প্রতিবেদন

পিজিআরকে রাষ্ট্রপতি: চেইন অব কমান্ড মেনে কাজ করুন : বিশ্বমানের সশস্ত্র বাহিনী গড়তে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
চেইন অব কমান্ড মেনে অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। গত ১৬ জুলাই পিজিআর-এর ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এ আহ্বান জানান।
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবদুল হামিদ বলেন, আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গৌরবময়। অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আপনারা সেনাবাহিনী তথা সমগ্র দেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখার যে গৌরব অর্জন করছেন, তা অব্যাহতভাবে গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করবেন বলে আমার বিশ্বাস।
উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আজ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট দেশের ও বিদেশ হতে আগত রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান এবং রাষ্ট্র ঘোষিত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের দৈহিক নিরাপত্তাসহ সকল প্রকার রাষ্ট্রাচার নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত আপনাদের দায়িত্বের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে কারণে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সাংগঠনিক কাঠামো বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগামীতে এই রেজিমেন্টকে আরও সুসংহত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। চেইন অব কমান্ডের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থাশীল থেকে আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করবেন এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের বর্তমান মান বজায় রেখে এ রেজিমেন্টের অর্জিত গৌরব রায় সবাই বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবেন।’
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পিজিআর প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি সরকারপ্রধানের নিরাপত্তার দায়িত্বও এই রেজিমেন্টের ওপর বর্তায়।
পিজিআরের কাজের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, আপনাদের একাগ্রতা, শৃঙ্খলাবোধ এবং সর্বোপরি কর্তব্যের প্রতি সচেতনতা ও দতায় আমি মুগ্ধ। আপনারা দিনরাত, যেকোনো পরিস্থিতিতে বা বৈরী আবহাওয়ায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে আপনাদের গভীর দেশপ্রেম, কর্তব্যবোধ, উন্নত শৃঙ্খলা ও একনিষ্ঠতার প্রতিনিয়ত দৃষ্টান্ত আমাকে বিমোহিত করেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট আমাদের গর্বের সেনাবাহিনীরই আরেকটি বিশেষায়িত অংশ। আমাদের সেনাবাহিনীর সুনাম আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুবিদিত। দেশের যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা যেভাবে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছেন, তা জনগণের প্রভূত প্রশংসা ও বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছে।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সেনাবাহিনীর অবদানের প্রশংসা করে আবদুল হামিদ বলেন, দেশমাতৃকার উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষ অবদান রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পদ্মাসেতু নির্মাণকাজ সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এগিয়ে যাচ্ছে।
পিজিআরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলে রেজিমেন্টটির সদর দপ্তরের ওই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি কেক কাটেন। এছাড়া পরিদর্শন বইয়ে স্বার করেন এবং পিজিআর সদস্যদের সঙ্গে ছবি তোলেন। অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, পিজিআর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলমসহ অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্বমানের সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে
কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রার দায়িত্ব সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ন্যস্ত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১৭ জুলাই ঢাকা সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে আরও উন্নত ও বিশ্বমানের বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা সেনানিবাসে পিজিআর সদর দপ্তরে দিবসের কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। সকালে রেজিমেন্ট মসজিদে মিলাদ মাহফিল এবং পরে কোয়ার্টার গার্ডে রেজিমেন্টাল পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি স্বাধীন দেশের উপযুক্ত সশস্ত্র বাহিনী যেটা জাতির পিতা গড়ে তুলেছিলেন, তাকে আরও উন্নত এবং আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা সবসময় আমাদের রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) সদস্যরা ‘নিñিদ্র নিরাপত্তাই গার্ডস-এর ল্য’ এই মন্ত্রে দীতি হয়ে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত সাহস, আন্তরিকতা, পেশাগত দতা, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং দেশপ্রেমের শপথে বলীয়ান হয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার অসামান্য দূরদর্শিতায় রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে এই রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি আরও বলেন, এই গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যরা যথেষ্ট দতার পরিচয় দিচ্ছেন। নিরাপত্তার েেত্র তাদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলেও শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন।
