প্রতিবেদন

বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ভূয়সী প্রশংসা : তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস নেদারল্যান্ডসের রানীর

তারেক জোয়ারদার
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নেদারল্যান্ডস। গত ১১ জুলাই সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে এক বৈঠকে এ প্রতিশ্রুতি দেন
নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা জরিগুয়েতা সেরুতি। একই দিন সকালে হোটেল সোনারগাঁওয়ের প্যাসিফিক লাউঞ্জে দেশের বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকসহ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে অংশ নেন রানী ম্যাক্সিমা। ডিজিটাল আর্থিক সেবা সহজীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের যে বিকাশ ঘটেছে তার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। তিনি আর্থিক সেবায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করারও আশ্বাস দেন।
রানী ম্যাক্সিমা এর আগে গত ১০ জুলাই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের সর্বশেষ উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং এ খাতের অগ্রগতি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে কথা বলেন তারা। রানী ম্যাক্সিমা ও মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার উভয়েই দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং ঐতিহাসিক উল্লেখ করে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ১৯৭২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেদারল্যান্ডস সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি তুলে ধরেন রানীর সামনে। এ সময় রানী ম্যাক্সিমা তথ্যপ্রযুক্তিসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেন।
বৈঠকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব অশোক কুমার বিশ^াস, বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. জহিরুল হক, ডাক বিভাগের মহাপরিচালক এসএস ভদ্রসহ মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ১১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গেও বৈঠক করেন নেদারল্যান্ডসের রানী। তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ম্যাক্সিমা জাতীয় পরিচয় সিস্টেম প্রবর্তন করে তা ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোতে লিঙ্ক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে লিঙ্গবৈষম্য হ্রাসের বিষয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশল প্রণয়নে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
রানী ম্যাক্সিমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে গভর্নর বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মকে অন্তর্চালিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। পাশাপাশি দেশের প্রথম জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল (এনএফআইএস) প্রণয়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বৈঠকে রানী ডিজিটাল আর্থিক সেবায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। এছাড়া আর্থিক উদ্ভাবনের বিষয়গুলোর প্রতি যতœবান হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ সময় রানী ম্যাক্সিমা ডিজিটাল আর্থিক সেবায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। এছাড়া তিনি আর্থিক উদ্ভাবনের বিষয়গুলোর যতœ নেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ে একটি নতুন অফিস স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে ডেপুটি গভর্নরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির
ভূয়সী প্রশংসা
নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা জরিগুয়েতা সেরুতি সফরকালে ডিজিটাল আর্থিক সেবা সহজীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের যে বিকাশ ঘটেছে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আর্থিক সেবায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। ১১ জুলাই হোটেল সোনারগাঁওয়ের প্যাসিফিক লাউঞ্জে দেশের বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি বিশেষ করে তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকসহ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
বৈঠক শেষে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক এবং ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আর এফ হোসেন রানী ম্যাক্সিমাকে উদ্ধৃত করে এসব কথা জানান।
রুবানা হক বলেন, পোশাক খাতে এমন ইকো-সিস্টেম ব্যবস্থা দাঁড় করাতে হবে, যাতে শতভাগ শ্রমিককে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা যায়, এ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। রানী বলেছেন, প্রয়োজন হলে বিশ্বের যেসব প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল আর্থিক সেবা নিয়ে ভালো কাজ করছে তাদের সঙ্গে কারিগরি জ্ঞান বিনিময়ের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে তিনি সহায়তা করার আশ্বাস দেন। এছাড়া রানী ম্যাক্সিমা বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ জোরদারে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন বলে জানান।
রানী ম্যাক্সিমাকে উদ্ধৃত করে ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণে বড় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে আর্থিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনও লিঙ্গবৈষম্য রয়ে গেছে। পুরুষদের তুলনায় নারীরা ডিজিটাল আর্থিক সেবা বা ব্যাংকিং সেবা প্রাপ্তিতে পিছিয়ে আছে। এ বৈষম্য কমাতে আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা আরও কিভাবে ডিজিটালাইজড করা যায়, এ নিয়ে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
রানী বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতে ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। এদের কেবল অনলাইনে বেতন পরিশোধ করলে চলবে না, শ্রমিকরা যেন তাদের কেনাকাটা বা অন্যান্য লেনদেন অনলাইনে করতে পারে সেই ব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে।
উল্লেখ্য, রানী ম্যাক্সিমা জাতিসংঘ মহাসচিব অন্তোনিও গুতেরেসের ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স ফর ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক বিশেষ পরামর্শক। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা জোরদার, দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্যনিরাপত্তা ও শিক্ষার মতো উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর
সঙ্গে রানী ম্যাক্সিমার বৈঠক
নেদারল্যান্ডের রানী ম্যাক্সিমা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের মধ্যে গত ১০ জুলাই সোনারগাঁও হোটেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তারা দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের সর্বশেষ উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ।
প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ১০ বছরে তথ্য ও যোগাযোগ খাতসহ সামাজিক সূচকের সকল খাতে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে বাংলাদেশ। তৃণমূল পর্যন্ত প্রযুক্তি সেবা পৌঁছে দিতে ৫ হাজার অধিক ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে ৯০ মিলিয়নের অধিক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীসহ বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্বাস্থ্য ও বিভিন্ন প্রকার সেবার ব্যাপক প্রসার ও উন্নয়ন ঘটেছে। এছাড়াও নারী ক্ষমতায়নে, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন খাতে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। সরকার বর্তমানে এ সকল খাতে গুণগত মান উন্নয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে।
প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, এরই ধারাবাহিকতায় তরুণ উদ্যোক্তাদের পরিচর্যা, আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার জন্য ‘আইডিয়া (ওহহড়াধঃরড়হ উবংরমহ ঊহঃৎবঢ়ৎবহবঁৎ অপধফবসু) শীর্ষক প্রকল্প, মহিলাদের জন্য ঝযব চড়বিৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ওই ই-কমার্স সেবা প্রসারের লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে পরিচিতি যাচাই করণের সুবিধা আইসিটি বিভাগ হতে করা হচ্ছে বলে রানীকে অবহিত করা হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিধানের জন্য সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি স্থাপন করেছে। ইতোমধ্যে সরকার সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট প্লাটফর্মের কাজ হাতে নিয়েছে, যার মাধ্যমে গার্মেন্টসকর্মীদের ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানের জন্য আরএমজি ওয়ালেট সেবা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবকে সামনে রেখে তরুণদের মাঝে ইমার্জিং প্রযুক্তি যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডাটা, ব্লকচেইন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে।
নেদারল্যান্ডের রানী ম্যাক্সিমা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সরকারের এ সকল উদ্যোগকে সফল করার জন্য তিনি কেন্দ্রীয়ভাবে নতুন ব্যবসায় আইনগত অনুমোদনের একক প্রতিষ্ঠান চালু করার সুপারিশ করেন। এ উদ্যোগের জন্য নেদারল্যান্ড সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন রানী। তিনি বাংলাদেশের ব্যাংকিং সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণের জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সরকার কর্তৃক ইন্টার অপারেশনাবল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার প্রয়োজন মর্মে অভিমত ব্যক্ত করেন। সবশেষে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।