শিশু উভয়কেই এমন অস্ত্রোপচার ঝুঁকিতে ফেলে। এ অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ফলে ইনফেকশন ও মাত্রাতিরিক্ত রক্তরণ, অঙ্গহানি, জমাট রক্ত ইত্যাদির কারণে মায়েদের সুস্থতা ফিরে পেতে প্রাকৃতিক প্রসবের তুলনায় দীর্ঘ সময় লাগে। এছাড়া সিজারিয়ানের কারণে প্রাকৃতিক জন্মের লাভজনক দিকগুলোও নষ্ট হতে পারে। যেমন মায়ের প্রসবের পথ দিয়ে শিশু যদি স্বাভাবিকভাবে বের হয়, তা হলে তার শরীর কিছু ভালো ব্যাকটেরিয়া গ্রহণ করতে পারে।
এসব ব্যাকটেরিয়া শিশুর রোগ প্রতিরোধ মতা তৈরি করে। এছাড়া বুকের দুধ পান করতে মায়ের সঙ্গে শিশুর যে শারীরিক নৈকট্যে আসা দরকার, সিজারিয়ান হলে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় দেরিতে ঘটে। কারণ মায়ের সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য শিশুকে তখন কিছু সময় দূরে রাখা হয়।

প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে
সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশি বাবা-মায়েরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানে খরচ করেছেন প্রায় ৪ কোটি টাকার বেশি। জনপ্রতি গড়ে তা ছিল ৫১ হাজার টাকার বেশি। এছাড়া ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রসবকালীন অস্ত্রোপচার ৪ থেকে ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে যত সিজারিয়ান হয়েছে তার ৭৭ শতাংশই চিকিৎসাগতভাবে অপ্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু তারপরও এমন সিজারিয়ান হচ্ছে। এমন অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার ঠেকাতে চিকিৎসকদের ওপর নজরদারির পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
সংস্থাটি আরও বলছে, সিজারিয়ানে সন্তান জন্মদানের হার বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মারাত্মক হারে বেশি। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যত শিশু জন্ম নেয় তার ৮০ শতাংশই হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।
সেভ দ্য চিলড্রেন এমন অপ্রয়োজনীয় প্রসবকালীন অস্ত্রোপচার ঠেকাতে ডাক্তারদের ওপর নজরদারির পরামর্শ দিচ্ছে। এমন প্রবণতার জন্য সংস্থাটি আংশিকভাবে বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা খাতের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছে।
সংস্থাটি বলছে, কিছু অসাধু চিকিৎসক এর জন্য দায়ী, যাদের কাছে সিজারিয়ান একটি লাভজনক ব্যবসা।
বাংলাদেশে সেভ দ্য চিলড্রেনের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং নবজাতক ও মাতৃ-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. ইশতিয়াক মান্নান বলছেন, ‘চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সুবিধা আসলে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে না গিয়ে অস্ত্রোপচার করতে অনুপ্রাণিত করে।’
শেষ কথা
অভিযোগ রয়েছে, দেশের অনেক সাধারণ মানের এমনকি অনেক নামিদামি চিকিৎসকও রোগীর শারীরিক ও আর্থিক অবস্থা চিন্তা না করে কেবল ব্যবসায়িক কারণে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সিজারিয়ানের সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মকা-ের ওপর সিনিয়র ডাক্তারদের যথাযথ তদারকি না থাকার কারণেও এমনটি হয়ে থাকে। এতে অনেক রোগীর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়ে থাকে। তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্ব থেকেই সিজারিয়ানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করে ডাক্তারদের এক্ষেত্রে অধিক মানবিক হওয়া উচিত।