রাজনীতি

খালেদা জিয়া-তারেক রহমানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে বিএনপির রাজনীতি: হতাশ দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা

বিশেষ প্রতিবেদক
রাজনীতিতে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের জন্য তেমন কোনো সুখবর নেই। খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান কেন্দ্রিক আবর্তিত হচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এ রাজনৈতিক দলের সকল কর্মকা-। রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে দলের তেমন কোনো কর্মসূচি বা কর্মকা- খুব একটা চোখে পড়ে না। সর্বশেষ বিএনপির পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সংসদে যোগদান করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংসদকে বৈধতা দান করার পরও খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং দলের নিষ্ক্রিয়তায় হতাশ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি আছেন প্রায় দেড় বছর। তিনি কবে মুক্তি পাবেন, আদৌ পাবেন কি না এ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দলটির নেতাকর্মীরা। তাকে ছাড়া বিএনপির দলীয় কার্যক্রম চালানো এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এদিকে দলটির কাউন্সিল করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটা অংশ খালেদা জিয়াকে ছাড়া কাউন্সিল করার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান দ্রুত কাউন্সিলের ব্যপারে অনাগ্রহী Ñ এমনটাও শোনা যাচ্ছে। তবে দলের নির্বাহী কমিটির মেয়াদ শেষের কয়েক মাস পরও কাউন্সিল না হওয়ায় বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
বিএনপি দলীয় সূত্র বলছে, দলটির অধিকাংশ নেতাকর্মী যত দ্রুত সম্ভব কাউন্সিলের মাধ্যমে দল পুনর্গঠনের পক্ষে। দলের আরেকটি অংশ চায় খালেদা জিয়ার মুক্তির পরই দলের জাতীয় কাউন্সিল করতে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে খালেদা জিয়াকে ছাড়া জাতীয় কাউন্সিল করবে না বলে বিএনপির হাইকমান্ড দলের সিনিয়র নেতাদের জানিয়ে দিয়েছে।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয়ে পড়ে বিএনপিসহ দলটিকে নিয়ে গড়ে ওঠা জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এতে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দানা বাঁধে। গত কয়েক বছর ধরে সংকটের বেড়াজালে আটকে থাকা বিএনপি সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল, যা কার্যত ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। দলের তৃণমূল নেতারা এতদিন আশা করেছিল নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সংসদে যোগদানের বিনিময়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে। কিন্তু খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়েও কোনো আশার আলো দেখছে না দলের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় নিমজ্জিত দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী।
দলীয় সূত্র বলছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সর্বস্তরে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়লে দলের একাংশের নেতাকর্মীরা জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দল পুনর্গঠনের দাবি করে। দাবিটি জোরালো হতে থাকলে এ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকায় এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে থাকায় আপাতত কাউন্সিল করা যাচ্ছে না বলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের জানিয়ে দেয়া হয়।
এদিকে তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্তে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়ে জাতীয় সংসদে যোগ দেয়ার পর দলের সিনিয়র নেতারা প্রকাশ্যে এ সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা শুরু করেন। এরপর আবারও জাতীয় কাউন্সিলের বিষয়টি কৌশলে সামনে এনে পরিস্থিতি সামাল দেয়া হয়। তারেক রহমানের নির্দেশেই দলের কিছু সিনিয়র নেতা এমন কৌশল নেন বলে জানা যায়। একদিকে জাতীয় কাউন্সিল না করা এবং অপরদিকে তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্তে দলীয় কর্মকা- পরিচালিত হতে থাকায় ভেতরে ভেতরে অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তার এ বক্তব্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে বলে জানা গেছে।
এর আগে দলের অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ আরও ক’জন নেতা এমন বক্তব্য দিয়ে বিএনপি হাইকমান্ডের তোপের মুখে পড়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘ দিনের চাপা ক্ষোভ থেকেই খন্দকার মোশাররফ ও গয়েশ্বর রায়ের মতো নেতারা দলের ভেতরের গণতন্ত্র নিয়ে সমালোচনা করছেন।
সূত্র বলছে, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করায় কার নেতৃত্বে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হবে এ নিয়ে হাইকমান্ড অস্বস্তিতে রয়েছে। কোনো কোনো সিনিয়র নেতাকে দিয়ে মাঝেমধ্যে জাতীয় কাউন্সিলের বিষয়ে কথা বলিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের সান্ত¡না দেয়া হচ্ছে।
