প্রতিবেদন

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে

বিশেষ প্রতিবেদক
এইচএসসি ও সমমানের পরীায় এ বছর সার্বিক পাসের হার ৭৩.৯৩ শতাংশ। গতবারের চেয়ে এ হার ৭ শতাংশের বেশি। এবার ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৯ শিার্থী পরীায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৭২ শিার্থী। এর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৪৭ হাজার ২৮৬ জন। শতভাগ পাস ৯০৯ এবং শতভাগ ফেল করেছেন ৪১ শিাপ্রতিষ্ঠানের শিার্থীরা। এছাড়া এবারের ফলাফলে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের পাসের হার বেশি।
গত ১৭ জুলাই এইচএসসি ও সমমানের পরীার ফল ঘোষণা করা হয়। ওইদিন সকাল ১০টায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ফলাফলের অনুলিপি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন শিামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এ সময় দেশের সব শিা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর দুপুর ১টায় শিা মন্ত্রণালয়ের সভাকে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ফল ঘোষণা করেন শিামন্ত্রী।
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরেই লিখিত পরীা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হচ্ছে। এবার লিখিত পরীা শেষ হওয়ার ৫৫ দিনের মাথায় ফল প্রকাশ করা হলো। গত ১ এপ্রিল চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের তত্ত্বীয় পরীা শুরু হয়ে শেষ হয় ১১ মে। এরপর ১২ মে থেকে ব্যবহারিক পরীা শুরু হয়ে ২১ মে শেষ হয়।
পরীার ফলাফলের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শিার্থীরা মনোযোগী হলে ভবিষ্যতে তারা আরও ভালো ফল করতে পারবে। এবার গড়ে ৭৩ দশমিক ৯৩ ভাগ শিার্থী পাস করেছে। এটা যথেষ্ট ভালো এবং গ্রহণযোগ্য ফল। আমি মনে করি, শিার্থীরা আরও মনোযোগী হলে আরও ভালো ফল করতে পারবে, সেটা আমার বিশ্বাস।
ছাত্রীদের পাসের হার বেশি হওয়ায় জেন্ডার সমতার কথা স্মরণ করিয়ে ছাত্রদেরও পাসের হার বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এবারও আমাদের ছাত্রীদের পাসের হার একটু বেশি। জেন্ডার সমস্যা বিশ্বব্যাপী প্রচলিত।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শিা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শিা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিা বিভাগের সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসেইন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম।
পরে শিা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ-২০১৯-এর জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচিত ১২ জন সেরা মেধাবীকে পুরস্কার প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।
গ্রেডিং পদ্ধতির প্রথম বছর ২০০৩ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীায় পাঁচ লাখ পরীার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ-৫ পেয়েছিল মাত্র ২০ জন। পাসের হার ছিল ৩৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ১৬ বছরের মাথায় এবার অনুষ্ঠিত পরীায় পাসের হার যেমন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, তেমনি জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা চলে এসেছে ৪৭ হাজার ২৮৬ জনে। ফলের চিত্র বলছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট ইউনিটের অধীনে খাতা মূল্যায়নে কঠোর ও কার্যকর পদ্ধতি চালুর পর পাসের হার বৃদ্ধিতে ছেদ পড়লেও এবার ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে পরীার্থীরা।
বিশেষজ্ঞরা ইংরেজী ও আইসিটিতে পাসের হার বৃদ্ধির বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, প্রতি বছর মূলত এ দুটি বিষয়ে বেশি শিার্থী ফেল করার কারণে মোট পাসের হার ব্যাপকভাবে কমে যায়। এবার দুটি বিষয়ে শিার্থীদের ভালো ফল পাল্টে দিয়েছে সার্বিক চিত্র। যদিও শিামন্ত্রী ডা. দিপু মনি সংবাদ সম্মেলনে এমন ফলের কারণ হিসেবে বলেছেন, শিার্থীদের ভালো প্রস্তুতি ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীা অনুষ্ঠিত হওয়ায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ বেড়েছে।

