প্রতিবেদন

আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভা : বিভেদ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার কঠোর বার্তা

বিশেষ প্রতিবেদক
গত ১১ জুলাই রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় সরকারি দলের সভাকক্ষে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী এবং সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ওই সভায় সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সারাদেশে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়। এতে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের প্রায় সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
সংসদ সদস্যদের মধ্যে যারা নিজ নিজ এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, সভায় তাদের প্রতি কড়া বার্তা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের একতা শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতায় আছি ভেবে নির্ভার থাকলে চলবে না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টও আমরা ক্ষমতায় ছিলাম। তখন কেউ ভাবেনি ১৫ আগস্টের মতো বর্বরোচিত ঘটনা ঘটবে। তিনি বলেন, একতাই শক্তি।
বিভেদ সৃষ্টিকারী দলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে সভায় শেখ হাসিনা বলেন, ব্যক্তিস্বার্থের জন্য যারা আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধাচ্ছে, তৃণমূলে বিভেদ সৃষ্টি করছে, স্থানীয় নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতা করছে; তারা আগামীতে দলীয় মনোনয়ন পাবে না। তাদের জায়গা আওয়ামী লীগে হবে না।
তিনি এ সময় নবীন সংসদ সদস্য ও পুরনো সংসদ সদস্যদেরও বেশ কিছু গাইডলাইন দেন।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আমার কাছে তথ্য আছে এলাকায় কে কী করছে, সংগঠনের জন্য কী ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের (উপজেলা) প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, নৌকা নিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাহলে নৌকার বিরুদ্ধে কিভাবে অবস্থান নেন?
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপারে আমাকে ভাবতে হবে।
জানা গেছে, সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনীর পর রাত ৮টা ৪০ মিনিটে সভা শুরু হয়। চলে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা। সভার শুরুতেই জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুর-ই আলম চৌধুরী লিটনকে পুনরায় আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। এর আগে দশম জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো সংসদীয় দলের এই পদে দায়িত্ব পান মাদারীপুরের এই সংসদ সদস্য।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূলত দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে। তিনি সংসদীয় শৃঙ্খলা মেনে চলার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকায় দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলতেও এমপিদের নির্দেশ দেন। বিভেদ সৃষ্টিকারীদের কড়া বার্তা দেয়ার সময় সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের নাম উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, তিনি তার ভাইকে জেতানোর জন্য মাদারীপুরে না গেলেও পারতেন। সম্প্রতি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মাদারীপুর সদরে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজল কৃষ্ণ দের বিপক্ষে নির্বাচন করেন শাজাহান খানের আপন ছোট ভাই। এ নির্বাচনে শাজাহান খানের ভাই নির্বাচিত হন। আরও কয়েকটি নির্বাচন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।
নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদেরও সতর্ক করে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেকে আছে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হয়ে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে গ্রুপিং করেন। স্থানীয় এমপিদের সঙ্গে বিভেদ সৃষ্টি করে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে নিজেদের ‘আসন গোছানোর’ চেষ্টা করেন।
এসব কাজ না করার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, নারী এমপিরা যে বরাদ্দ পাবেন তা দিয়ে সংসদীয় আসন গোছানোর দরকার নেই। নিজ নিজ এলাকার নারীদের উন্নয়নে কাজ করবেন। নারী ভোটারদের জন্য কাজ করবেন।
এ ছাড়া বর্তমান সংসদের প্রায় ৬ মাস পার হওয়ার পরও দশম সংসদের যেসব মন্ত্রী-এমপি এখনো বাসা-অফিস খালি করেননি, তাদের দ্রুত তা খালি করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় সামাজিক অপরাধ দমনে সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। সংসদে বিএনপি এবং বিরোধী দলের এমপিদের সমালোচনা করার সময় সংসদীয় আদবকেতা মেনে চলতেও সবাইকে বলেন শেখ হাসিনা।
এ সময়ে চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী সংসদ সদস্যদের বকেয়া চাঁদার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এখনো চাঁদা পরিশোধ করেননি তারা পরিশোধ
করে ফেলবেন আশা করি। অন্যথায় শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধার কাগজ আটকে দেয়া হবে।
নিয়ম রয়েছে দলীয় সংসদ সদস্যরা প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে সংসদীয় দলের তহবিলে দেবেন। এ সময় হিসাব চাইলে নূর-ই আলম জানান, এখনো ১ কোটি টাকা চাঁদা বাকি রয়েছে। বরিশাল বিভাগের কেউই এই চাঁদা পরিশোধ করেননি বলে জানান সংসদীয় দলের সাধারণ সম্পাদক লিটন।
সংসদীয় দলের সভায় সংসদ নেতা শেখ হাসিনা সব সংসদ সদস্যকে সময়মতো অধিবেশনে হাজির হতে এবং অযথা সংসদ লবিতে সময় না কাটাতে বলেছেন। তিনি বাজেট বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধি হিসেবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে বলেন। সংসদ সদস্যদের সচিবালয়ে ঘোরাঘুরি না করতেও বলেন শেখ হাসিনা।