বিএনপির ঢাকা মহানগরী এলাকার থানা পর্যায়ের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেন, একাধিক মামলা আর রাজনৈতিক হয়রানির পরও ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচন ঘিরে আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। দেশের মানুষও আমাদের পক্ষে ছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং নিজেদের দুর্বলতার কারণে ‘নতুন দিনের আশা’ পূরণ হয়নি। দলের কাউন্সিলের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানো যাবে Ñ এমন বিশ্বাস নিয়ে আছি। কিন্তু তাও সময়মতো হবে বলে লক্ষণ দেখছি না। কী হবে কিছুই বুঝতে পারছি না। সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা কাউন্সিল নিয়ে হতাশায় আছে বলে আমার ধারণা।
বিএনপির আরেক নেতা বলেন, কাউন্সিল হলে বিএনপি নেতাকর্মীরা নতুন করে চাঙা হবে। কিন্তু এ নিয়ে গড়িমসি বা সময়ক্ষেপণ দল হিসেবে বিএনপির ক্ষতি করবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা এখন দল গোছানোর কাজ করছি। দল পুনর্গঠন করে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে নামব। পাশাপাশি আইনি লড়াইও চলবে। তবে দল গুছিয়ে রাজপথে নামার বিকল্প নেই। নতুন নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি মাঠে সরব থাকবে বলেও জানান এই নেতা।
বিএনপির সূত্র বলছে, দলটি আপাতত জেলায় জেলায় সভাসমাবেশ, মানববন্ধন ও প্রতীকী অনশন কর্মসূচি দেবে। চলতি বছরের অক্টোবর-নভেম্বরের ভেতর দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত করার চিন্তাভাবনা চলছে। এর আগে বিএনপির সাংগঠনিক ৮১টি জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটির কাজ শেষ করা হবে। এরই মধ্যে কমিটি গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে। বেশ কয়েকটি সহযোগী সংগঠনও ঢেলে সাজানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, সারাদেশে বিএনপি, ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে চাঙা করতে পৃথক কর্মসূচির চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সবাইকে দলগতভাবে শক্তি সঞ্চয় করতে বিএনপির পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে সারাদেশে আবারও সাংগঠনিক সফরের কথা ভাবা হচ্ছে। তবে কাউন্সিল না হলে এসব কর্মসূচি নেতাকর্মীদের কতটুকু সন্তুষ্ট করতে পারবে এ নিয়ে সন্দেহ আছে।
দলের গঠনতন্ত্র অনুসারে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিলের পর ৫৯২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করে বিএনপি। গঠনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতায় ৩ বছর পর পর জাতীয় কাউন্সিল করে নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন করতে হয়। সে হিসেবে এ বছর ১৯ মার্চের মধ্যেই জাতীয় কাউন্সিল করে কমিটি পুনর্গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও দলের হাইকমান্ডের অনুমতি না পাওয়ায় তা করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই দল চলছে।
বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীই চান যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় কাউন্সিল করে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের নিয়ে নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন করতে। বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীরাও এমনটিই চান। বিশেষ করে সংস্কারপন্থি বলে পরিচিত যেসব নেতা এখনও কমিটিতে ফিরে আসতে পারেননি, তারা চান নতুন কাউন্সিলের পর কমিটি পুনর্গঠন করা হোক।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে (যেখানে বেশ কিছু ফরেন ডেলিগেটদের উপস্থিতিও ছিলো) জাঁকজমকপূর্ণভাবে জাতীয় কাউন্সিল করেও এর সুফল পায়নি বিএনপি। জাতীয় কাউন্সিলের পর নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রুপিং-কোন্দল বেড়ে যায়। একপর্যায়ে যারা কমিটিতে স্থান পেতে আগ্রহী তাদের সবাইকে গণহারে স্থান দিয়ে ৫৯২ সদস্যের ঢাউস জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। এর ফলে জেলা-উপজেলা কমিটিতে স্থান পাওয়ার যোগ্য নন এমন নেতারাও কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেয়ে যান।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন কাউন্সিলের বিষয়ে নারাজ। কারণ, তারেক রহমান চান না তার ও তার মায়ের অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো সিনিয়র নেতার নেতৃত্বে দলের জাতীয় কাউন্সিল হোক। এতে তার নিজের প্রভাব খর্ব হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর বার বার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন স্তরের কমিটি গঠন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন, জাতীয় কাউন্সিলের অনুমতি না দেয়া ও একক সিদ্ধান্তে এমপিদের শপথ নিয়ে সংসদে যাওয়ার নির্দেশ দেয়ায় স্বল্পসংখ্যক নেতা ছাড়া দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের প্রতি নাখোশ। এমনকি খালেদা জিয়াও তারেক রহমানের কর্মকা-ে বেশ অসন্তুষ্ট বলে জানা যায়।