প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

সরকারি সাত আবাসন প্রকল্প উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : সবার জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী প্রজন্মের জন্য ২০২১ সালের মধ্যে একটি সুন্দর ও পরিকল্পিত বাসযোগ্য আবাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন, ‘সকলের জন্য আবাসন নিশ্চিত করা হবে; বাংলাদেশে কেউ আর গৃহহীন থাকবে না’। ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনসুবিধা নিশ্চিতে কাজ করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ জুলাই রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন রোড এলাকায় ৭টি আবাসন প্রকল্প উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
মন্ত্রিসভার সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং প্রকল্পে তিগ্রস্ত জনগণের জন্য ইস্কাটন গার্ডেন রোডে ৭টি আবাসন উন্নয়ন প্রকল্প সম্পন্ন করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ ৭টি প্রকল্পের মধ্যে গণপূর্ত বিভাগ ৪টি ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপ ২টি এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপ ১টি প্রকল্প সম্পন্ন করে।
সরকার সবার জন্য আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে উল্লেখ করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করার পর আমাদের জেলা, উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে সুপরিকল্পিতভাবে উন্নতি ঘটাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মন্ত্রিসভার সদস্য, সচিব ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রকল্পে তিগ্রস্ত জনগণের জন্য আধুনিক সুবিধাসংবলিত ১ হাজার ৬৭১টি আবাসন প্রকল্প উদ্বোধন করেছি। আমি আশা করি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে আবাসন সুবিধা পেয়ে দায়িত্বের প্রতি আরো মনোযোগী হবেন।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রাজধানীতে আবাসন সুবিধা আরো ৪০ শতাংশ বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন; ২০১৪ সালে এটা ছিল মাত্র ৮ শতাংশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষকে একটি মানসম্মত জীবনযাত্রা উপহার দেয়ার জন্য আমরা স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট, আবাসন, কলকারখানা যা-ই নির্মাণ করি না কেন, তা সুপরিকল্পিত উপায়ে সম্পন্ন করতে চাই। আমরা এলোমেলোভাবে কোনো নির্মাণকাজের অনুমতি দিতে চাই না।’
দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করার জন্য স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যেকোনো পরিকল্পনা করার সময় আপনাদের জলাশয়গুলোর কথা মাথায় রাখতে হবে। কারণ এগুলো পানির আধার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এগুলো পানি ধরে রাখে, যা জলাবদ্ধতা হ্রাসে সহায়তা করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ইতোমধ্যে জলাশয় রায় পরিকল্পনা গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপকে নির্দেশ দিয়েছি। আমরা শুধু কেন্দ্রীয় নগরীগুলোকেই উন্নত করতে চাই না, গ্রামগুলোতেও সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চাই।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরো ১৬টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬ হাজার ৩৫০টি ফ্যাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া ১৩টি প্রকল্পের মাধ্যমে আরো ১ হাজার ৬৭৪টি ফ্যাট নির্মাণের পদপে গ্রহণ করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এরই মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১ হাজার ৫১২টি ফ্যাট নির্মাণ করে তাদের মধ্যে বিতরণ করেছি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সুবিধার জন্য সরকার ইতোমধ্যে ৬৪টি জেলায় ২ হাজার ৮১৬টি ডরমেটরি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকার সবার জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ইতোমধ্যে নিম্নমধ্যম আয়ের জনগণের জন্য ৩৩ হাজার ৫২৬টি প্লট উন্নয়ন এবং ৮ হাজার ৯২২টি ফ্যাট বিক্রির জন্য নির্ধারণ করেছি। এর মধ্যে উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের ৬ হাজার ৬৩৬টি ফ্যাট বিক্রির জন্য নির্মাণ করেছি। আরো ১৮ হাজার ১০৫টি ফ্যাটের উন্নয়ন এবং ৮ হাজার ৩৯টি ফ্যাটের নির্মাণকাজ চলছে। আমরা দেশব্যাপী ১৮ হাজার ১৪৮টি প্লট উন্নয়ন এবং ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৮৭টি ফ্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি।
শেখ হাসিনা বলেন, এসব প্লট ও ফ্যাটের উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হলে জনগণের আবাসন সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।
তিনি বলেন, আমরা একটি লোককেও বস্তিতে বসবাস করতে দিতে চাই না। তাই আমরা রাজধানীর বস্তিবাসীর জন্যও এখন ফ্যাট নির্মাণ করছি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সুপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সময়োপযোগী হাউজিং ও বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট অর্ডিন্যান্স আইন পাস করেছি। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থাপনার পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন করতে প্রকৌশলীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টাকা হলেই যে যেখানে যত্রতত্র ভবন বা শিল্প কারখানা বানাবে, সেটা করতে দিতে চাই না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে যত্রতত্র অনেক ইমারত গড়ে উঠেছে, এটা ঠিক। তারপরও আমি বলব, রাস্তাঘাট বিল্ডিং যা-ই হোক, পরিকল্পিতভাবে করতে পারলে আমাদের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষগুলোর জীবনমানটা উন্নত করতে পারব।
বিদেশিদের অনুকরণে নয় বরং নিজ দেশের পরিবেশের কথা ভাবনায় নিয়ে ফ্যাট ও ঘরবাড়ি নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, শুধু বিদেশিদের অনুকরণ করলে হবে না। আমাদের ঘন বৃষ্টির দেশ, আমাদের হিউমিডিটি বেশি, সেগুলো মাথায় রেখেই আমাদের মতো করে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে ফ্যাট বা বাড়ি-ঘর নির্মাণ করা উচিত।
রাস্তার জন্য জায়গা না ছেড়ে এবং অগ্নিনির্বাপণের যথাযথ ব্যবস্থা না রেখে স্থাপনা নির্মাণের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে যেখানে কর্মস্থলে যাবেন আপনার ফায়ার এক্সিটটা কোথায় সেটা জানবেন। ফায়ার এক্সটিংগুইশার কোথায় কিভাবে ব্যবহার করবেন সেটাও জানা দরকার। আমরা যা-ই করে দেই না কেন, সেটা একটু যতœসহকারে ব্যবহার করবেন।
জলাধার সংরণ, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবহারে সচেতন ও সতর্ক থাকতে সবাইকে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
বিগত ১০ বছরে সরকারের ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ২০২১ সাল নাগাদ একটি উন্নয়নশীল ও ২০৪১ সাল নাগাদ একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে তার সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশে পরিণত করতে সম হয়েছি এবং এখন আমরা ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের আগেই এই দেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ করার ল্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী পরে নগরীর ইস্কাটন রোডে গ্রেড-১ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত ৩টি ভবনের একটি পরিদর্শন করেন। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম ও মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লাহ খন্দকার অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে ৭টি প্রকল্পের প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রসঙ্গত, টেকসই উন্নয়ন ল্যমাত্রা বা এসডিজির যে ১৭টি ল্য রয়েছে তার ১১তমটি হলো আবাসন সংক্রান্ত। এসডিজির এ লক্ষ্যটিতে বলা হয়েছে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাতসহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তোলা। অন্যান্য লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি এসডিজির আবাসন সংক্রান্ত ল্য পূরণে বাংলাদেশ সরকার তার সকল উন্নয়ন পরিকল্পনায় গৃহায়ন ও আবাসন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। ইতোমধ্যে জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা-২০১৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। নগরীতে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বহুতলবিশিষ্ট ফ্যাট, বস্তিবাসীদের জন্য ভাড়াভিত্তিক আবাসিক ফ্যাট এবং গ্রামাঞ্চলে ভূমিহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সরকারের ভিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুপরিকল্পিত গৃহায়ন ও নগরায়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ল্েয আবাসন খাতে সরকারের গৃহীত পদপেসমূহের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করে চলেছে গণপূর্ত বিভাগ, রাজউক ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন কর্তৃপ। এসব প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান নির্ধারণ করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে নাগরিক সুবিধাসংবলিত আবাসন ও নগরায়নের ল্েয কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য পরিকল্পিত আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
আবাসন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. রাশিদুল ইসলাম স্বদেশ খবর প্রতিবেদককে বলেন, সরকারের চলমান নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে অদূর ভবিষ্যতে সবার জন্য নিশ্চিত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
রাশিদুল ইসলাম আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও সরকারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আকাক্সক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের কোনো পরিবারই ভবিষ্যতে আর গৃহহীন থাকবে না।