প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফর : রোহিঙ্গা সংকট সমাধান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশের পাশে থাকবে চীন

সোহরাব আলম
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক চীন সফর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ৫ দিনের তাৎপর্যপূর্ণ এই সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত বাস্তবায়ন করতে মিয়ানমারের সঙ্গে চীন কাজ করবে – এমন আশ্বাস মিলেছে চীনা নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে। রাজধানী বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ঢাকা ও বেইজিং মতৈক্যে পৌঁছায়। বিশ্বে ক্রমশ প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠা শেখ হাসিনা দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বেইজিংকে সম্মত করিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করতে চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের চীন সফরে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহযোগিতার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সংক্রান্ত ৯টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চীনা প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন সিপিসি’র কার্যালয় গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিংয়াং-এর সঙ্গে শেখ হাসিনার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হলো।
এছাড়া শেখ হাসিনা চীনের দালিয়ান শহরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এর বার্ষিক সভায় ‘কো-অপারেশন ইন দ্য প্যাসিফিক রিম’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন। দালিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে ওই আলোচনায় অংশ নিয়ে শেখ হাসিনা টেকসই বিশ্ব গড়ে তুলতে এবং ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী অথবা অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির মূল উদ্বেগ নিরসনের লক্ষ্যে ৫ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
জানা যায়, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরাতে আন্তরিকভাবে কাজ করবে চীন। এ ব্যাপারে ঢাকার প্রতি বেইজিংয়ের পূর্ণ সমর্থন ও সহাভূতি রয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সভায় যোগদান এবং চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য প্রধানমন্ত্রী গত ১ জুলাই ৫ দিনের জন্য চীন সফরে যান। ৬ জুলাই তিনি দেশে ফেরেন।
চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটির দালিয়ান শহরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এর বার্ষিক সভায় ‘কো-অপারেশন ইন দ্য প্যাসিফিক রিম’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন। তিনি চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। চীনা প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন সিপিসি’র কার্যালয় গ্রেট হল অব দ্যা পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিংয়াং-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। শেখ হাসিনা প্রবাসী বাংলাদেশীদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেন এবং তিয়েন আনমেন স্কয়ারে চীনা বিপ্লবের বীরদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী নেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সং তাও শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
অনন্য উচ্চতায় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও
পাশে থাকার অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দেশি-বিদেশি কূটনীতিকরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক চীন সফরকে ইতিবাচকভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে শেখ হাসিনা নিজেই এমন ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন সফর-পরবর্তী জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে।
তিনি বলেন, চীন সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আমরা জোরালোভাবে তুলে ধরেছি। চীনের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন এবং এই সমস্যা সমাধানে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। এটি একটি সুখবর।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারকে সম্মত করাতে চেষ্টা করবেন বলে চীনের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। তিনি উল্লেখ করেন, চীন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দু’বার মিয়ানমারে পাঠিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনে তারা আবারও মন্ত্রীকে মিয়ানমারে পাঠাবে।
তিনি বলেন, আমি উন্নয়নের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করি। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে এই শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘিœত হতে পারে বলে আমি উল্লেখ করি।
এর আগে গত ৫ জুলাই চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কাজ করার ব্যাপারে মতৈক্য হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় চীনের দিয়াওউয়াতি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক জানান, ঢাকা ও বেইজিং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সম্মত হয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিব বলেন, দুই নেতা প্রথমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সম্মত হয়ে বলেন, এটি অমীমাংসিত রাখা যাবে না। চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, এ ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২ বছর পেরিয়ে গেছে। কিভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। রোহিঙ্গারা অবশ্যই তাদের নিজ দেশে ফিরে যাবে।
পররাষ্ট্রসচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে, যা দেশের জন্য পরিবেশ ও নিরাপত্তার দিকে থেকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গারা যাতে তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারে সেজন্য বাংলাদেশ চীনের ‘গুড উইল’ কামনা করে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন এর আগেও রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
পররাষ্ট্র সচিব চীনের প্রেসিডেন্টকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘আমরা চাই রোহিঙ্গারা ফেরত যাক।’ জিনপিং বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমারে যেসব মন্ত্রী কাজ করেন তারা আবারও বাংলাদেশ সফরে আসতে পারেন। আশা করা যায়, এতে এ সংকট নিরসনের আরেকটি সুযোগ সৃষ্টি হবে।
জিনপিং বলেন, যেহেতু এটি (রোহিঙ্গা সংকট) আন্তর্জাতিক দৃষ্টির সামনে উঠছে সেহেতু এর পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা খুবই কম। আমরা এ সংকট সমাধানে যতটা সম্ভব চেষ্টা করব। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দু’দেশই আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমাদের কাছে দু’দেশই সমান, কেউ কম বা বেশি নয়। চীনের প্রেসিডেন্ট আশ্বাস দেন যে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দু’টিই যেহেতু উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু তারা (চীন) দু’দেশের স্বার্থই দেখবেন।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুই নেতার মধ্যে বৈঠকটি খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা ছিল খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ ও উন্মুক্ত, যা বিভিন্ন সমীকরণ ও রসায়নের বহিঃপ্রকাশ।
বৈঠক চলাকালে দুই নেতার অঙ্গভঙ্গি উৎসাহব্যঞ্জক ছিল উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব জানান, ‘প্রধানমন্ত্রীকে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, আমরা পরস্পরের সত্যিকারের বন্ধু হয়ে থাকব।’ তিনি বলেন, ‘অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে দুই নেতার মধ্যকার সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশকে চীনের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা দুই প্রতিবেশী দেশ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছি।’
জিনপিং বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করে বলেন, ‘দু’দেশ পরস্পরের উন্নয়ন থেকে শিক্ষা নিতে পারে। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুই নেতা গুরুত্বারোপ করে বলেন যে তাদের গন্তব্য হলো জনগণের উন্নয়ন।’ চীনের প্রেসিডেন্ট জাতীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন বোঝাপড়া রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
দু’দেশ পরস্পরের চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকারসমূহ বুঝতে পারে উল্লেখ করে জিনপিং বলেন, ‘এটি সম্পর্কের পরিপক্বতার বহিঃপ্রকাশ।’
চীনের প্রেসিডেন্ট তার দেশ সবসময় বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টার পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা আশা করি এটি ভবিষ্যতে আরো গভীর ও জোরদার হবে।’

‘কো-অপারেশন ইন দি প্যাসিফিক রিম’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায়
শেখ হাসিনা
চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটির দালিয়ান শহরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সভায় যোগদান এবং ‘কো-অপারেশন ইন দি প্যাসিফিক রিম’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। এতে টেকসই বিশ্ব গড়ে তুলতে এবং ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী অথবা অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির মূল উদ্বেগ নিরসনের লক্ষ্যে শেখ হাসিনা ৫ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এর বার্ষিক সভায় গত ২ জুলাই বিকেলে ‘কো-অপারেশন ইন দ্য প্যাসিফিক রিম’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। দালিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে ডব্লিউইএফ-এর ওই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মাঝেমধ্যে শুধু কয়েকটি বৃহৎ অর্থনীতির সক্ষমতা অথবা তাদের প্রয়োজনের আঙ্গিকেই সবকিছু দেখি। কিন্তু টেকসই বিশ্বের জন্য আমাদেরকে অবশ্যই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের অথবা অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতিগুলোর মূল উদ্বেগ নিরসনের উপায়ও বের করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার ৫ দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আমাকে বলছে যে, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ও দুর্বল অর্থনীতিকে মাথায় রেখেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে হবে। এগুলো হচ্ছে প্রথমত, দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ সৃষ্টি। দ্বিতীয়ত, টেকসই উন্নয়নের সব দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তৃতীয়ত, দেশগুলোর পারস্পরিক স্বার্থে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, সকলের জন্য সম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে সার্বিক উন্নয়ন করতে হবে এবং পঞ্চমত, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে যখন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি করা ছিল বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ইস্যু। তিনি বলেন, ‘আমরা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত করেছি এবং এখন বাংলাদেশ ও ভারত আন্তঃসীমান্ত নৌপথ উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি সবসময় বিশ্বাস করেন যে, আয়তনের দিক দিয়ে ভারতের চেয়ে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন ও যোগাযোগের মাধ্যমে নিজ ভূখ- ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি নীতিভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। ভূ-রাজনীতি সবসময়ই জীবনের একটি অংশ। তবে আমাদের সতর্কতার সঙ্গে ইস্যুগুলোকে মূল্যায়ন করে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। আমরা স্বল্প সময়ের অর্জনের জন্য দীর্ঘদিনের স্বার্থকে বিসর্জন দিতে পারি না।
শেখ হাসিনা বলেন, সকল দেশের মধ্যে অভিন্ন সমৃদ্ধি নিশ্চিতে এখনও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক বিশ্বের সবচেয়ে গতিশীল অঞ্চল বলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। একইভাবে, বঙ্গোপসাগর একটি উদীয়মান ও সমৃদ্ধ অঞ্চল। এই অঞ্চলে ১.৫ বিলিয়ন লোকের বসবাস। তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলটিকে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে।’
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের অংশগ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের বৈদেশিক ঋণ মোট জিডিপির ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এটা শক্তিশালী অর্থনীতির একটি লক্ষণ। চীন আমাদের অবকাঠামোগত কিছু প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং কাজ নদীর ওপর ৬ দশমিক ৯ কিলোমিটার সেতু নির্মাণে চীনা কোম্পানি নিয়োগ করা হয়েছে এবং এর সম্পূর্ণ তহবিল জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। অনেক মানুষ ‘ঋণের ফাঁদ’ নিয়ে কথা বলেন। আমার সোজা কথা। যতক্ষণ পর্যন্ত এই মেগা প্রকল্পগুলোয় জনগণের স্বার্থ রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ এবং সঠিকভাবে এতদসংক্রান্ত আলোচনার অধিকার রয়েছে এবং এ নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার কেনো কারণ নেই।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সরকারের গত ১০ বছরে আমি চেষ্টা করেছি, আমাদের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন আকাক্সক্ষাকে বিশ্বময় আমাদের বন্ধুদের কাছে ভারসাম্যময় ও লক্ষ্যভিত্তিক উপায়ে তুলে ধরার। আমি সবসময় এটা পরিষ্কার করে রেখেছি যে, বাংলাদেশ সামরিক কোনো উচ্চাকাক্সক্ষার প্রশ্রয় দেয় না। এটি আমাদের মূল্যবোধ ও নৈতিকতাবিরোধী।
তিনি বলেন, এর আগে আমাদের সরকারের গত টার্মে (২০১৪-১৮) আমরা সাবলীলভাবে ভারত-চীন-জাপান-যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ-রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছি। একটি দ্রুত বিকাশমান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রত্যেক বন্ধু রাষ্ট্রকেই প্রয়োজন এবং অবশ্যই কাউকে বাদ দিয়ে নয়।
শেখ হাসিনা বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও ভালো। আমাদের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীন আমাদের সঙ্গী। শুধু ওডিএ অংশীদার ছাড়াও জাপানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। রাশিয়াও আমাদের সঙ্গী, যারা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, এখন তারা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা খাতে সহায়তা করছে।
বাংলাদেশের আরসিইপি-এ (রিজিওনাল কমপ্রেহেন্সিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ) অথবা সিপিটিপিপি (কমপ্রেহেন্সিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) যোগদান সম্ভাবনা সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, মধ্য ৯০-এর দশকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম দ্রুত অর্থনীতি উদারীকরণের দেশ।
আমরা তখন এলডিসি এবং ছোট অর্থনীতি ছিলাম। ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও আমরা উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছি। আমরা উপলব্ধি করেছি যে, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বিশ্বের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ রক্ষাটা জরুরি। এখন থেকে ১০ বছর পর বাংলাদেশ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। এর জন্য আমাদের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা আমরা সংশোধন করতে প্রস্তুত। সুতরাং উন্মুক্ত আঞ্চলিকতার পক্ষে আমরা।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে ভারত, জাপান, চীন এবং আরও অনেকের সঙ্গে কাজ করছে। এ কারণে আমরা লক্ষ্যভিত্তিকভাবে বিসিআইএম-ইসি এর পাশাপাশি ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথে এগোচ্ছি।

দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় ৯টি চুক্তি স্বাক্ষর
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সংক্রান্ত ৯টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ৪ জুলাই চীনা প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন সিপিসি’র কার্যালয় গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিংয়াং-এর সঙ্গে শেখ হাসিনার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং’র সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে মিয়ানমারকে বোঝানোর বিষয়ে বেইজিং ঢাকাকে আশ্বস্ত করে।
দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সমস্যা দ্রুত সমাধানের বিষয়ে বৈঠকে চীনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা (রোহিঙ্গা সমস্যা) বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা।’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সিপিসি নেতার সাক্ষাৎ
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী নেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সং তাও নিশ্চিত করেছেন যে, তার দল কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না (সিপিসি) সমঝোতার ভিত্তিতে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি ও অন্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। গত ৫ জুলাই চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের দিয়াওউনতাই রাষ্ট্রীয় গেস্ট হাউজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে সিপিসি নেতা এ আশ্বাস দেন।
সং তাও বলেন, সমঝোতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আমরা সু চিসহ মিয়ানমারের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করব।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে ব্যাপক উন্নয়নের প্রশংসা করে তিনি আরো আশ্বস্ত করেন যে, এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে এবং বাংলাদেশে উন্নয়ন অভিযাত্রায় আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। সিপিসি নেতা বাংলাদেশের অত্যন্ত বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের উল্লেখ করে একে ‘বিশ্বে দুর্লভ’ বলে বর্ণনা করেন।
এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিগত অর্থবছরে ৮ দশমিক ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অপরদিকে চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
সিপিসি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মধ্যকার সম্পর্ক আরো গভীর হবে বলে সং তাও আশা প্রকাশ করেন। বৈঠকের শুরুতেই সিপিসি নেতা চীন সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। চীনকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সিপিপির মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি ১৯৯৩ সালে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে চীনে তার প্রথম সফরকে স্মরণ করে বলেন, সফরের পর থেকেই উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের ভিত মজবুত হয়। তিনি বলেন, আমরা সবসময় চেষ্টা করব যাতে আমাদের মধ্যকার ভালো সম্পর্ক বজায় থাকে।
প্রধানমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চীনা জনগণ ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে তার আন্তরিক অভিনন্দন জানান। এর আগে তিনি তিয়েনআনমেন স্কয়ারে চীনা বিপ্লবের বীরদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।