অর্থনীতি

টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীল অর্থনীতির স্বার্থে শক্তিশালী পুঁজিবাজার চায় সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক : পুঁজিবাজারকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সরকার যে সচেষ্ট, তার প্রমাণ মিলেছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে। পুঁজিবাজারের জন্য লভ্যাংশের ওপর করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি, দ্বৈত কর বাতিল, কালো টাকা সাদা করাসহ নানা প্রণোদনা রাখা হয়েছে বাজেটে। বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয়কে করমুক্ত রাখা হয়েছে। একইভাবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের করমুক্ত লভ্যাংশ সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত দেশি-বিদেশি সব কোম্পানির শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের ওপর দ্বৈত করও পরিহার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেন, নিবাসী কোম্পানির ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর একাধিকবার করারোপ রোধ করার বিধান গত বছর কার্যকর করা হয়েছিল। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য এ বছর নিবাসী ও অনিবাসী সব কোম্পানির েেত্র এ বিধান কার্যকর করা হবে। এর ফলে নিবাসী কোম্পানির পাশাপাশি অনিবাসী কোম্পানির ডিভিডেন্ড আয়ের ওপরও একাধিকবার করারোপ হবে না।
কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানি থেকে নগদ লভ্যাংশ প্রাপ্তির প্রত্যাশা করেন। নগদ লভ্যাংশ প্রদানের ফলে পুঁজিবাজারের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি ও পুঁজিবাজার শক্তিশালীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু নগদের পরিবর্তে বোনাস শেয়ার বিতরণের প্রবণতা কোম্পানিসমূহের মধ্যে ল্য করা যায়। এতে বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রত্যাশিত লভ্যাংশপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ জন্য বাজেটে বোনাস লভ্যাংশের ওপর কোম্পানিগুলোর জন্য ১৫ শতাংশ কর প্রদান করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার বিষয়ে ১৮ জুলাই অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এ ল্েয চলতি বাজেটে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামীতেও পুঁজিবাজার উন্নয়নে সরকারের তরফ থেকে যা যা করা দরকার তা করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, শেয়ার বাজারের জন্য আমার কাজটা হবে একটা সুন্দর অবস্থান তৈরি করে দেয়া, যাতে করে শেয়ারবাজার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
তিনি বলেন, শেয়ারবাজার একটি বাজার। যারা এখানে বিনিয়োগ করবেন তারাই লাভবান হবেন Ñ বিষয়টি একেবারে এমন নয়। লাভও হতে পারে, লোকসানও হতে পারে। প্রত্যেক দেশেই পুঁজিবাজারে মাঝেমধ্যে শেয়ারের দাম কমে। তবে এখন বাজারের যে অবস্থা সেটা খুব বেশি দিন থাকবে না। বাজার অবশ্যই ভালো হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ১৯২৯ থেকে ’৩৩ সাল পর্যন্ত চার বছরে বিশ্বে একবার বাণিজ্যযুদ্ধ হয়েছিল। সে সময় ২০ হাজার আইটেমের ওপর ট্যারিফ বসানো হয়। তাই সারা বিশ্বে প্রায় ৬৬ শতাংশ বাণিজ্য কমে গিয়েছিল। ক’দিন আগে চায়না এবং আমেরিকার মধ্যে একটা সমস্যা সৃষ্টির কারণে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মতো ট্রেড কমে গেছে। এ জিনিসগুলো অনেক সময় শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলে। তবে সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়ে আসছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক দেশের পুঁজিবাজারে শেয়ারের দাম কমে, আবার বাড়ে। তবে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করলে তিগ্রস্ত হওয়ার নজির নেই। তিগ্রস্ত হয়ে ভারতে পুঁজিবাজারের ইনডেক্স চলে এসেছিল ১৮ হাজার থেকে ৭ হাজারে। সেখানে কমেছে আবার বেড়েছে। আমাদের এখানেও বেড়েছে আবার কমেছে। আমাদের পুঁজিবাজারে এখন খুব বেশি ওঠানামা নেই। স্থিতিশীল রয়েছে।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের জন্য সরকারের যেটুকুু করার সেটুকুু করা হবে। আমাদের অর্থনীতি খুব শক্তিশালী, এটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাহলে অর্থনীতির প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়ছে না কেন – প্রশ্ন রাখেন তিনি। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে এটার প্রভাব আসা উচিত। পুঁজিবাজারে শক্তিশালী বা বড় বিনিয়োগকারী ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থাকা দরকার। তবে আমাদের পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর সংখ্যাই বেশি।
এদিকে বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি এ কে এম মিজানুর রশিদ চৌধুরী বলেন, পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় আমরা ১৫ দফা দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে তার কার্যালয়ে যাই। উনার ব্যস্ততার কারণে দেখা হয়নি। তবে পরবর্তী সময়ে দেখা করার আশ্বাস মিলেছে। তাই আমরা আমাদের দাবি সংবলিত স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেয়া স্মারকলিপিতে বাইব্যাক আইন পাস করে ইস্যু মূল্যের নিচে অবস্থানকারী শেয়ারগুলো বাইব্যাক করার দাবি জানান বিনিয়োগকারীরা। প্লেসমেন্ট শেয়ারের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করে এসব শেয়ারের লকইনের মেয়াদ ৫ বছর করা। আর পুঁজিবাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত সকল প্রকার আইপিও ও রাইট শেয়ার অনুমোদন বন্ধ রাখার দাবিও রয়েছে। এছাড়া আইপিওতে (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) সাধারণ বিনিয়োগকারীর কোটা ৮০ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। অপ্রদর্শিত অর্থ বিনা শর্তে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগও চেয়েছেন তারা। ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত তিগ্রস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণের সুদ সম্পূর্ণ মওকুফের দাবি রয়েছে তাদের।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবদুর রাজ্জাক বলেন, স্থিতিশীলতার জন্য বিভিন্ন দাবি নিয়ে আমরা অনেকবার এসইসিতে গিয়েছি। খন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী পুঁজিবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছি। তবে এই কমিশন আমাদের দাবি বরাবরই উপো করেছে
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, শেয়ারবাজারে লাভ-লোকসানের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। পুঁজিবাজারে সরকারের শেয়ার খুব কম। এখান থেকে সরকার শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যাবে, এমনটি নয়।
সুতরাং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে সুখবর রয়েছে; রয়েছে আশার বাণী। অতএব, পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বিগত দিনে পুঁজিবাজারের যে সংকট গেছে আশা করি, তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে এমনটাই ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।