প্রতিবেদন

রংপুরের পল্লীনিবাসে চিরনিদ্রায় এরশাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রাক্তন সেনাপ্রধান, একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে রংপুর জেলা শহরে নিজ বাড়ি ‘পল্লীনিবাস’-এর লিচু বাগানে সমাহিত করা হয়েছে। বাবা মকবুল হোসেনের কবরের পাশে গত ১৬ জুলাই বিকেল পৌনে ৬টার দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হয়। এর আগে বাদ জোহর রংপুর শহরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে মরহুমের চতুর্থ ও শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় লাধিক লোক অংশ নেন।
উল্লেখ্য, জাপার প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ গত ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রক্তের ক্যান্সার মাইডোলিসপ্লাস্টিক সিনড্রোমে আক্রান্ত এরশাদ ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
আমৃত্যু জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এরশাদ রংপুর অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়। রংপুরেই তার পৈত্রিক নিবাস। তাই আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রংপুরেই দাফন করা হয় তাঁকে।
তবে এইচ এম এরশাদকে ঢাকায় বনানী সামরিক কবরস্থানে নাকি রংপুরে সমাহিত করা হবে – মৃত্যুর পর থেকে এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে কিছুটা উত্তেজনা ও নাটকীয়তা দেখা দেয়। পরে রংপুরে নিজের দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতেই তাঁকে দাফন করা হয়।
এরশাদের শেষ জানাজা ও দাফনে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজ্জামেল হক উপস্থিত ছিলেন। দাফনের আগে সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। তাঁর কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান সেনাবাহিনীর রংপুর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল নজরুল ইসলাম। দাফনের সময় এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের, ছেলে শাদ এরশাদসহ আত্মীয়স্বজন এবং জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, আযম খান, মেজর খালেদ আখতার (অব.), এটিইউ তাজ রহমান ও শফিকুল ইসলাম সেন্টুসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ১৪ জুলাই সকালে মারা যাওয়ার পর ওই দিনই তাঁর স্ত্রী ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ ঘোষণা দেন, এরশাদের ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে বনানী সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। জাপার প্রেস উইং থেকেও কয়েক দফায় প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছিল সামরিক কবরস্থানে দাফনের কথা। কিন্তু শুরু থেকেই রংপুরে দাফনের দাবি জানাচ্ছিলেন রংপুরের নেতাকর্মীরা। এরশাদের মরদেহ জানাজার জন্য রংপুরে নেয়ার পর স্থানীয় নেতাকর্মীরা সেখানে দাফনের জোরালো দাবি তোলেন। এর আগের দিন তারা পল্লীনিবাসের পাশে কবরও প্রস্তুত করে রাখেন। অবশেষে স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবির মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন রওশনসহ দলের দায়িত্বশীল নেতারা। জানাজা শেষে এরশাদের কফিন ঢাকায় ফিরিয়ে না এনে রংপুর পল্লীনিবাসেই নিয়ে যাওয়া হয়।
এ বিষয়ে ১৬ জুলাই বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশবাসীর উদ্দেশে রওশন এরশাদ বলেন, রংপুরবাসীর আবেগ ও ভালোবাসার সম্মানার্থে তাঁকে রংপুরে সমাহিত করার বিষয়ে আমি ও আমাদের পরিবার সম্মতি প্রকাশ করছি।
অন্যদিকে জাপার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, রংপুরে সমাহিত করার সম্মতি দিয়ে এরশাদের কবরের পাশে রওশন তার জন্যও কবরের জায়গা রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
ঢাকা সিএমএইচ থেকে এরশাদের কফিন নিয়ে ১৬ জুলাই দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছায় বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার। কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠ ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে রংপুর জেলা পুলিশ। এরশাদের কফিন দুপুরে ঈদগাহ মাঠে নেয়ার পর জানাজার আগে দেয়া বক্তব্যে রংপুরের মেয়র ও জাপা নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, বনানীর সেনা কবরস্থানে এরশাদকে দাফন করা হলে পরবর্তীতে দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা জানাতে সহজে সেখানে যেতে পারবেন না। এরশাদ নিজেই রংপুরে শায়িত হতে চেয়েছিলেন।
এরপর জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের বক্তব্য দিতে শুরু করলে মাঠে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মী রংপুরে দাফনের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। প্রায় ২০ মিনিট ধরে এই পরিস্থিতি চলার পর দুপুর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে জানাজা শুরু হয়। জানাজা পড়ান রংপুর কারিমিয়া মাদ্রাসার সুপার মাওলানা ইদ্রিস আলী।
ঈদগাহ মাঠে মরদেহ আসার পরপরই এরশাদকে শেষবারের মতো দেখতে এবং জানাজায় অংশ নিতে মানুষের ঢল নামে। পুলিশি বেষ্টনী ভেঙে মরদেহের কাছে ছুটতে থাকেন দলীয় নেতাকর্মী ও রংপুরের স্থানীয় সাধারণ মানুষ। উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে শুরু হয় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন। জাপার নেতাকর্মীরা ছাড়াও স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ব্যবসায়ী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রংপুর জেলা দোকান মালিক সমিতি নগরীর সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট দুপুর ২টা পর্যন্ত বন্ধ রাখে। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন স্থানে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়।
এদিকে জানাজার পরপরই রংপুরের নেতাকর্মীরা এরশাদের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ফেলেন এবং রংপুরে দাফনের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে মেয়র মোস্তফা ওই গাড়িতে উঠে চালকের পাশের আসনে বসে পড়েন। বেলা ৩টার দিকে এরশাদের মরদেহ নিয়ে গাড়ি পল্লীনিবাসের দিকে রওনা হয়। এ পরিস্থিতিতে জি এম কাদের বলেন, আমরা প্রথম থেকেই চাচ্ছিলাম এরশাদকে রংপুরে সমাহিত করব। তবে ভাবী (রওশন) বিভিন্ন কারণে চাচ্ছিলেন তাঁকে ঢাকায় দাফন করতে। তবে রংপুরের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার কারণে সর্বসম্মতভাবে আমরা তাঁকে এখানেই সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিই। ভাবীও এতে রাজি হয়েছেন।
পরিবার ও জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধিদল পল্লীনিবাসের পাশে এরশাদের বাবার নামে গড়া মকবুল হোসেন জেনারেল অ্যান্ড ডায়াবেটিক হাসপাতাল সংলগ্ন লিচুবাগানে কবরের স্থানটি পরিদর্শন করে।
প্রসঙ্গত, এরশাদ রংপুর-৩ (সদর) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। একাদশ সংসদসহ এই আসন থেকে তিনি টানা ৬ বার এমপি নির্বাচিন হন। জেলে থেকেও এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর ৩ মার্চ রংপুরে যান অসুস্থ এরশাদ। রংপুরে নবনির্মিত বাড়ির কাজ দেখতে যান তিনি। বাড়ির কাজ শেষ না হওয়ার কারণে এরশাদ তখন হোটেলে ছিলেন। নতুন বাড়িতে দুই রাত থাকার ইচ্ছায় গত ২৮ জুন রংপুরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। এর আগেই অসুস্থ হয়ে ২৬ জুন সিএমএইচে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ জুলাই সকালে ইন্তেকাল করেন। দুই রাত থাকতে চাওয়া সেই পল্লীনিবাসেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ।

ঢাকায় তিন জানাজা
এইচ এম এরশাদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় গত ১৪ জুলাই দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে সেনা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে। জানাজায় সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে ১৫ জুলাই সকালে এরশাদের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ৫ বারের এই এমপির কফিন জাতীয় পতাকা ও সেনাবাহিনীর পতাকায় মুড়ে জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সংসদের দণি প্লাজার বদলে জানাজা হয় দণি প্লাজার নিচের টানেলে। জানাজার পরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের কফিনে। প্রধানমন্ত্রীর পে তার সামরিক সচিব, স্পিকারের পে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস এবং ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিরোধী দলীয় নেতার কফিনে।
জানাজার আগে এরশাদের জীবনী পড়ে শোনান জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। বক্তব্য দিতে এসে আবেগে আপ্লুত গয়ে পড়েন এরশাদের ভাই, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। এরশাদের স্ত্রী, সাবেক বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ জানাজায় এসেছিলেন ছেলে শাদ এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে। সবার কাছে এরশাদের জন্য দোয়া চান রওশন।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, ডেপুটি স্পিকার শেখ ফজলে রাব্বী মিয়া, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী জানাজায় অংশ নেন।
আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুব-উল আলম হানিফ, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এবং বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও জি এম সিরাজ যোগ দেন জানাজায়।
জাতীয় পার্টির নেতাদের মধ্যে রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, আবু হোসেন বাবলা, মুজিবুল হক চুন্নু, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জানাজায় অংশ নেন।
সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে এরশাদের কফিন নিয়ে যাওয়া হয় কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। নেতাকর্মীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সেখানে বিকেল ৩টা পর্যন্ত রাখা হয় এরশাদের মরদেহ। দলীয় কার্যালয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আছরের পর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আরও এক দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।