প্রতিবেদন

প্রথম হজ ফাইট ঢাকা ছেড়েছে ৪ জুলাই: বিমানের বিশেষ ফাইট চলবে ৫ আগস্ট পর্যন্ত : হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা না করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

নিজস্ব প্রতিবেদক
হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা না করতে হজ এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, হজযাত্রীরা আল্লাহর মেহমান। তাঁদের সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে। হজযাত্রীরা নিজের টাকায় হজে যান, কারও দয়ায় নয়। বরং হজযাত্রীদের মাধ্যমে আপনারা ব্যবসা করেন।
রাষ্ট্রপতি গত ২ জুন রাজধানীর আশকোনায় হজ কার্যক্রম ২০১৯ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এ আহ্বান জানান। এখন থেকে কোনো ব্যক্তি বা এজেন্সি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে সরকার কঠোর হতে পিছপা হবে না বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।
এদিকে চার শতাধিক যাত্রী নিয়ে গত ৪ জুলাই চলতি মৌসুমের প্রথম হজ ফাইট সৌদি আরবের জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায়। সেদিন সকাল সোয়া ৭টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফাইট বিজি-৩০০১ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে।
বাংলাদেশ থেকে এ বছর ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজ করতে সৌদি আরবে যেতে পারবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭ হাজার ১৯৮ জন এবং বাকিরা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার সুযোগ পাবেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং সৌদি এয়ারলাইন্স হজযাত্রীদের পরিবহন করবে। জিলহজ মাসের চাঁদ দেখাসাপেে আগামী ১০ আগস্ট পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হতে পারে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা তানভীর আলম স্বদেশ খবরকে বলেন, প্রথম ফাইটে ৪১৯ জন হজযাত্রী জেদ্দা গেছেন। বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে উদ্বোধনী ফাইটের হজযাত্রীদের বিদায় জানান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ।
হজ কার্যক্রম ২০১৯ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, আমাদের দেশে হজ ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলোর ভূমিকা বিশাল। কারণ, হজযাত্রীদের ৯৫ শতাংশের বেশি এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গমন করেন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, অনেক এজেন্সি যেসব সুযোগ-সুবিধার কথা বলে তাদের মক্কা-মদীনায় নিয়ে যান, ওখানে যাওয়ার পর তা আর রা করেন না। ফলে হাজীদের অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে পড়তে হয়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, হজযাত্রীদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে একটি অসাধু চক্র সটকে পড়ে। সব কিছু পরিশোধ করেও হজযাত্রীরা যখন তাদের হজযাত্রায় অনিশ্চয়তা দেখেন তখন তারা বাধ্য হয়েই অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। শেষ সময়ে সরকারের হস্তেেপ সেসব হজযাত্রীকে হজে পাঠাতে হয়েছে। এহেন কার্যক্রম দেশের ভাবমূর্তি ুণœ করে। হাজীদের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা মোটেই কাম্য নয়।
রাষ্ট্রপতি উপস্থিত হাব নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বলেন, মক্কা-মদীনায় অবস্থানকালীন হাজী সাহেবানদের যাতে কোনো ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আপনাদের মনে রাখতে হবে, হজযাত্রীরা কারোর দয়া বা করুণার বিনিময়ে হজে যান না। বরং হজযাত্রীদের মাধ্যমে আপনারা ব্যবসা করেন। তাই ব্যবসার নামে প্রতারণা করবেন না। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এখন থেকে কোন ব্যক্তি বা এজেন্সি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে সরকার কঠোর হতে পিছপা হবে না।
একই সঙ্গে তিনি হজ ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত সরকারী কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে অবহেলা অনিয়ম দুর্নীতি পরিলতি হলে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানান।
হজযাত্রীদের বাংলাদেশের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, হজ উপলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রাতৃপ্রতিম হাজীদের সঙ্গে আপনাদের সাাত হবে। ভ্রাতৃত্বের এ মহামিলন পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি সৌহার্দ্যরে বন্ধন সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আপনারা শুভেচ্ছা দূত হিসেবে বাংলাদেশকে তুলে ধরবেন। আপনাদের আচার-আচরণ কথাবার্তায় কেউ যাতে কষ্ট না পায় আমাদের সম্পর্কে যাতে কোনো নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি না হয় সে দিকে বিশেষ খেয়াল রাখবেন।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ হজযাত্রীদের কাছে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য দোয়া চেয়ে বলেন, আপনারা বিশ্বমানবতার মুক্তি ও কল্যাণের জন্য দোয়া করবেন। আপনারা পবিত্র স্থানে যাচ্ছেন, আপনারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী বীর শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করবেন।
ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ, স্থানীয় সংসদ সদস্য সাহারা খাতুন, সচিব শাহাদাত হোসেন তসলিম, বিমান সচিব মুহিবুল হক, ধর্ম সচিব আনিসুর রহমান ও ঢাকার সৌদি দূতাবাসের হারাকান হুয়াইদি বিন শুয়াইয়াহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বিমানমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, এ বছর বিমানের সব টিকেট আগাম বিক্রি হয়ে গেছে। হাজীদের জন্য অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজ অপারেট করা হবে।
ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, অবিশ্বাস্য প্রচেষ্টায় এবার ঢাকা এয়ারপোর্টেই জেদ্দা এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশান করা হবে। এজন্য সৌদি টিম ইতোমধ্যে ঢাকায় এসে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এতে হাজীদের আর জেদ্দায় দুর্দশার শিকার হতে হবে না।
হাব মহাসচিব শাহাদত হোসেন তসলিম বলেন, ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বন্ধুপ্রতিম ভারতের সহায়তায় সাড়ে ছয় হাজার হজযাত্রীকে সৌদি আরব পাঠিয়ে হজের কার্যক্রম শুরু করেন। আজ তারই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে হজযাত্রীর সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ২৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এটা বিশাল অর্জন। এতে প্রমাণিত হয় দেশের আর্থসামাজিক ও ধর্মীয় চেতনা কতটা সমৃদ্ধ হয়েছে।

একনজরে চলতি বছরের হজ ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ থেকে এ বছর ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজ করতে সৌদি আরবে যেতে পারবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭ হাজার ১৯৮ জন এবং বাকিরা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার সুযোগ পাবেন। হজযাত্রীদের সৌদি আরবে পৌঁছে দিতে বিমানের বিশেষ ফাইট চলবে ৫ আগস্ট পর্যন্ত। আর ফিরতি ফাইট ১৭ অগাস্ট থেকে শুরু হয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। বিমান ১৫৭টি ডেডিকেটেড ও ৩২টি নিয়মিত ফাইটে ৬৩ হাজার ৫৯৯ জন হজযাত্রী পরিবহন করবে। আর ৮৬টি ডেডিকেটেড ও ২৯টি শিডিউল ফাইটে বিমান সৌদি থেকে হজযাত্রীদের দেশে আনবে। সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইনস সবগুলো ডেডিকেটেড ফাইটের মাধ্যমে বাকি হজযাত্রী পরিবহন করবে। এ বছরই প্রথম ঢাকা থেকে মদিনায় ১১টি হজ ফাইট পরিচালনা করা হবে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে জেদ্দা ১০টি, সিলেট থেকে জেদ্দা ৩টি, চট্টগ্রাম থেকে মদিনা ৭টি ডেডিকেটেড হজ ফাইট পরিচালনা করা হবে। বাকি ১২৬টি ফাইট ঢাকা থেকে জেদ্দায় নিয়ে যাবে হজযাত্রীদের।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ফারহাত হাসান জামিল গত ১ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রথমবারের মতো এ বছর কিছু ফাইটের জেদ্দা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ঢাকাতেই সম্পন্ন করা হবে। এজন্য সৌদি আরবের একটি ইমেগ্রেশন টিম ঢাকায় অবস্থান করছে।
তিনি জানান, প্রতিবারের মতো এবারও বিমানের ডেডিকেটেড হজ ফাইটের চেক-ইন, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা আশকোনা হজ ক্যাম্পেই হবে।
হজের টিকেট কেনার পর যাত্রার ২৪ ঘণ্টা আগে তারিখ পরিবর্তন করতে ২০০ ডলার এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রার তারিখ পরিবর্তনের েেত্র ৩০০ ডলার বা সমপরিমাণ টাকা মাশুল আদায় করা হবে এবার। এছাড়া নির্ধারিত ফাইটে না গেলে ওই টিকেটের অর্থ ফেরতযোগ্য হবে না।
ইকনোমি কাসের প্রত্যেক হজযাত্রী দুটি ব্যাগে সর্বোচ্চ ৪৬ কেজি এবং বিজনেস কাসে সর্বোচ্চ ৫৬ কেজি মালামাল নিতে পারবেন। এর বাইরে কেবিন ব্যাগেজে নেয়া যাবে সাত কেজি।
কোনো ধরনের ধারালো বস্তু যেমন ছুরি, কাঁচি, নেইল কাটার, ধাতব দাঁত খিলান, তাবিজ বা গ্যাসজাতীয় বস্তু যেমন অ্যারোসল এবং ১০০ মিলিলিটারের বেশি তরল পদার্থ হ্যান্ড ব্যাগেজে বহন করা যাবে না। কোনো ধরনের খাবারও সঙ্গে নেয়া যাবে না।
তাছাড়া গত কয়েক বছরের মতো এবারও জমজমের পানি আগেই বাংলাদেশে আনা হবে। হজযাত্রীরা ফিরে এলে বিমানবন্দরে তাদের হাতে ৫ লিটার করে পানি তুলে দেয়া হবে।