প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

‘গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী : জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের আরো সচেতন হওয়ার আহ্বান শেখ হাসিনার

এম নিজাম উদ্দিন
জলবায়ু পরিবর্তনকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে এর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বসম্প্রদায়কে আরো সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার পথ তৈরি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
গত ১০ জুলাই রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ২ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘ঢাকা মিটিং অব দ্য গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন শেখ হাসিনা। এতে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট হিলদা সি হেইন, গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশনের চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন এবং সম্মেলনের কো-চেয়ার ও বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা-সিইও ড. ক্রিস্টালিনা জর্জিভা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সামনের সারিতে থেকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন তাঁরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বান কি মুন এবং ক্রিস্টিলিনা জর্জিভা।
জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ‘অলৌকিক’ উল্লেখ করে অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেন, জলবায়ু অভিযোজনে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক এ দেশ।
আর বিশ্বব্যাংকের সিইও ক্রিস্টালিনা জর্জিভা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সামনের দিকে বাংলাদেশ। এ দেশের সাফল্যে তিনি মুগ্ধ বলেও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা অবগত আছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আমরা কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় দিয়েছি। কক্সবাজারের যেসব এলাকায় রোহিঙ্গারা অবস্থান করছে সেগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং তাদের উপস্থিতি এসব এলাকাকে আরো অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এসব বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে দেখভাল করার পাশাপাশি দ্রুততার সঙ্গে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য আমি বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কিভাবে কাজ করা যায় সে দিকনির্দেশনাও দেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, বর্তমানে এই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উদ্ভাবন ও অর্থায়নের যুগে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের অনেক সুযোগ রয়েছে, যা সবাই সহজে কাজে লাগাতে পারি। তথাপি আমি বলতে চাই, অভিযোজনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে জন্য সুষ্ঠু প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অভিযোজন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।
শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সবাইকে সজাগ থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, গ্লোবাল কমিশন অব অ্যাডাপটেশনের সহযোগিতায় আমরা জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সঠিক অভিযোজন কৌশলের পাশাপাশি সাশ্রয়ী পন্থা ও ঝুঁকি নিরসনব্যবস্থার সুবিধা পেতে চাই। আগামী সেপ্টেম্বরে ক্লাইমেট চেঞ্জ সামিটে প্রকাশিতব্য প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর জন্য আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি। ওই সভায় এলডিসিভুক্ত দেশসমূহ এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাকে বক্তব্য দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অভিযোজন প্রক্রিয়ায় অগ্রগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখানে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের দাবি রাখে। আমি বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করতে আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি।
জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে প্রায় এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ওপরে পৌঁছেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এডিবির জলবায়ু এবং অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিবেদনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আমাদের বার্ষিক জিডিপি ২ শতাংশ কমে যাবে। যদি বর্তমান হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আমাদের ১৯টি উপকূলীয় জেলা স্থায়ীভাবে ডুবে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বলছে, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৬০ লাখ জলবায়ু অভিবাসী রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এটি বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। তাপমাত্রার পরিবর্তন, ঘন ঘন বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রতল এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের বিস্তৃত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো কৃষি, শস্য, পশু ও মৎস্য সম্পদের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি করছে এবং বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তায় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেলের (আইপিসিসি) চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদন তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন ৮ শতাংশ ও গমের উৎপাদন ৩২ শতাংশ কমে যেতে পারে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক খাতে বিশাল উন্নতি হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবে এই অর্জনগুলো হুমকির সম্মুখীন বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম উল্লেখ করে তিনি বলেন, তা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার কৌশল আয়ত্তে আমরা একেবারে সম্মুখভাগে রয়েছি।
বিশ্বব্যাংকের সিইও ক্রিস্টালিনা জর্জিভা তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন আমি হাই স্কুলে পড়তাম। তখন থেকেই আমি এ দেশে আসার স্বপ্ন দেখতাম।
বাংলাদেশের সফলতার কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশ যেভাবে সাফল্য অর্জন করেছে, তাতে আমি মুগ্ধ। মানুষের মাথাপিছু আয় ১০০ ডলার থেকে বেড়ে ১৫০০ ডলার হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার পথে ভালোভাবেই রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। দেশটি বিশেষত নারীর ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেকটা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ১৫ দফা প্রস্তাব জাতিসংঘে গৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ১৫ দফা প্রস্তাব গত ১২ জুলাই জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। জেনেভায় মানবাধিকার পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের শেষ দিনে প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি পর্বে বাংলাদেশের প্রস্তাবটির ব্যাপারে কোনো দেশ আপত্তি জানায়নি। এরপর অধিবেশনের সভাপতি সবার সম্মতির ভিত্তিতে ভোট ছাড়াই প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার ঘোষণা দেন।
এর আগে সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও জেনেভায় জাতিসংঘের দপ্তরগুলোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এম শামীম আহসান জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার ইস্যুতে প্রস্তাবটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম প্রস্তাবটির পৃষ্ঠপোষক হয়েছে। এ ছাড়া ৪৩টি রাষ্ট্র এ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বলেন, এই প্রস্তাব ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাজ করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, আগে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে গতিতে পড়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল বাস্তবে তার চেয়েও অনেক দ্রুত ঘটছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর দায় কম থাকলেও প্রভাব পড়ছে অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তন এই দেশগুলোর মানবাধিকার চর্চা ও উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
সবার প্রতি, বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ও তাদের জনগণের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে প্রস্তাবে। এর তৃতীয় দফায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের কাঠামোর আলোকে মানবাধিকারসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করতে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান রয়েছে।
চতুর্থ দফায় ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিট’ আয়োজনে জাতিসংঘ মহাসচিবকে সহায়তা করতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রকে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও প্রশমন নীতি প্রণয়নে ব্যাপক পরিসরে, সমন্বিত, জেন্ডার সংবেদনশীল ও প্রতিবন্ধীবান্ধব উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে পঞ্চম দফায়।
প্রস্তাবের ষষ্ঠ দফায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে এমন উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে মানবাধিকার এবং প্রতিবন্ধীদের জীবিকা, খাদ্য ও পুষ্টি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সেবা উৎসাহিত করতে আন্তর্জাতিক সাহায্য ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
সপ্তম দফায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বলা হয়েছে।
মানবাধিকার পরিষদের ৪৪তম অধিবেশনে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবন্ধীদের অধিকার উৎসাহিতকরণ ও সুরক্ষা’ শীর্ষক আলোচনা ও কর্মসূচি নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে প্রস্তাবের অষ্টম দফায়।
ওই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার পরিষদের ৪৬তম অধিবেশনে মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে প্রস্তাবের নবম দফায়।
১০ম দফায় জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়ে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিশেষ দূতদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবেদন তৈরি ও মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপন করতে মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘের প্যানেল আলোচনায় শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের আমন্ত্রণ জানাতে বলা হয়েছে একাদশ দফায়। পরবর্তী দফাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার ইস্যুতে জাতিসংঘ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত থাকতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব ও মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারকে প্যানেল আলোচনা ও প্রতিবেদন তৈরিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতেও অনুরোধ জানানো হয়েছে।