পিজিআরসহ বিভিন্ন বাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আওয়ামী লীগ যখনই সরকারে এসেছে তখনই আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
পেশাগত প্রয়োজনে পিজিআর সদস্যদের সঙ্গে প্রতিদিন সাাতের বিষয়টি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা তাদেরকে নিজ পরিবারের সদস্য হিসেবেও মনে করেন।
প্রধানমন্ত্রী এর আগে পিজিআর সদর দপ্তরে পৌঁছলে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পিজিআর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম তাঁকে স্বাগত জানান। পিজিআরের একটি সুসজ্জিত দল এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। প্রধানমন্ত্রী পিজিআরের সকল কর্মকর্তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং দায়িত্ব পালনকালে আত্মোৎসর্গকারী পিজিআরের বীর সদস্যদের পরিবারবর্গের মাঝে অনুদান ও উপহারসামগ্রী বিতরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক (অব.), নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম শামীম-উজ-জামান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মাদ জাভেদ পাটওয়ারী, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সরকার গঠনের পরই তাঁর সরকার পিজিআর সদস্যদের জীবনের ঝুঁকির কথা চিন্তা করে প্রথম ঝুঁকি ভাতার প্রবর্তন করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আপনাদের প্রশিণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে ইতোমধ্যে সেনানিবাসে একটি ইনডোর পিস্তল ফায়ারিং রেঞ্জের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।
এছাড়াও রেজিমেন্টের সমতা বৃদ্ধির জন্য ২০১৩ সালে তিনি এর জনবল বৃদ্ধিসহ পিজিআরকে একটি স্বতন্ত্র রেজিমেন্টে রূপান্তরিত করার ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টে আর্মার্ড পার্সোনাল ক্যারিয়ার (এপিসি) সংযুক্তের ব্যবস্থা করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, যারা নিরাপত্তা প্রদান করবে, তাদের নিরাপত্তার কথাটাও আমাদের ভাবতে হয়। তাছাড়া এর সদস্যদের জন্য ইতোমধ্যে একটি ১৪ তলা ভবন নির্মাণ কার্যক্রম চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা কথা মনে রাখতে হবে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই দেশ গড়ে উঠেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ বিশ্বে একটি সম্মানজনক অবস্থানে তার জায়গা করে নেবে, আমরা সবসময় সেই প্রচেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী একটি জাতি। কাজেই জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে আমরা মাথা উঁচু করে চলতে চাই এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে চলতে চাই।
দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট আমরা দিয়েছি। আমাদের প্রবৃদ্ধিকে ৮ দশমিক ১ ভাগে উন্নীত করতে সম হয়েছি। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দারিদ্র্যের হার আমরা ২১ দশমিক ৮ ভাগে নামিয়ে এনেছি। আমাদের ল্য আরও বড়, বাংলাদেশকে আমরা সম্পূর্ণ দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
তিনি বলেন, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমরা সম হয়েছি; এখন আমাদের ল্য দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা। ২০২০ সালে আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করব। আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করব ২০২১ সালে। তখন বাংলাদেশ হবে দারিদ্র্যমুক্ত দেশ।
১৭ মার্চ ২০২০ সাল থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ সময়কে তাঁর সরকার ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলে দেশকে একটা সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই। আমরা যে সেটা পারি, তা এই সরকারের গত ১০ বছরের শাসনামলে সমগ্র বিশ্বের কাছে প্রমাণিত হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকের বাংলাদেশ আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন বাংলাদেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ। আমরা নিজস্ব স্যাটেলাইটও উৎপেণ করেছি (বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট), যার ভিত্তি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই রচনা করে দিয়ে গেছেন।
তিনি বিভিন্ন সময়ে পিজিআরের শাহাদাত বরণকারী সদস্যদের আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেন।