প্রতিবেদন

চীন সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি চীনা নেতৃত্ব গুরুত্বের সাথে নিয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১ জুলাই থেকে ৬ জুলাই চীন সফর করেন। ৫ দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে গত ৬ জুলাই তিনি দেশে ফেরেন। রেওয়াজ অনুযায়ী প্রতিবারের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে তিনি চীন সফরসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
গত ৮ জুলাই চীন সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, চীন সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তিনি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। চীনের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন এবং এই সমস্যা সমাধানে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তির মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের পররাষ্ট্র নীতিই হচ্ছে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারোর সঙ্গে বৈরিতা নয়। কার সঙ্গে কার কী সমস্যা, কার সঙ্গে কার কী যুদ্ধ- সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। কোন দেশের সঙ্গে আমরা কতটুকু অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাব, সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারব- সে দিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা চলি। বৈদেশিক ঋণ গ্রহণেও আমরা সতর্ক।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে বাংলাদেশের মানচিত্রের সঙ্গে জুড়ে দেয়ার মার্কিন কংগ্রেসম্যান শ্যারনের প্রস্তাবকে ‘অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায় কাজ’ আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমার (বাংলাদেশ) যে সীমানা আছে, আমার যে দেশটা আমরা তাতেই খুশি। অন্যের জমি নিয়ে আসা বা অন্যের কোনো প্রদেশ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, এটা আমরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করি। এটা আমরা কখনই নেব না। প্রত্যেক দেশ তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে। সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে রাখাইন স্টেট জুড়ে দিতে চায় কেন? এ ধরনের কথা বলা অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায় বলে আমি মনে করি।
সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সব দেশেই হয়। কিন্তু একটা ভালো দিক যে এখন নির্যাতিত মেয়েরা সাহসের সঙ্গে সবকিছু বলছে, অতীতে মান-সম্মানের কারণে বলত না। তবে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। এসব ঘটানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। এ সময় ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ ছাড়াও মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব,
কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়
বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তির মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিই হচ্ছে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারোর সঙ্গে বৈরিতা নয়। কার সঙ্গে কার কী সমস্যা, কার সঙ্গে কার কী যুদ্ধ- সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। এক সময় চীন আমেরিকার বড় বন্ধু ছিল। এখন আবার তাদের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ। আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে যাই না। আমরা কারোর ঘরে আগুন লাগলে আলু পোড়া দিয়ে খাব, এটা চিন্তা করি না। বরং কোন দেশের সঙ্গে আমরা কতটুকু অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাব, সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারব- সে দিকে লক্ষ্য রেখেই চলি। বৈদেশিক ঋণ গ্রহণেও আমরা সতর্ক।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা খুব সতর্ক ও সচেতন। আমাদের বাজেটে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ তত বেশি নয়। জিডিপির মাত্র ১৪ ভাগ বৈদেশিক ঋণ। আমরা ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করি। বাজেটের ৯৯ ভাগ নিজস্ব অর্থায়নে আমরা বাস্তবায়ন করছি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করছে। সকল ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে থেকে কাজ করছি বলেই আমরা দেশকে সবদিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছি।
নিজের দেশের ভালো কাজগুলো বিশ্ববাসীর সামনে ভালোভাবে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের এবারের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১ ভাগে উন্নীত হয়েছে, যা বিশ্বের মধ্যে অনেকটাই রেকর্ড।

৬১ টাকায় গ্যাস কিনে সরকার
বিক্রি করছে মাত্র ৯ টাকায়
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে হরতাল সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ইস্যুতে বাম আর ডান (বিএনপি) মিলে গেছে। তিনি বলেন, দাম বাড়ানোর পরও বছরে সরকারকে ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
ভারত ও বাংলাদেশে গ্যাসের দামের পার্থক্য তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এলএনজি আমদানিতে খরচ বাড়ায় ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০০৪-০৫ সালে মিয়ানমারের গ্যাস নিতে চীন ও জাপান বিনিয়োগ করেছিল। ভারত সেই গ্যাস বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পাইপ লাইনে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া সেটা হতে দেয়নি। আমি হলে ভারতে গ্যাস নিতে তো দিতাম, আমার ভাগটাও রেখে দিতাম। সেই গ্যাসটা যদি পেতাম তাহলে আজ এলএনজি আমদানি করতে হতো না।
প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে খরচ হয় ৬১ টাকা ১০ পয়সা। ভারতে গৃহস্থালির জন্য স্থানভেদে গ্যাসের দাম ৩০-৩৭ টাকা প্রতি ঘনমিটার। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে দাম মাত্র ১২ দশমিক ৬০ টাকা। শিল্পে আমাদের গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সা, সেখানে ভারতে এটির দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন প্রসঙ্গে
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী সারাদেশে বিশাল আকারে পালন করা হবে জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, এ জন্যে সরকারিভাবে কমিটি গঠন করা হয়েছে, দলীয়ভাবেও পৃথক পৃথক কমিটি করা হয়েছে। ২০২০-২১ বর্ষকে আমরা মুজিববর্ষ ঘোষণা করেছি। রজতজয়ন্তী যেভাবে পালন হয়েছিল, এ বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার জন্মবার্ষিকী তারচেয়ে আরও ব্যাপক ও বিশালভাবে আমরা পালন করব। সেভাবেই আমরা কর্মসূচি সাজাচ্ছি।

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা
প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন কোনো সেশনজট নেই। শিক্ষার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রয়েছে। তাই এখন নিয়মিত পড়াশোনা করলে ২৩-২৫ বছরের মধ্যেই সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেয়া সম্ভব। এছাড়া গত ৩টি বিসিএসে দেখা গেছে, যারা বেশি বয়সী, তাদের পাসের হার খুবই কম।
৩টি বিসিএসের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩৫তম বিসিএসে ২৩ থেকে ২৫ বছরের প্রার্থীদের মধ্যে ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ, ২৫ থেকে ২৭ বছরের প্রার্থীদের মধ্যে ৩০ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ২৭ থেকে ২৯ বছরের প্রার্থীদের মধ্যে ১৩ দশমিক ১৭ শতাংশ পাস করেছে। এছাড়া ২৯ বছরের বেশি বয়সের প্রার্থীদের পাসের হার মাত্র ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ৩৬তম বিসিএসে ২৩ থেকে ২৫ বছরের প্রার্থীদের ৩৭.৪৫ শতাংশ, ২৫ থেকে ২৭ বছরের প্রার্থীদের মধ্যে ৩৪.৭৮ শতাংশ, ২৭ থেকে ২৯ বছর বয়সের ১৯.৮৯ শতাংশ প্রার্থী পাস করেছেন। এছাড়া ২৯ বছরের বেশি বয়সী প্রার্থীদের পাসের হার ৩.২৩ শতাংশ। ৩৭তম বিসিএসে ২৩ থেকে ২৫ বছরের ৪৩.৬৫ শতাংশ, ২৫ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে ২৩.৩৫ শতাংশ, ২৭ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৭.২০ শতাংশ প্রার্থী পাস করেছেন। এই পরীক্ষায় ২৯ বছরের বেশি বয়সী প্রার্থীদের পাসের হার মাত্র দশমিক ৬১ শতাংশ।