প্রতিবেদন

মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দেশব্যাপী চলমান অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাজারে জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল রয়েছে। সারাদেশের ফার্মেসিগুলোতে রয়েছে নিম্নমানের ওষুধ, নকল ওষুধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবার মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অধিদপ্তরের উদ্যোগে চলছে দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক সভা। একই সাথে চলছে ফার্মেসি পরিদর্শন, আনরেজিস্টার্ড, মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, ভেজাল ওষুধ জব্দকরণ ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। অধিদপ্তরের এমন কঠোর মনোভাবের কারণে এরই মধ্যে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফার্মেসি হতে ফেরত নিতে শুরু করেছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধগুলো স্থানীয় ওষুধ তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করে রিপোর্ট প্রেরণ করা হচ্ছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে। ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মেসার্স ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস এবং মেসার্স একমি ফার্মাসিউটিক্যালসে ধ্বংস করার সময় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান নিজে উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সাপ্তাহিক স্বদেশ খবরকে বলেন, ফার্মেসি ব্যবস্থাপনায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের লক্ষ্য ৩টিÑ জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ওষুধ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং প্রচলিত ওষুধ আইনের প্রয়োগ। তবে শুধু আইনের প্রয়োগ করলেই চলবে না, প্রয়োজন জনসচেতনতারও। নকল, আনরেজিস্টার্ড ওষুধ কিভাবে চেনা যাবে, ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা কিভাবে করতে হবে, ফার্মেসিতে ওষুধ কিভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, ইনভয়েসের মাধ্যমে ওষুধ ক্রয় করা কেন আবশ্যকÑ অনেক সময় ফার্মেসির মালিক ও ফার্মাসিস্টরা এসব তথ্য না জেনে অপরাধ করে থাকেন। এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সংস্থার মহাপরিচালক হিসেবে আমি নির্দেশনা দিয়েছি, দেশব্যাপী ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ যেন মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ওষুধ প্রতিরোধে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক সভা করেন। এতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানকল্পে সকলের পরামর্শ মোতাবেক বাজারকে মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও ভেজাল ওষুধমুক্ত করার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়।
জানা গেছে, কেবল নির্দেশনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান গত ২৪, ২৭, ২৮ ও ২৯ জুন এবং ১ জুলাই নিজে উপস্থিত থেকে জনসচেতনতামূলক সভা করেছেন ঢাকার মিটফোর্ড, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর এবং ঢাকার মিরপুরে। একই সাথে তিনি রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরে মডেল ফার্মেসি ও মডেল মেডিসিন শপ উদ্বোধন করেন। এছাড়াও অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ের কর্মকর্তাগণ জনসচেতনতামূলক সভা করেছেন চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, ঢাকার মিরপুর, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, নারায়ণগঞ্জ, বরগুনা ও গাজীপুরে।
অনুষ্ঠানগুলোতে মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ প্রতিরোধ করে বাংলাদেশের ফার্মেসি ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এর কোনো বিকল্প নেই।
জনসচেতনতামূলক এসব সভায় মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিষয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকে সচেতন হতে বলেন। তিনি জনসাধারণকে অনুরোধ করেন মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ দেখে ওষুধ ক্রয়ের জন্য এবং সেই সাথে ওষুধের নিবন্ধন আছে কি না, অর্থাৎ ওষুধের মোড়কে উঅজ বা গঅ নম্বর আছে কি না তা গুরুত্ব দিয়ে দেখার।
তিনি সভায় সংশ্লিষ্টদেরকে নির্দেশনা প্রদান করেন ফার্মেসির কোথাও বিক্রয়ের জন্য মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মজুদ বা সংরণ করা যাবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রয়ের জন্য সেলফ/ড্রয়ার/রেফ্রিজারেটর পাওয়া গেলে তা জব্দকরত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আলাদা কন্টেইনারে ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। বিক্রির জন্য নয়’Ñ লাল কালি দিয়ে লিখে সংরণ করতে হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট হস্তান্তর করতে হবে। এ বিষয়ে রেকর্ড সংরণ করতে হবে। কোনো ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেলে ফার্মেসিটি সিলগালা/বন্ধ করাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতি সপ্তাহে কমপে একবার ফার্মেসির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ ফার্মেসি ংবষভ রহংঢ়বপঃরড়হ করবেন এবং ফার্মেসিতে কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ড করত ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। বিক্রির জন্য নয়’Ñ লাল কালি দিয়ে লিখে আলাদা কন্টেইনারে সংরণ করতে হবে। এছাড়াও তিনি ঋঊঋঙ (ঋরৎংঃ ঊীঢ়রৎু ঋরৎংঃ ঙঁঃ) পদ্ধতি ওষুধ ব্যবস্থাপনায় অনুসরণের নিমিত্তে কম্পিউটার/আইটিভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সনাক্তকরণের পরামর্শ দেন।
জানা যায়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ বিগত ৬ মাসে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে মামলা করেছেন ৪২০টি, জরিমানা করা হয়েছে ৮২৯১৫০০ টাকা, জেল দেয়া হয়েছে ৫ ব্যক্তিকে, ফার্মেসি বন্ধ করা হয়েছে ৫টি। নিয়মিত এই অভিযান অব্যাহত আছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জুন হতে ২ জুলাই পর্যন্ত নকল, ভেজাল, আনরেজিস্টার্ড, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ফিজিশিয়ান স্যাম্পলের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে চাঁদপুর, খুলনা, কুষ্টিয়া, রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকায়। মোবাইল কোর্টে ১১টি মামলা দায়ের করা হয়, জরিমানা করা হয় ১,১৮,৫০০ টাকা এবং কারাদ- প্রদান করা হয় ১ জনকে। এর মধ্যে ৩০ জুন ঢাকার মানিকনগর এলাকায় র‌্যাব এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। এ সময় অবৈধ হারবাল ওষুধ তৈরির অপরাধে বনাজী চিকিৎসালয়ের মালিককে ৩ মাসের জেল ও খান ফার্মেসির মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এদিকে গত ২৩ জুন হাইকোর্ট বিভাগের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংক্রান্ত রিটের আদেশ বাস্তবায়ন বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে ওষুধ শিল্প সমিতি, বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি ও বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের সাথে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ২ জুলাই তারিখের মধ্যে দেশের সকল ফার্মেসি হতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ স্ব স্ব ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ফেরত গ্রহণপূর্বক সংগৃহীত ওষুধ ধ্বংস করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। ২ জুলাই তারিখের মধ্যে ৭৩টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ধ্বংস করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে অবহিত করেছে। অবশিষ্ট ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ আগামী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংগ্রহ করত ধ্বংস করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে অবহিত করবে। এ বিষয়ে আরও একটি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী ১০ জুলাইর মধ্যে সকল মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বাজার হতে তুলে নেয়া এবং ধ্বংস করা সম্ভব হবে।
এরই ধারাবাহিকতায় মেসার্স ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি ফার্মেসি হতে ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ গত ২ জুলাই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান, পরিচালক মো. রুহুল আমিন, স্থানীয় ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক মো. রাজিবুল হাবিব এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হয়।
মেসার্স স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি ফার্মেসি হতে ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ গত ১ জুলাই তারিখে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পাবনা কার্যালয়ের স্থানীয় ওষুধ তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হয়।
মেসার্স অ্যাডভান্সড কেমিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ ফার্মেসি হতে ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ গত ১ জুলাই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ে স্থানীয় ওষুধ তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হয়।
মেসার্স এরিস্টোফার্মা কোম্পানি দেশের বিভিন্ন স্থানের ফার্মেসি হতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ গত ২ জুলাই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের শ্যামপুর কার্যালয়ে স্থানীয় ওষুধ তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে ধ্বংস করে।
মেসার্স ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি ফার্মেসি হতে ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ গত ১ জুলাই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের গাজীপুর স্থানীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এবং প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক ড. খোন্দকার ছসীর আহমেদের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হয়।

গত এক সপ্তাহে
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি
২৭ জুন, ২০১৯ তারিখে রাজশাহীতে ওষুধ ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভা
২৮ জুন, ২০১৯ তারিখে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ওষুধ
ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভা
২৯ জুন, ২০১৯ তারিখে নাটোরে ওষুধ ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভা
২৭ জুন, ২০১৯ তারিখে চট্টগ্রামে ওষুধ ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভা
২৭ জুন, ২০১৯ তারিখে মতিঝিল, ঢাকায় ওষুধ ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভা
২৭ জুন, ২০১৯ তারিখে মোহাম্মদপুর, ঢাকায় ওষুধ ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভা
২৬ জুন, ২০১৯ তারিখে লক্ষ্মীপুরে ওষুধ ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভা
২৭ জুন, ২০১৯ তারিখে নারায়ণগঞ্জে ওষুধ ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভা
২৮ জুন, ২০১৯ তারিখ চাঁপাইনবাবগঞ্জে মডেল ফার্মেসি উদ্বোধন
২৯ জুন, ২০১৯ তারিখ নাটোরে মডেল ফার্মেসি উদ্বোধন
২৬ জুন, ২০১৯ তারিখ রাজশাহীতে মডেল ফার্মেসি উদ্বোধন
১ জুলাই, ২০১৯ তারিখে মিরপুর, ঢাকায় ওষুধব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত জনসচেতনতামূলক সভা