অর্থনীতি

উন্নয়নের স্বার্থে মানুষকে পুঁজিবাজারমুখী করতে হবে : ৩৫ হাজার বিও হিসাব বন্ধ: প্রণোদনার পরও নিরুত্তাপ পুঁজিবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক
অর্থনীতির ভিত মজবুত করার জন্য এবং উন্নয়নকে টেকসই ও স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে মানুষকে পুঁজিবাজারমুখী করতে হবে। অথচ সরকারের আন্তরিকতা ও নানামুখী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কোনোভাবেই চাঙা করা যাচ্ছে না পুঁজিবাজার। উল্লেখ্য, এবারের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটেও শেয়ারবাজারের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার। তারপরও বিপুলসংখ্যক বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব বন্ধের ঘটনা ঘটছে। প্রত্যেক বছরের মতো এবারও নবায়ন না করা বিও হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ (সিডিবিএল)। এ বছর ৩৫ হাজার বিও হিসাব বন্ধ করা হয়েছে।
এদিকে নতুন অর্থবছরের বাজেটে প্রণোদনা ও নীতি-সহায়তা দেয়ার পরও পুঁজিবাজারে থামছে না দরপতন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত শেয়ারবাজারে বিও হিসাব ছিল ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ২৬টি। আর জুন মাসের শেষ দিন এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮ লাখ ৯ হাজার ৮৫০টিতে। অর্থাৎ এই ১ মাসে ৩৫ হাজার ১৭৬টি বিও হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে সিডিবিএল।
জুন মাসের শেষ দিন পুরুষ বিও হিসাব দাঁড়ায় ২০ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৩টি। মে মাসের শেষ দিন পুরুষ বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ২০ লাখ ৭৬ হাজার ৬৯৬টি। অর্থাৎ এ সময়ে পুরুষ বিও হিসাব বন্ধ হয়েছে ২৪ হাজার ৭০৫টি। একই সময়ে নারী বিনিয়োগকারীরা ১০ হাজার ৫১৬টি বিও হিসাব বন্ধ করেছে। মে মাসের শেষ দিন নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৭৫টি। জুন মাসের শেষ দিন তা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৫৫৯টিতে।
জুন মাসে কোম্পানির বিও হিসাব ৪৩টি বেড়েছে। অর্থাৎ জুনের শেষ দিন কোম্পানি বিও দাঁড়ায় ১৩ হাজার ২৯৮টিতে। আর মে মাসের শেষ দিন কোম্পানি বিও হিসাব ছিল ১৩ হাজার ২৫৫টি।
শেষ ১ মাসে শেয়ারবাজারে দেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ৩২ হাজার ৫৭৯টি। জুনের শেষ দিন দেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়ায় ২৬ লাখ ২৯ হাজার ২২৪টিতে। মে মাসের শেষ দিন দেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ২৬ লাখ ৬১ হাজার ৮০৩টি।
জুন মাসের শেষ দিন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩২৮টি। মে মাসের শেষ দিন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৬৮টি। এ হিসাবে জুন মাসে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ২ হাজার ৬৮০টি বিও হিসাব বন্ধ হয়েছে।

প্রণোদনার পরও নিরুত্তাপ পুঁজিবাজার
পুঁজিবাজার যেন তিগ্রস্ত না হয়, এ জন্য কোম্পানি মালিক, বিনিয়োগকারী সবার স্বার্থের কথা ভেবে নতুন অর্থবছরের বাজেটে প্রণোদনা দেয় সরকার। তার পরও পুঁজিবাজারে দরপতন অব্যাহত আছে। বাজেট পাসের পরের ৩ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বাজার মূলধন হারিয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন বিদেশিরা – এমন খবরও মিলছে।
সূত্র জানায়, এসইসি ও সরকারের প থেকে বোনাস লভ্যাংশ নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের তেমন উৎসাহিত হতে দেখা যায়নি। বরং বাজারে আরো সূচক ও লেনদেন কমেছে। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পর পুঁজিবাজারে যতটা অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি।
গত ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি রিজার্ভের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন। আর বোনাস লভ্যাংশের ওপর কোম্পানিগুলোর জন্য ১৫ শতাংশ কর প্রদানের প্রস্তাব করা হয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে রিজার্ভ ও বোনাস শেয়ারের ওপর এমন কর আরোপের প্রস্তাব করার পর শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দেয়। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা এ সিদ্ধান্তের ব্যাপক সমালোচনা করেন। পরে কিছুটা পরিবর্তন এনে সংসদে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির নির্দিষ্ট বছরের মুনাফার ৭০ শতাংশের বেশি রিটেইন আর্নিংস, রিজার্ভ বা সারপ্লাস হিসাবে রাখলে তার ওপরে ১০ শতাংশ হারে কর দেয়ার সংশোধিত প্রস্তাব করা হয়। অর্থাৎ কোম্পানির মুনাফার ৭০ শতাংশের বেশি রিজার্ভে রাখার েেত্র, পুরো অংশের ওপরে ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট বছরে নগদ লভ্যাংশের থেকে বেশি বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা বা বিতরণ করলে, তার ওপরে ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আর নগদ লভ্যাংশ না দিলেও বোনাস শেয়ারের ওপরে ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে – এমন সংশোধনী আনা হয়। কিন্তু এমন সুখবরেও বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়নি।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে ভালো শেয়ারের প্রচ- অভাব। পুঁজিবাজার নিয়ে অনেক উদ্যোগ নেয়া হলেও গত ১০ বছরে বাজারে প্রভাব রাখতে পারে এমন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পর পুঁজিবাজারে সাংহাই ও সেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ডিএসইর স্ট্রাটেজিক পার্টনার হয়েছে। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পর বাজারে যতটা অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। বাজারের উন্নয়ন করতে হলে ডিএসইতে রিসার্চ টিম এবং সুশাসন বাড়াতে হবে।
ডিএসইর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিদেশিদের শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকায় নেমে আসে। সদ্য শেষ হওয়া হিসাব বছরে বিদেশিদের শেয়ার ক্রয়ের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। বিপরীতে শেয়ার বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ২০১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এ হিসাবে ১৮৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা শেয়ার বিক্রি করেন বিদেশিরা। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত টানা ৪ মাস বিদেশিদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে দেখা গেছে। এর ফলে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগের পরিমাণ ৮ হাজার কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে।