প্রতিবেদন

বন্যাদুর্গতদের পাশে থাকতে প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের শেখ হাসিনার নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দেশের ১৮টি জেলা বন্যাকবলিত। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গত ১৯ জুলাই দেশের মধ্যাঞ্চলের আরো ৪টি জেলা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানায়। এবারের বন্যায় কুড়িগ্রাম, নওগাঁ, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, নীলফামারী, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোনাসহ দেশের কয়েকটি জেলা প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ।
২০ জুলাই পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী জেলাগুলোয় প্রায় ২০ লাখ মানুষ পানিবন্দী।
আশার কথা হলো, দেশের বন্যাকবলিত বিপুল জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার। বন্যা মোকাবিলাসহ কবলিত জেলাগুলোতে ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বানবাসী মানুষের পাশে থাকতে পানিসম্পদ, নৌ-পরিবহন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীসহ যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের নিয়ে টিম করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১৯ জুলাই লন্ডন সফরে যাওয়ার আগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মন্ত্রীদের এই নির্দেশনা দেন তিনি। এর আগেও তিনি বন্যাকবলিত মানুষের কাছে ছুটে যেতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। এরপর থেকে সরকারি ও আওয়ামী লীগ দলীয় বিভিন্ন টিম বন্যাকবলিত মানুষের পাশে ছুটে যাচ্ছে।
এদিকে ‘বন্যা আক্রান্তদের ভয়ের কারণ নেই’ উল্লেখ করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেছেন, বন্যার্তদের পাশে সরকার পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে। গত ১৯ জুলাই বিকেলে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যায় তিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ উপলে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। বন্যাপরবর্তী সময়ে দুর্গত মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের অসুখ-বিসুখ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে প্রশাসনের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী। বাংলাদেশের মানুষ সাহসিকতার সাথে তা মোকাবিলা করতে পারে। সাম্প্রতিককালে অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সম হবো।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে, এ বছর বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, বিহার এবং মিয়ানমারে একই সময়ে বৃষ্টিপাত হয়েছে, যার কারণে বন্যার প্রকোপটা বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনিতে বাংলাদেশে জুলাই মাসে বৃষ্টিপাতের কারণে এবং উজান থেকে নদীর পানির ঢলে বন্যা হয়।
যমুনা ও পদ্মা নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে, যদি আবারো ভারী বৃষ্টিপাত না হয় তাহলে এসব জেলায় আরও দুই সপ্তাহ বন্যার পানি থাকবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড গত ১৬ জুলাই রাতে জানায়, ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে সারাদেশে বন্যা হচ্ছে। সমতলে দেশের সব প্রধান নদীর পানি বাড়ছে। এছাড়া উজান থেকে পানি আসার কারণে ১৩ নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বানভাসি লোকজন চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। খাদ্য ও পানীয় সমস্যার পাশাপাশি নানা রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বন্যাকবলিত এলাকায়। হাজার হাজার একর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। মাছের খামার ভেসে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হাজারখানেক শিাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষের বসতবাড়ির ব্যাপক তি হয়েছে। নদীভাঙনের প্রকোপ বেড়েছে। বন্যাদুর্গতদের চলাচলের একমাত্র বাহন এখন নৌকা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প থেকে গত ১৬ জুলাই জানানো হয়, ১৫ জেলায় ১১ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।
বন্যায় এবার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, গাইবান্ধার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বন্যার পানি গাইবান্ধা শহরেও প্রবেশ করেছে। জামালপুরে যমুনার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রেলস্টেশনে প্রবেশ করেছে পানি। সিলেটে বন্যার কারণে সাড়ে ৩ লাখ মানুষ তিগ্রস্ত হয়েছে। নওগাঁয় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রবেশ করেছে পানি। নীলফামারীতে দ্বিতীয় দফায় তিস্তার পানি বেড়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুড়িগ্রামে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। নেত্রকোনায়ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। টাঙ্গাইলে বন্যার কারণে নদীভাঙন শুরু হয়। এছাড়া বগুড়ার কয়েকটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ব্যাপক য়তি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, সমতলে দেশের সব প্রধান নদীর পানি বাড়ছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, পদ্মা নদীর পানি বাড়ার কারণে কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনার কথাও বলেন তিনি। ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, ধরলা, কংস, সোমেশ্বরী, খোয়াই, পুরাতন সুরমা, মনু, কুশিয়ারা এবং সুরমা নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বাড়া-কমার মধ্যে রয়েছে। সারাদেশে নদ-নদীর ৯৩টি পর্যবেণ পয়েন্টের হিসাব রাখছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সম্প্রতি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এছাড়া ভারতের আসাম ও নেপালে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। ভারী বৃষ্টির সঙ্গে আসামের বন্যার পানি নেমে আসায় দেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়। এদিকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশের ওপর ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরের পাশাপাশি চট্টগ্রামের পার্বত্য জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়। তবে আবহাওয়া অফিস থেকে জানানো হয়েছে, দেশে আর ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ রূপ নেবে তা নির্ভর করছে ভারী বৃষ্টিপাতের ওপর।

বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
বন্যা মোকাবিলায় দল ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ১৯ জুলাই বলেন, সরকার আন্তরিকভাবে বন্যা মোকাবিলায় কাজ করছে। আমাদের টিম বন্যাদুর্গত এলাকায় যাচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীদের বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে আমরা উদ্যোগ নিতে শুরু করেছি। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সরকারের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের বন্যাদুর্গত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করার জন্য বলেছেন। তাছাড়া তিনি এয়ারপোর্টে বলে গেছেন, পানিসম্পদ, নৌ-পরিবহন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীসহ যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের নিয়ে টিম করে সরকারিভাবে ব্যবস্থা নিতে।