কোন বোর্ডে কেমন ফল
সাধারণ আট শিা বোর্ডের এইচএসসি পরীায় এবার পাসের হারের দিক থেকে কুমিল্লা বোর্ড এগিয়ে। কুমিল্লা বোর্ডে পাস করেছে ৭৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাস করেছে চট্টগ্রাম বোর্ডে, ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ। ১০ শিা বোর্ডের মধ্যে পাসের হার সবচেয়ে বেশি মাদ্রাসা বোর্ডে। এ বোর্ডে পাস করেছে ৮৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে আছে ঢাকা বোর্ড। এবার ঢাকা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮ হাজার ১৮৭ জন, গত বছর পেয়েছিল ১২ হাজার ৯৩৮ জন।
ঢাকা শিা বোর্ডের অধীনে এবার এইচএসসি পরীায় অংশ নিয়েছিল তিন লাখ ৯৩ হাজার ৮৩৫ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে দুই লাখ ৭৯ হাজার ৯৭৯ জন। পাসের হার ৭১ দশমিক ০৯ শতাংশ, গত বছর তা ছিল ৬৬ দশমিক ১৩ শতাংশ।
রাজশাহী শিা বোর্ডে পাসের হার ৭৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৬৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ছয় হাজার ৭২৯ জন, গত বছর যা পেয়েছিল চার হাজার ১৩৮ জন।
কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৭৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। কুমিল্লায় এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে দুই হাজার ৩৭৫ শিার্থী, গত বছর তা পেয়েছিল ৯৪৪ জন।
যশোর শিা বোর্ডে পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৬০ দশমিক ৪০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে পাঁচ হাজার ৩১২ জন, গত বছর তা পেয়েছিল দুই হাজার ৮৯ জন।
চট্টগ্রাম শিা বোর্ডে পাসের হার ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৬২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে দুই হাজার ৮৬০ শিার্থী, গত বছর তা ছিল এক হাজার ৬১৩ জন।
বরিশাল শিা বোর্ডে পাসের হার ৭০ দশমিক ৬৫ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৭০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে এক হাজার ২০১ জন, গত বছর যা পেয়েছিল ৬৭০ শিার্থী।
সিলেট শিা বোর্ডে পাসের হার ৬৭ দশমিক ০৫ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৬২ দশমিক ১১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে এক হাজার ৯৪ শিার্থী, গত বছর যা পেয়েছিল ৮৭৩ জন।
দিনাজপুর শিা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৭৮ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৬০ দশমিক ২১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে চার হাজার ৪৯ জন, গত বছর যা পেয়েছিল দুই হাজার ২৯৭ শিার্থী।
কারিগরি শিা বোর্ডে এ বছর পাসের হার বেড়েছে। ৮২ দশমিক ৬২ শতাংশ পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ২৩৬ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।
মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীায় পাসের হার ৮৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এবার জিপিএ ৫ পেয়েছেন দুই হাজার ২৪৩ শিার্থী। গত বছর ছিল এক হাজার ২৪৪ জন।
এইচএসসি পরীায় এবার বিদেশের আটটি কেন্দ্রে অংশ নিয়েছিল ২৭০ পরীার্থী। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৫৪ জন। পাসের হার ৯৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৬ জন।
পাসের হারে এগিয়ে থাকা কুমিল্লা শিা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম বলেন, যেসব বিষয়ে আগে আমাদের শিার্থীরা খারাপ ফল করেছে সেসব বিষয়ে আমরা বেশ কিছু কাজ করেছি। শিক প্রশিণ, শিকদের নিয়ে কর্মশালাসহ নানা কাজ আমরা করেছি। কি কি কারণে আমাদের খারাপ ফল হয়েছে তা চিহ্নিত করে পদপে নেয়ার কারণেই এবার পাসের হার বেড়েছে।