প্রতিবেদন

৫ দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন সমাপ্ত : ডিসিদের কাজের গতি বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বিশেষ প্রতিবেদক
দেশে চলমান উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে কাজের গতি বাড়ানোর জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য উন্নয়নের গতিটা অব্যাহত রাখা জরুরি। আর এটা মাথায় রেখেই ডিসিদের কাজ করে যেতে হবে।
সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকারি সব সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ডিসিদের সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।
সদ্যসমাপ্ত ৫ দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০১৯ এর উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন। ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের নিয়ে গত ১৪ জুলাই জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৮ জুলাই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন উদ্বোধন করেন। পরে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ডিসিরা। একইদিন সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সভাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বিভিন্ন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। অধিবেশন শেষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এবারের ডিসি সম্মেলনে ২৪টি কার্য-অধিবেশনে ৩৩৩টি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসাইন, শেরপুর জেলা প্রশাসক আনারকলি মাহবুব এবং টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম প্রমুখ বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ও এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রতি বছর ৩ দিন ধরে এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দেশের মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তথা ৬৪ জেলার ডিসিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এবারই প্রথম ৫ দিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো।
ডিসি সম্মেলন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা আপনাদের মেধা ও মনন দিয়ে এই দেশটাকে গড়ে তুলবেন। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলবই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি ল্য নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে। আপনাদের চাকরিতো দীর্ঘকালীন, আর আমাদের চাকরি স্বল্প মেয়াদের। ৫ বছরের জন্য আমরা নির্বাচিত হয়েছি। কাজেই এই ৫ বছরের মধ্যে আমাদের দেশটাকে একটা জায়গায় নিয়ে আসতে চাই। আমরা যে বাজেট দিয়েছি বা পরিকল্পনা নিয়েছি বা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা দিয়েছি তার ল্য হলো বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হবে।
তিনি বলেন, আপনারা জানেন যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্যের হার ১৮ ভাগ। আমরা তার থেকে অন্তত ১ ভাগ বেশি কমাতে চাই। আপনাদের প্রচেষ্টা থাকলে আমরা পারব।
শেখ হাসিনা বলেন, দুর্নীতির েেত্র স্পষ্ট কথাটা হচ্ছে, শুধু ঘুষ যে নেবে সে অপরাধী না, যে দেবে সেও সমানভাবে অপরাধী।
তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে আমাদের সমস্যা হয়: ডাক্তার থাকে না, সার্জন থাকে না, অ্যানেসথেসিস্ট থাকে না। উপজেলায় ডাক্তারদের বাসস্থান নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছি। ডাক্তারদের সেখানে রাখার ব্যবস্থাটা কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় করা যায় সেটা আমরা চিন্তা-ভাবনা করছি।

ডিসিদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর
৩১ দফা নির্দেশনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের করণীয় হিসেবে ৩১ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। তা হলো: ১. সরকারি সেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবেই হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার না হন, সেদিকে ল্য রাখতে হবে। ২. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে সর্বেেত্র শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আরো সতর্কতার সঙ্গে এবং কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ৩. যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রা করতে প্রয়োজনীয় সকল পদপে গ্রহণ করতে হবে। ৪. গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় স্থানীয় ক্ষদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ব্রতী হতে হবে। ৫. তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিতে হবে। দৈনন্দিন প্রয়োজনে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে জেলার সাধারণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ৬. তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করতে হবে। ৭. শিার সকল স্তরে নারীশিার হার বৃদ্ধি, শিার্থীদের বিদ্যালয় ত্যাগের হার হ্রাস এবং ঝরে পড়া শিার্থীদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পদপে নিতে হবে। ৮. ভূমি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ভূমি রায় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ৯. কৃষি-উৎপাদন বৃদ্ধিতে সার, বীজ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ইত্যাদির সরবরাহ নির্বিঘœ করার ল্েয প্রয়োজনীয় সকল পদপে নিতে হবে। ১০. ভেজাল খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ প্রতিরোধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ১১. দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কমিউনিটি কিনিকের কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। ১২. পরিবেশ রায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ সংক্রান্ত আইন ও বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ১৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় প্রশমনে সঠিক সময়ে সঠিক পদপে গ্রহণ করতে হবে। ১৪. গ্রাম আদালতগুলোকে কার্যকর করতে হবে। ১৫. জেলা প্রশাসকগণ জেলা পর্যায়ে যেসব কমিটির প্রধান, সেগুলো সক্রিয়, গতিশীল ও ফলপ্রসূ করতে হবে। ১৬. দপ্তরসমূহের বিদ্যমান সেবাসমূহ তৃণমূলে পৌঁছানোর ল্েয তথ্য মেলা, সেবা সপ্তাহ পালন ইত্যাদি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ১৭. শিল্পাঞ্চলে শান্তি রা, পণ্য-পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘœ করা এবং চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, পেশিশক্তি ও সন্ত্রাস নির্মূল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ১৮. বাজার-ব্যবস্থার সার্বণিক পর্যবেণের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। ভোক্তা-অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা রুখতে হবে। ১৯. নারী ও শিশু নির্যাতন ও পাচার, যৌতুক, ইভটিজিং এবং বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তিতে কাজ করতে হবে। ২০. নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ২১. শিশু-কিশোরদের পুষ্টিচাহিদা পূরণ এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ল্েয শিা, ক্রীড়া, বিনোদন ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংস্কৃতিবোধ ও বিজ্ঞানমনস্কতা জাগিয়ে তুলতে হবে। ২২. প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিশেষ পদপে গ্রহণ করতে হবে। ২৩. পার্বত্য জেলাসমূহের উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণের পাশাপাশি এ অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, বনাঞ্চল, নদী-জলাশয়, প্রাণিসম্পদ এবং গিরিশৃঙ্গগুলোর সৌন্দর্য সংরণ করতে হবে। এছাড়া পর্যটনশিল্প, ক্ষদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কুটিরশিল্পের বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। ২৪. ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী কেন্দ্রীয় পর্যায় হতে তৃণমূল পর্যন্ত উদযাপনের ল্েয প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২৫. ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে হবে। ২৬. বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে এ ব্যবস্থা নিতে হবে। ২৭. কোনো ঢালাও পরিকল্পনা নয়, জেলার চাহিদা অনুযায়ী এবং তার প্রকৃতি ও পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। ২৮. স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। মতার বিকেন্দ্রীকরণ, জনগণের চাহিদা এবং উন্নত জীবন নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশেষভাবে ল্য রেখে প্রকল্প ও উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। ২৯. প্রকৃতি ও পরিবেশ বজায় রেখে খেলাধুলার বিকাশে প্রত্যেক উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ৩০. মানুষের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাসহ সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠী, হিজড়া ও বেদে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে। ৩১. গৃহহারা, ভূমিহীন ও ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

জেলা প্রশাসকদের দায়িত্ব বেড়েছে
৫ দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন উপলক্ষে এবার ডিসিরা নিজেদের মতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোসহ মাঠপর্যায়ের সমস্যা সমাধানে ৩৩৩টি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। এর কিছু কিছু আমলে নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফাসহ প্রায় ৩৫০ নির্দেশনা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে তারা পেয়েছেন। এতে তাদের দায়িত্ব আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
