প্রতিবেদন

পিপলস লিজিং বন্ধ ঘোষিত: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশ্বাস সত্ত্বেও আমানতকারীরা আতঙ্কিত

বিশেষ প্রতিবেদক
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসকে (পিএলএফএসএল) অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে বন্ধ হয়ে যাবে প্রতিষ্ঠানটি। হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে এ অবসায়নের প্রক্রিয়া কার্যকর হবে।
ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে এই অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বহু দিন প্রতিষ্ঠানটি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। এ ছাড়া অন্যান্য অনিয়মের তথ্যসহ সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ ঘোষিত হয় পিপলস লিজিং। জানা যায়, বাংলাদেশে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের সিদ্ধান্ত এটাই প্রথম।
এরই মধ্যে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসের (পিএলএফএসএল) আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি অবসায়ন হলেও আইন ও বিধি অনুযায়ী সব আমানতকারীর অর্থ ফিরিয়ে দেয়া হবে। তাই আমানতকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
গত ১০ জুলাই বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জরুরি এক সংবাদ সম্মেলনে এই আশ্বাস দেয়া হয়।
জানা যায়, নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের ব্যর্থতায় পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয় আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনিতেই দিনের পর দিন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে ধরনা দিয়ে অর্থ ফেরত পাচ্ছিলেন না আমানতকারীরা। তাদের আশ^স্ত করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম ও নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, অবসায়ন হলেও আমানতকারীদের আতঙ্কের কিছু নেই। আমাদের কাছে যে হিসাব রয়েছে এতে প্রতিষ্ঠানটির আমানতের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ বেশি। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমানে আমানত রয়েছে ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা; এর বিপরীতে সম্পদ রয়েছে ৩ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত রয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এছাড়া প্রায় ৬ হাজার সাধারণ গ্রাহকের আমানত রয়েছে ৭০০ কোটি টাকার বেশি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দেয়া তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকে এ প্রতিষ্ঠানের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৬০৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। যদিও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিপলস লিজিংয়ের নিট সম্পদ মূল্য ১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা ঋণাত্মক রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনে উঠে আসে, পিপলস লিজিং থেকে বিতরণ করা ঋণের অধিকাংশই জালিয়াতির মাধ্যমে সাবেক পরিচালকরা তুলে নিয়েছেন। ভুয়া কাগজ তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ২০১৫ সালে ৫ পরিচালককে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে শুধু প্রতিষ্ঠানের নামে জমি কেনার কথা বলে নিজ নামে জমি রেজিস্ট্রি করার মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা। জমি রেজিস্ট্রির এ জালিয়াতির মাধ্যমে সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান ১১৬ কোটি টাকা, সাবেক পরিচালক খবির উদ্দিন মিয়া ১০৭ কোটি টাকা, আরেফিন সামসুল আলামিন, নার্গিস আলামিন ও হুমায়রা আলামিন ২৯৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন মর্মে তখন দুদকে প্রতিবেদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে সামসুল আলামিন কিছু অর্থ ফেরত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সালে তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য আমরা জানতে পারি। যেখানে পরিচালনা বোর্ডের অনেক সদস্যের অনিয়ম পাই। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিয়ে পরিচালনা বোর্ড ভেঙে দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করে, একই সঙ্গে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়। এরপর অনেক চেষ্টার পরও প্রতিষ্ঠানটি উন্নতি করতে পারেনি। তাই আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি অবসায়ন করার জন্য আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিই। গত মাসের ২৬ তারিখ মন্ত্রণালয় অবসায়ন করার অনুমতি দেয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটিকে অবসায়নের জন্য আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পিপলস লিজিংয়ের মতো অন্য যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংকটে রয়েছে তাদের অবসায়ন করা হবে কি না জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম জানান, আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের। এ জন্য যা যা করা দরকার আইন অনুযায়ী তেমন ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা আমানতকারী ও শেয়ার হোল্ডারদের আশ^স্ত করতে চাই, তারা যেন কোনো বিপদে না পড়েন সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সজাগ রয়েছে।
পিপলস লিজিং অবসায়ন হলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পেতে কত সময় লাগবে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পাওয়ার পর থেকেই আমরা কাজ শুরু করেছি। ইতোমধ্যে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব আমরা এ কার্যক্রম সম্পন্ন করব। তবে যেহেতু আমরা আদালতে যাচ্ছি, আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা আমানতকারীর অর্থ যত দ্রুত সম্ভব ফেরত দেয়ার চেষ্টা করব।