প্রতিবেদন

সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদকের মামলা

বিশেষ প্রতিবেদক
দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক এবার জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ (এস কে সিনহা) ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। গত ১০ জুলাই দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন বাদি হয়ে কমিশনের জেলা সমন্বিত কার্যালয় ঢাকা-১-এ এই মামলা দায়ের করেন। এরপর এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৮ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়। গত ১১ জুলাই ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এ দিন ধার্য করেন।
সাবেক ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) থেকে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে করা মামলার এজাহার গত ১১ জুলাই ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ ও মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস এজাহারটি গ্রহণ করে তারিখ ধার্য করেন।
দুদকের মামলায় জালিয়াতি ও প্রতারণা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণ অনুমোদনসহ ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। মামলার অপর আসামিরা হলেন ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) সাবেক এমডি এ কে এম শামীম, সাবেক এসইভিপি গাজী সালাহউদ্দিন, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মো. শাহজাহান, একই এলাকার বাসিন্দা নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা, এস কে সিনহার কথিত পিএস রঞ্জিত চন্দ্র সাহা ও রঞ্জিতের স্ত্রী সান্ত্রী রায় (সিমি)।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জানুয়ারি মাসে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনার অনুসন্ধান শুরু হয়। ফারমার্স ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিষয়টি দুদকের নজরে আসে। এরপর সংস্থার পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন ও সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। অনুসন্ধান শেষে তারা কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেন। কমিশন মামলার অনুমোদন দিলে সৈয়দ ইকবাল হোসেন বাদি হয়ে মামলাটি করেন।
নথিপত্রে দেখা যায়, মামলার এজাহারে ঘটনার সময় দেখানো হয়েছে ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর। মামলাটি দায়ের করা হয়েছে দ-বিধির ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪ (২) ও (৩) ধারায়।
এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের গুলশান শাখা থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ৪ কোটি টাকা ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে ওই টাকা একই দিনে পে-অর্ডারের মাধ্যমে এস কে সিনহার ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর করেন। পরে তিনি ওই টাকা ব্যক্তিগত হিসাব থেকে নগদে এবং চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে অন্য হিসাবে হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন। পাশাপাশি ওই টাকার উৎস ও অবস্থান গোপনের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে পাচার বা পাচারের চেষ্টায় সম্পৃক্ত ছিলেন।
এজাহারে আরো বলা হয়, আসামি মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুটি চলতি হিসাব খোলেন। এর পরদিনই তাঁরা ২ কোটি করে ৪ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। ব্যাংকে হিসাব খোলা এবং ঋণ আবেদনপত্রে দুজনই তাদের ঠিকানা বাড়ি নম্বর-৫১, সড়ক নম্বর-১২, সেক্টর-১০, উত্তরা আবাসিক এলাকা উল্লেখ করেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই বাড়িটি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ব্যক্তিগত বাড়ি। ঋণ আবেদনে ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে রনজিৎ চন্দ্র সাহার স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের সাভারে অবস্থিত ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করেন। তারা দুজনও সাবেক প্রধান বিচারপতির পূর্বপরিচিত ও ঘনিষ্ঠজন।
