প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর

তারেক জোয়ারদার
জীবন ধারণের জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ওষুধ। এজন্য তা গুণগত মানসম্পন্ন ও নির্ভেজাল হওয়ার বিকল্প নেই। দেশের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের এ দায়িত্ববোধ থেকেই খাদ্য এবং ওষুধের গুণগতমান ও নির্ভেজালত্ব রার তাগিদে কাজ করছে বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ঔষধ প্রশাসন।
তবে সরকারের কঠোর নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি সত্ত্বেও বাজারে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণ করাই যাচ্ছে না। খাবারের পাশাপাশি বাজারে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ছড়াছড়ি। পাশাপাশি রয়েছে নকল ও নিম্নমানের ওষুধ। কিছু ছোট কোম্পানির বিরুদ্ধে নকল ও ভেজাল ওষুধ বিক্রির প্রমাণ মিললেও স্বনামধন্য কোম্পানি সম্পর্কে ক্রেতারা উচ্চ ধারণা পোষণ করে আসছিলেন এতদিন; কিন্তু ওসব কোম্পানির ওষুধও যে নির্ভেজাল, বাস্তবে বহু ক্ষেত্রেই তার প্রমাণ মিলছে না।
ওষুধ এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন সরাসরি যুক্ত। এর গুণ ও মানগত যেকোনো ব্যত্যয় মানুষের জীবন রার বদলে জীবন সংহারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন মানুষকে হত্যা করার পর্যায়েই পড়ে। এমন অপরাধ যারা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধানই কাম্য।
তাছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানিও করে। নিম্নমানের কাঁচামালে তৈরি ওষুধ রপ্তানি করলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হবে, যা ওষুধশিল্পের ভবিষ্যৎকে হুমকিতে ফেলবে। কিছু কোম্পানির কারণে দেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশ যেন বিপন্ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
বাস্তবতা বলছে, কিছু কোম্পানি অতিমুনাফার লোভে নিম্নমানের অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) আমদানি করছে বলে প্রায়ই অভিযোগ উঠছে। এটি শতভাগ বন্ধ করতে তদারকি আরো জোরদার করতে হবে। কাঁচামাল আমদানির আগে সংশ্লিষ্ট এপিআই উৎপাদনকারী কোম্পানির যাবতীয় বিষয় দেখে অনুমতি দিতে হবে। শুধু স্বল্প মূল্যে এপিআই পাওয়া গেলেই তা আমদানি করতে হবে Ñ এমন মনোভাব পরিহার করা এখন সময়ের প্রয়োজনেই জরুরি।
আশার কথা হলো, জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল রুখতে কঠোর মনোভাব নিয়ে মাঠে নেমেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। বাজারে বিদ্যমান নকল, ভেজাল, নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও হাতে নিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ প্রতিরোধে সারাদেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অধিদপ্তরের উদ্যোগে চলছে দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক সভা। একই সাথে চলছে ফার্মেসি পরিদর্শন, আনরেজিস্টার্ড, মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, ভেজাল ওষুধ জব্দকরণ ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। অধিদপ্তরের এমন কঠোর মনোভাবের কারণে এরই মধ্যে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফার্মেসি থেকে ফেরত নিতে শুরু করেছে তাদের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। ফেরত নেয়া ওষুধগুলো স্থানীয় ওষুধ তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করে রিপোর্ট প্রেরণ করা হচ্ছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে। ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মেসার্স ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস এবং মেসার্স একমি ফার্মাসিউটিক্যালসে ধ্বংস করার সময় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান নিজে উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, চলমান এ অভিযানে কেবল এক মাসে সাড়ে ৩৬ কোটি টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ধ্বংস করেছে ১৫৮টি ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় সাড়ে ৪ হাজার ফার্মেসি পরিদর্শন করে ১৫২টি মামলা করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। পাশাপাশি ১ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
এদিকে গত ১৮ জুন হাইকোর্ট এক আদেশে দেশের ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ থাকলে তা জব্দ করে ১ মাসের মধ্যে ধ্বংস করার এবং এ ধরনের ওষুধ বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আদালতের নির্দেশনার তথ্য প্রাপ্তির সাথে সাথেই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দ্রুততার সাথে কার্যক্রম শুরু করে।
কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ১৯ জুন সকল ওষুধ উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সকল ফার্মেসি হতে ৭ দিনের মধ্যে প্রত্যাহার করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করে। একই সময়ে ভিন্ন আদেশে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে ৭ দিনের মধ্যে ফেরত দেবার জন্য বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতিকেও নির্দেশনা প্রদান করে।
এ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় গত ২৩ জুন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি, বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র‌্যাব, ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের সাথে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সকল ফার্মেসি হতে উত্তোলন ও ধ্বংসকরণ বিষয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সভায় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ২ জুলাইর মধ্যে উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উত্তোলন ও ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ওষুধ শিল্প সমিতি, বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি ও ইম্পোর্টার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বরাবর পত্র ইস্যু করে। পরবর্তীতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ প্রত্যাহার ও ধ্বংস করার সময় ১০ জুলাই পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়।
উক্ত নির্দেশনা মোতাবেক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফার্মেসি হতে ফেরত নিয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। ফেরত নেয়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধগুলো স্থানীয় ওষুধ তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করে রিপোর্ট প্রেরণ করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে।
উল্লেখ্য, ১৫৮টি প্রতিষ্ঠান (উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক) ২ কোটি ৩১ লাখ ৪ হাজার ৬৭২ ইউনিট ওষুধ ফার্মেসি হতে ফেরত নিয়েছে এবং ধ্বংস করেছে, যার আনুমানিক মূল্য ৩৬ কোটি ৪১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯৭ টাকা।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সম্পর্কে সচেতনতামূলক গণবিজ্ঞপ্তি এবং ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে ২০ জুন হতে ২৪ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখে দৈনিক কালের কণ্ঠ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং দৈনিক বর্তমান পত্রিকায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক সভা
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উদ্যোগে মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর জনসচেতনতামূলক সভা করেছে। দেশব্যাপী ৫৬টি জেলায় ১২৬টি জনসচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সাপ্তাহিক স্বদেশ খবরকে বলেন, ফার্মেসি ব্যবস্থাপনায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের লক্ষ্য ৩টি Ñ জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ওষুধ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং প্রচলিত ওষুধ আইনের প্রয়োগ। তবে শুধু আইনের প্রয়োগ করলেই চলবে না, প্রয়োজন জনসচেতনতারও। নকল, আনরেজিস্টার্ড ওষুধ কিভাবে চেনা যাবে, ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা কিভাবে করতে হবে, ফার্মেসিতে ওষুধ কিভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, ইনভয়েসের মাধ্যমে ওষুধ ক্রয় করা কেন আবশ্যক Ñ অনেক সময় ফার্মেসির মালিক ও ফার্মাসিস্টরা এসব তথ্য না জেনে অপরাধ করে থাকেন। এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সংস্থার মহাপরিচালক হিসেবে আমি নির্দেশনা দিয়েছি, দেশব্যাপী ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ যেন মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ওষুধ প্রতিরোধে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক সভা করেন। এতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানকল্পে সকলের পরামর্শ মোতাবেক বাজারকে মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও ভেজাল ওষুধমুক্ত করার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, কেবল নির্দেশনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান। গত ২৪, ২৭, ২৮ ও ২৯ জুন এবং ১ জুলাই নিজে উপস্থিত থেকে জনসচেতনতামূলক সভা করেছেন ঢাকার মিটফোর্ড ও মিরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরে। একই সাথে তিনি রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরে মডেল ফার্মেসি ও মডেল মেডিসিন শপ উদ্বোধন করেন।
এছাড়াও অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জনসচেতনতামূলক সভা করেছেন চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, ঢাকার মিরপুর, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, নারায়ণগঞ্জ, বরগুনা ও গাজীপুরে।
