প্রতিবেদন

পাইল বসানোর কাজ শেষ: নির্ধারিত সময়েই সম্পন্ন হবে পদ্মাসেতু নির্মাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
দ্রুত এগিয়ে চলছে পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ। রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি হাজার মানুষের ঘাম ও শ্রমে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় এ প্রকল্পের নির্মাণকর্মযজ্ঞ। প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে একে একে দাঁড়াচ্ছে স্বপ্নের সেতুর একেকটা পিলার। ইতোমধ্যে ২৯৪টি পাইল ড্রাইভ বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে পদ্মাসেতুর ওপর দিয়ে যান চলাচল করতে পারবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পদ্মাসেতুর সর্বশেষ পাইল ড্রাইভের কাজ গত ১৪ জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে শেষ হয়। ওইদিন সকালে সেতুর ২৬ নম্বর পিলারের ৭ নম্বর পাইল বসানোর কাজ শুরু হয়। শেষ হয় রাত সাড়ে ৮টার দিকে। সেতুর পাইল বসানোর কাজ শেষ হওয়ায় প্রকল্প এলাকায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে।
এদিকে পদ্মাসেতুর ৪২টি পিলারের মধ্যে ৩০টির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পিলারের ওপর ১৪টি স্প্যান বসানো হয়েছে। স্থায়ী ১২টি ও অস্থায়ী দুটি মিলিয়ে ১৪টি স্প্যান বসেছে। এতে মূল সেতুর ২১০০ মিটার এখন দৃশ্যমান।
অন্যদিকে নদীর দু’পারে থাকা ভায়াডাক্টের ওপর ৭টি করে ১৪টি রেলওয়ে স্প্যান এবং জাজিরা প্রান্তে ২৩৪টি সুপার-টি গার্ডার ও মাওয়া প্রান্তে ২০৪টি সুপার-টি গার্ডার মিলিয়ে ৪৩৮টি সুপার-টি গার্ডার বসবে। এতে মোট রোডওয়ে স্প্যান হবে ৮৩টি। রেলওয়ে গার্ডারের স্প্যান বসেছে ৭টি। তবে রোডওয়ে সুপার-টি গার্ডারের কোনো স্প্যান এখনও বসানো হয়নি।
সূত্র জানায়, ৩ মিটার পরিধির একেকটি পাইল পদ্মা নদীর ১২০ মিটার পর্যন্ত তলদেশে গেছে। ১ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি প্রতি সেকেন্ডে প্রবাহিত হয়ে থাকে পদ্মা নদী দিয়ে। খরস্রোতা এ নদীতে যাতে পাইলের ওপর পিলার ১০০ বছরের বেশি সময় টিকে থাকে, সেভাবেই নদীতে পাইল ড্রাইভ করা হয়েছে। চীন থেকে আসা স্টিল প্লেট দিয়ে পাইল তৈরি করা হয়েছে মাওয়া কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে।
সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ৩০ জুন পর্যন্ত মূল সেতুর ৮১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নদীশাসন কাজের ৫৯ শতাংশ এবং প্রকল্পের সার্বিক কাজের ৭১ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে।
মূল সেতুর নির্মাতা চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে পাইল বসানোর কাজ করতে দেয়া হয়েছিল। তাদের চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের ১৬ দিন আগে পাইল বসানোর কাজ শেষ হলো। নির্মাণকাজের শুরুতে ২৬৪টি পাইলের ওপর ৪২টি পিলার তৈরির নকশা করা হয়। কিন্তু নদীর গভীর তলদেশে কাদামাটির স্তর ও গঠনগত বৈচিত্র্য থাকায় নতুন নকশা করতে হয়। এ নকশায় ১ ও ৪২ নম্বর পিলারের ১৬টি করে মোট ৩২টি পাইল করা হয়। আর ২২টি পিলারে ৭টি করে মোট পাইল ১৫৪টি এবং ১৮টি পিলারে ৬টি করে মোট ১০৮টি পাইল রাখা হয়। সব মিলিয়ে ৪২টি পিলারে পাইল রাখা হয় ২৯৪টি।
৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ সেতুর কাঠামো। মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি)। নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। সেতুর দুই প্রান্তে টোল প্লাজা, সংযোগ সড়ক, অবকাঠামো নির্মাণ করছে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিয়ারে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো দৃশ্যমান হয় পদ্মাসেতু। এরপর ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি ৩৮ ও ৩৯ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় দ্বিতীয় স্প্যান। গত বছরের ১১ মার্চ ৩৯ ও ৪০ নম্বর খুঁটির ওপর বসে তৃতীয় স্প্যান। ১৩ মে ৪০ ও ৪১ নম্বর খুঁটির ওপর চতুর্থ স্প্যান বসানো হয়। পঞ্চম স্প্যান বসানো হয় গত বছরের ২৯ জুন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায়। ২০১৮ শেষ দিকে মাওয়া প্রান্তে ৪ ও ৫ নম্বর পিয়ারের ওপর একটি স্প্যান বসানো হয়। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি জাজিরা প্রান্তের তীরের দিকের সপ্তম স্প্যান বসে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি জাজিরা প্রান্তে ৩৬ ও ৩৫ নম্বর পিয়ারের ওপর অষ্টম স্প্যান বসানো হয়। সেতুর ৩৫ ও ৩৪ নম্বর পিয়ারের ওপর গত ২২ মার্চ নবম স্প্যান বসে। ১০ এপ্রিল মাওয়া প্রান্তে ১৩ ও ১৪ নম্বর পিয়ারের ওপর ১০ম স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে সেতু ১ হাজার ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যে রূপ নেয়। ২৩ এপ্রিল পদ্মাসেতুর জাজিরা প্রান্তে ৩৩ ও ৩৪ নম্বর পিয়ারের ওপর বসানো হয় ১১তম স্প্যান। ৬ মে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের মাঝামাঝি স্থানে ২০ ও ২১ নম্বর পিয়ারের পর ১২তম স্প্যান বসানো হয়। গত ২৫ মে ১৪ ও ১৫ নম্বর পিয়ারের ওপর ১৩তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে পদ্মাসেতুর ১ হাজার ৯৫০ মিটার অংশ দৃশ্যমান হয়।
বহুল আলোচিত পদ্মাসেতু প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই বছরের ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। পরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। বর্তমান ব্যয় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি।