রাজনীতি

এরশাদবিহীন জাপার শক্তি অটুট থাকবে তো!

বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত চরিত্র সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর অবর্তমানে দলীয় সংহতি কতটা অটুট থাকবে এবং ভবিষ্যতে জাপার রাজনৈতিক চরিত্র কেমন হবে, তা নিয়ে নানা হিসাবনিকাশ চলছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা সক্রিয় থাকবে বা আগের মতো ফ্যাক্টর থাকবে কি না – এমন প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। দলটির নতুন চেয়ারম্যান এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের দলকে শক্তিশালী করতে পারবেন কি না সময়ই সেটা বলে দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাবেক সেনাশাসক জেনারেল এরশাদ ছিলেন জাপার ‘প্রাণশক্তি’। আমৃত্যু দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এরশাদের মৃত্যুতে দলের শক্তি অনেকটাই য় হয়েছে। তবে পূর্ণ শক্তিতে দলকে একতাবদ্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন নেতাকর্মীরা। এ জন্য যোগ্য নেতৃত্ব দরকার।
এদিকে এরশাদউত্তর জাপা নেতৃত্ব কার হাতে যাবে Ñ তাঁর ছোট ভাই জি এম কাদের নাকি রওশান এরশাদের – এ নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে চলছে ঠা-া লড়াই; যা এখনও ভেতরে ভেতরে বিদ্যমান। জি এম কাদের নিজেকে ‘ভারমুক্ত’ করে চেয়ারম্যান ঘোষণা দেয়ার মধ্য দিয়ে সে প্রশ্নের আপাত অবসান হলো। তবে সামনের দিনগুলোতে জাপার জ্যেষ্ঠ নেতারা তাঁর নেতৃত্ব মেনে চলেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরের নাম ঘোষণা করেছে জাতীয় পার্টি। ১৮ জুলাই রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে জি এম কাদেরকে দলের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। জাতীয় পার্টির প থেকে বলা হয়, দলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই জি এম কাদের জাপার চেয়ারম্যান হয়েছেন। চেয়ারম্যান ঘোষণার পর জি এম কাদের দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, জাতীয় পার্টিতে কোনো দ্বন্দ্ব, মতভেদ ও বিভেদ নেই; জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ।
এইচ এম এরশাদ একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর কে থাকবেন ওই পদে, এ প্রশ্নের উত্তরে জি এম কাদের বলেন, দলের সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার পর এ ব্যাপারে জানানো হবে।
উল্লেখ্য, জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ আমৃত্যু দলটির চেয়ারম্যান ছিলেন। গত ১৪ জুলাই তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) মারা যান। এর আগে গত ৪ মে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদ। এরশাদের ওই সিদ্ধান্তে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই অখুশি হন। তবে এ নিয়ে বড় ধরনের কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়নি। পার্টির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জাপার চেয়ারম্যান পদে জি এম কাদের এবং জাতীয় সংসদে দলটির সংসদীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে আপাতত রওশন এরশাদ থাকছেন। প্রয়াত জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দলটি জি এম কাদেরের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে- এ ব্যাপারে দলের নেতারা মোটামুটি একমত হন।
সূত্র জানায়, এরশাদ তাঁর জীবদ্দশায় জি এম কাদেরকে পার্টির দায়িত্ব দেয়ার পর থেকেই দলের একটি অংশ দলীয় কার্যক্রম এড়িয়ে চলতে থাকেন। তখন আশঙ্কা করা হয়েছিল, এরশাদের অবর্তমানে দলের চেয়ারম্যান এবং জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন তা নিয়ে জি এম কাদের ও বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দল আবার ভাঙতে পারে। তবে এখন নেতারা বলছেন, এরশাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তার সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় পার্টি চলবে। রওশন এরশাদ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকায় থাকবেন আর জি এম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করবেন। দলের ভাঙন ঠেকাতে জাপার প্রভাবশালী দুই নেতা বর্তমানে দায়িত্বপালনরত দুই গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকবেন।
এরশাদের জীবদ্দশাতেই আলোচনা ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। বিষয়টি এরশাদের বিবেচনাতেও ছিল। যে কারণে এরশাদ তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে ভাই জি এম কাদেরকে বেছে নেন, ঘোষণা দেন পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে। তবে তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ তা মন থেকে মেনে নেননি বলে আলোচনা আছে। এ নিয়ে রওশন ও কাদেরের অনুসারীদের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। তবে এরশাদের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা এবং দলের ভাঙন রোধে প্রয়াত চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দল চালানোর তাগিদ অনুভব করছেন সবাই।
পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ গত ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে এইচ এম এরশাদের জানাজা শেষে সাংবাদিকদের জানান, এরশাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পার্টি পরিচালিত হবে। এরশাদের স্বপ্ন পূরণে ঐক্যবদ্ধভাবে তারা জাতীয় পার্টিকে সামনে এগিয়ে নেবেন।
একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন এরশাদ। প্রথমে জি এম কাদেরকে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা মনোনীত করেন তিনি। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টে স্ত্রী রওশনকে ওই পদ দেন। চাপে পড়ে এরশাদ এমন করেছিলেন বলে দলটির নেতাকর্মীদের অনেকে মনে করেন। ভবিষ্যতে রওশন-কাদের দ্বন্দ্ব ডানা মেলে কি না এই আশঙ্কা করছেন দলটির কোনো কোনো নেতা।
জাপা নেতাদের একাংশ বলছেন, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে মধ্য দিয়ে পতনের পর এরশাদ ও তাঁর দল জাপা টিকে থাকবে, এমনটি অনেকেই ভাবেননি। অথচ প্রায় ৩০ বছর ধরে জাপা টিকে আছে এবং প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতায় যাওয়া- না-যাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করে দলটির সমর্থনের ওপর। এ েেত্র এরশাদের ভূমিকাই ছিল মুখ্য।
তবে অনেক রাজনৈতিক সমালোচকের মতে, জি এম কাদের, রওশন এরশাদ ও সরকারের পরোক্ষ ভূমিকার ওপরই জাপার ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে। তাদের মতে, সরকারের সদিচ্ছা আর জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের ঐক্যের ওপরই এরশাদবিহীন জাপার পরবর্তী পথ চলা।