অনুষ্ঠানগুলোতে মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ প্রতিরোধ করে বাংলাদেশের ফার্মেসি ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিষয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকে সচেতন হতে বলেন। জনসাধারণকে অনুরোধ করেন মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ দেখে ওষুধ ক্রয়ের জন্য এবং সেই সাথে ওষুধের নিবন্ধন আছে কি না, অর্থাৎ ওষুধের মোড়কে উঅজ বা গঅ নম্বর আছে কি না তা গুরুত্ব দিয়ে দেখার।
তিনি সভায় সংশ্লিষ্টদেরকে নির্দেশনা প্রদান করেন ফার্মেসির কোথাও বিক্রয়ের জন্য মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মজুদ বা সংরণ করা যাবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রয়ের জন্য সেলফ/ড্রয়ার/রেফ্রিজারেটর পাওয়া গেলে তা জব্দকরত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আলাদা কন্টেইনারে ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। বিক্রির জন্য নয়’Ñ লাল কালি দিয়ে লিখে সংরণ করতে হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট হস্তান্তর করতে হবে। এ বিষয়ে রেকর্ড সংরণ করতে হবে। কোনো ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেলে ফার্মেসিটি সিলগালা/বন্ধ করাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতি সপ্তাহে কমপে একবার ফার্মেসির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ ফার্মেসি ংবষভ রহংঢ়বপঃরড়হ করবেন এবং ফার্মেসিতে কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে তা ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। বিক্রির জন্য নয়’Ñ লাল কালি দিয়ে লিখে আলাদা কন্টেইনারে সংরণ করবেন। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ঋঊঋঙ (ঋরৎংঃ ঊীঢ়রৎু ঋরৎংঃ ঙঁঃ) পদ্ধতিতে ওষুধ ব্যবস্থাপনায় অনুসরণের নিমিত্তে কম্পিউটার/আইটিভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শনাক্তকরণের পরামর্শ দেন।
জানা যায়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ গত ৬ মাসে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে মামলা করেছেন ৪২০টি, জরিমানা করা হয়েছে ৮২৯১৫০০ টাকা, জেল দেয়া হয়েছে ৫ ব্যক্তিকে, ফার্মেসি বন্ধ করা হয়েছে ৫টি। নিয়মিত এই অভিযান অব্যাহত আছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জুন হতে ২ জুলাই পর্যন্ত নকল, ভেজাল, আনরেজিস্টার্ড, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ফিজিশিয়ান স্যাম্পলের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে চাঁদপুর, খুলনা, কুষ্টিয়া, রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকায়। মোবাইল কোর্টে ১১টি মামলা দায়ের করা হয়, জরিমানা করা হয় ১,১৮,৫০০ টাকা এবং কারাদ- প্রদান করা হয় ১ জনকে। এর মধ্যে ৩০ জুন ঢাকার মানিকনগর এলাকায় র‌্যাব এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। এ সময় অবৈধ হারবাল ওষুধ তৈরির অপরাধে বনাজী চিকিৎসালয়ের মালিককে ৩ মাসের জেল এবং খান ফার্মেসির মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
জানা গেছে, ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সরকার তথা ঔষধ প্রশাসন নতুন করে সাধারণ মানের ড্রাগ লাইসেন্স না দিয়ে মডেল ফার্মেসি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। আধুনিক মানের এ ফার্মেসি সেবা চালু করার লক্ষ্যে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ইতোমধ্যে সারাদেশে ৪১৯টি মডেল ফার্মেসি এবং ১৬ হাজার ১২৬টি মডেল মেডিসিনশপ চালু করার অনুমোদন দিয়েছে। এ নিয়ে সারাদেশে ড্রাগ লাইসেন্সের সংখ্যা দাঁড়ালো ১ ল ৩১ হাজার ৫৯১টি। এর বাইরেও যথাযথ অনুমোদন না নিয়ে সারাদেশের অলিগলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য ফার্মেসি। অভিযোগ রয়েছে, এসব অননুমোদিত ওষুধের দোকানেই বেশি চলে ভেজাল ও নকল ওষুধের কারবার।
এ প্রসঙ্গে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনবলের ঘাটতি সত্ত্বেও ভেজাল ওষুধ ও অননুমোদিত ফার্মেসির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকে; যা তাদের রুটিন কাজের অংশ।
এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমানের বক্তব্য আরো স্পষ্ট। তিনি স্বদেশ খবরকে বলেন, ওষুধের গুণগত মান ঠিক রাখতে ভেজালবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এ অভিযান পরিচালনাকালে কাউকেই কোনোরূপ ছাড় দেয়া হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ওষুধ শিল্পের বিকাশ ও ওষুধের গুণগত মান রার্থে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি আরো কিছু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে চলেছে। সরকার তথা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সময়োপযোগী ও কার্যকর নানামুখী পদপে গ্রহণের ফলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশ ও ওষুধের গুণগত মান ক্রমেই ভালো হচ্ছে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের
কার্যক্রমে হাইকোর্টের প্রশংসা
সাম্প্রতিক সময়ে চলমান খাদ্যপণ্যের নিম্নমান ও ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে বিএসটিআই এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকা-ে ক্ষুব্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের তিরস্কার করেছেন আদালত। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ ও ধ্বংস করায় এবং নকল ও ভেজালবিরোধী অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃপরে প্রশংসা করেছেন হাইকোর্ট। গত ১৮ জুলাই আদালত বলেছেন, এ কাজ প্রশংসনীয়। এটা চলমান রাখতে হবে। জনসাধারণ, ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারী সবাইকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি ওষুধের পাতায় (স্ট্রিপ) স্পষ্ট করে বাংলা ও ইংরেজি বড় হরফে ওষুধের মেয়াদ, উৎপাদনের তারিখ ও মূল্য লেখার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছে আদালত। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দেয়া প্রতিবেদনের প্রশংসা করে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই নির্দেশনা দেন।
হাইকোর্টে দেয়া ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাইকোর্টের নির্দেশে অধিদপ্তর বিভিন্ন কোম্পানিকে চিঠি দেয়। ওই চিঠির পরিপ্রেেিত বাজার থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংগ্রহ ও ধ্বংস করে কোম্পানিগুলো। ধ্বংস করা ওষুধের দাম ৩৬ কোটি ৪১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯৭ টাকা। ৪ হাজার ৫৮৭টি ফার্মেসি পরিদর্শন করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১৫২টি মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ কোটি ৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। সিলগালা করা হয়েছে ৫টি ফার্মেসি।
‘ঢাকায় ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ’ শিরোনামে গত ১১ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে রিট আবেদন করেছিলেন ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন। এর ভিত্তিতে সারাদেশে বিভিন্ন ফার্মেসিতে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ১ মাসের মধ্যে অপসারণ ও ধ্বংসের জন্য গত ১৮ জুন নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি, সংরণ ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়। স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র, আইন, বাণিজ্য ও শিল্প সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ভোক্তা অধিকার সংরণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও উপপরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শক, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি ও মহাসচিবের প্রতি ওই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আদালতের আদেশ কার্যকর করার বিষয়ে কী পদপে নেয়া হয়েছে তা ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে দাখিল করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেয়া হয়। ওই নির্দেশের পর গত ১৬ জুলাই হাইকোর্টে প্রতিবেদন দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সার্বিক কর্মকা-ের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান স্বদেশ খবরকে বলেন, জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উদ্যোগে চলছে দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক সভা। একই সাথে চলছে ফার্মেসি পরিদর্শন, আনরেজিস্টার্ড, মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, ভেজাল ওষুধ জব্দকরণ ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। অধিদপ্তরের এমন কঠোর মনোভাবের কারণে এরই মধ্যে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফার্মেসি হতে ফেরত নিতে শুরু করেছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ।
তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সার্বিক সহযোগিতার কারণে ওষুধ শিল্প এখন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আনার পাশাপাশি দেশে বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ওষুধ উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে নিতে সম হয়েছে। তৈরী পোশাকের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য হিসেবে স্থান দখল করেছে ওষুধ। এ খাতের সম্ভাবনা দিন দিনই উজ্জ্বল হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান স্বদেশ খবরকে বলেন, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ৩৭৫ গুণ। তিনি বলেন, এ খাতে সরকারের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশের ওষুধশিল্প পোশাকশিল্পকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।