এজাহারে বলা হয়েছে, ঋণসংক্রান্ত আবেদন দুটি কোনো রকম যাচাই-বাছাই, রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ এবং ব্যাংকের কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই শুধু গ্রাহকের আবেদনের ওপর ব্যাংকের তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঋণ প্রস্তাব তৈরি করে হাতে হাতে সেটা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যান। প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটির কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই ছাড়াই অফিস নোট তৈরি করে তাতে স্বাক্ষর দিয়ে তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীমের কাছে নিয়ে যান। ফারমার্স ব্যাংকের ঋণনীতি অনুযায়ী ঋণ দুটির প্রস্তাব অনুমোদন করার ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের না থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনো যাচাই-বাছাই বা নির্দেশনা ছাড়া ওই ঋণ প্রস্তাব দুটির অনুমোদন দিয়ে দেন। ঋণ অনুমোদন হওয়ার পরের দিনই আবেদনকারীদের আবেদনের ভিত্তিতে ঋণ হিসেবে অনুমোদিত ৪ কোটি টাকার আলাদা দুটি পে-অর্ডার সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নামে ইস্যু করা হয়। পরে ওই পে-অর্ডার সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিমকোর্ট শাখায় এস কে সিনহার হিসাবে জমা হয়। তিনি বিভিন্ন সময় ক্যাশ ও চেক/পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তিকে দিয়ে ওই হিসাব থেকে টাকা তোলেন। পরে আরেকটি ব্যাংকে তাঁর ভাইয়ের হিসাবে ২ কোটি টাকার বেশি স্থানান্তর করেন এবং পরে ওই হিসাব থেকে বিভিন্ন সময় নগদ ও চেকের মাধ্যমে টাকা তোলেন। রনজিৎ সাহা ব্যাংকে উপস্থিত থেকে ঋণ আবেদন দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রধান বিচারপতির (এস কে সিনহা) নাম করে প্রভাব বিস্তার করেন। ঋণ আবেদনকারী নিরঞ্জন রনজিতের ভাতিজা এবং শাহজাহান ছোটকালের বন্ধু। তারা দুজনই অত্যন্ত গরিব এবং কখনো ব্যবসাবাণিজ্য করেননি বা তাদের কোনো ব্যবসা নেইÑ তা প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে।
এর আগে গত বছর জিজ্ঞাসাবাদের পর নিরঞ্জন ও শাহজাহানের আইনজীবীরা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহাকে ৪ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে তাঁর বাড়ির দাম। ফারমার্স ব্যাংকের পে-অর্ডারের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে সিনহার ব্যাংক হিসাবে ওই টাকা দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং কিছু পর্যবেক্ষণের কারণে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে ২০১৭ সালের অক্টোবরে ছুটি নিয়ে বিদেশে যান তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। পরে বিদেশে থেকেই তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।
মামলার বিষয়ে সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি ভুয়া ঋণপত্র সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থ পাচারের চেষ্টা ও অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশ করলেও প্রধান আসামি সিনহার এ্যাকাউন্টে একটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে টাকা রাখা হয়। এ অর্থের মূল উৎস গোপন রাখার অপরাধে কমিশন এ মামলা দায়ের করেছে।
প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এই প্রথমবারের মতো কোনো মামলা করলো দুদক। কিসের ভিত্তিতে এ মামলা দায়ের করা হলো Ñ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বলেন, দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। যার বিরুদ্ধেই দুদক অভিযোগ পাচ্ছে তার বিরুদ্ধেই স্বাধীনভাবে তদন্ত করছে ও প্রয়োজনে মামলা করছে। অর্থ পাচার বা পাচার চেষ্টা করেছেন আসামিরা এমন অভিযোগের তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
অপরাধ প্রমাণ হলে কী শাস্তি হতে পারে এ প্রসঙ্গে দুদক সচিব বলেন, আইন অনুযায়ী তার যা সাজা প্রাপ্য তা-ই হবে।
মামলার আগে সিনহার কোনো সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে কি না Ñ এ প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাই তা সঠিকভাবে বলতে পারবেন। তবে বিদেশে অবস্থান নেয়ায় তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এস কে সিনহাকে দেশে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ আছে কি না Ñ এমন প্রশ্নের জবাবে দিলোয়ার বখত বলেন, আমাদের দেশের আইনে সব ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তার ক্ষেত্রেও সেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া দুদক বিদেশে অবস্থানরত অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করেছে। সবার ক্ষেত্রে যা হবে তার ক্ষেত্রেও তাই করা হবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব বলেন, মূলত টাকার উৎস গোপন রাখা হয়, যা আইনে অপরাধ। অর্থপাচার ও পাচারের চেষ্টার কারণে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।