জানা গেছে, ডিসি সম্মেলনে ঘুরেফিরে দুর্নীতি প্রতিরোধ, সন্ত্রাস নির্মূল ও ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এ ছাড়া জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পেয়েছেন ডিসিরা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপরে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে নিজেদের মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করার আশ^াস দিয়ে নিজ জেলায় ফিরে গেছেন তারা।
সম্মেলনে ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার, সরকারি জমি দখলমুক্ত করা, প্রাথমিক শিার উন্নয়ন, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা দূর, নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন, বাল্যবিবাহ রোধ, সরকারি স্থাপনা রণাবেণ, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিবেশ রায় ইটভাটার ওপর নজরদারি, জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এছাড়া কর্মকর্তাদের জন্য জনপ্রশাসন ব্যাংক ও বিশেষায়িত বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আশ^াস মিললেও তা সুস্পষ্ট নয়।
ডিসি সম্মেলনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা (ডিসি ও ইউএনও) মাঠ প্রশাসনে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। এসব সমস্যা ডিসি সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ মহলে তুলে ধরা হয়। মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো ডিসিরা সুপারিশ ও প্রস্তাব আকারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়ে থাকেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুমোদন সাপেে প্রস্তাবগুলো সম্মেলনের কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৫ সালের ডিসি সম্মেলনে প্রস্তাব ছিল ২৫৩টি, ২০১৬ সালে ৩৩৪টি, ২০১৭ সালে ৩৪৯টি এবং ২০১৮ সালে ছিল ৩৪৭টি। আর এ বছর ৩৩৩টি প্রস্তাব করা হয়। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা। সেখানে মাঠ প্রশাসনের নানা সমস্যার বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনাও দেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ২০১৬ সালে ১৯ দফা, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ২৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলতি বছর এ নির্দেশনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১ দফায়।
জানা গেছে, এবারের সম্মেলনে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য স্বতন্ত্র ব্যাংক গঠন এবং একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, জ্বালানি খরচের সিলিং তুলে দেয়াসহ ঝুঁকিভাতা চালু করার প্রস্তাব করেছিলেন ডিসিরা। এছাড়া ডিসিদের অধীনে সার্বণিক একটি বিশেষায়িত পুলিশ ফোর্স গঠন, জেলায় কর্মরত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের ম্যাজিস্ট্রেসি মতা দেয়ার এখতিয়ার ডিসিদের প্রদান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত করা, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সন্তানদের স্কুলে ভর্তির েেত্র কোটা সংরণ, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) এসিআর ইউএনওদের হাতে দেয়া এবং ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার হলে প্যানেল চেয়ারম্যানকে আর্থিক মতা দেয়াসহ নানা প্রস্তাব করা হয়। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘মুক্ত আলোচনা’য় কিছু সুযোগ-সুবিধা ও মাঠ প্রশাসনের কিছু বাধা তুলে ধরে এর প্রতিকার চান ডিসিরা। তারা সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধির চাপের বিষয় ও আইনি সুরা চান।
২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হওয়ার আগে ডিসিদের বিচারিক মতা ছিল। আগের ডিসি সম্মেলনগুলোতে ফৌজদারি অপরাধ আমলে নেয়াসহ বিচারিক মতা চেয়ে আসছিলেন ডিসিরা। এবারের সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বিষয়টি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা করতে গেলে আইন সংশোধন করতে হবে। তাই এটা হবে না।
ডিসি কার্যালয় ও সার্কিট হাউসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিসিদের অধীনে একটি বিশেষায়িত সার্বণিক পুলিশ ফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন কক্সবাজার, কুমিল্লা, বাগেরহাট ও চুয়াডাঙ্গার ডিসি। এ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, বিশেষ পুলিশ ফোর্সের প্রয়োজন নেই। কারণ, পুলিশরা সব সময় ডিসিদের সহযোগিতা করেন। ডিসিদের নির্দেশনায় পুলিশ সব জায়গায় কাজ করছেন। এছাড়া বিজিবি, আনসারসহ আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী সব সময় একসঙ্গে বসে কাজ করেন।
এবারের সম্মেলনে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য ‘জনপ্রশাসন ব্যাংক’ নামে আলাদা ব্যাংক স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন নোয়াখালীর ডিসি। এ ধরনের অধিকাংশ প্রস্তাবে আশ্বাস মিলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

৫ দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলনের সার সংক্ষেপ
জেলা প্রশাসক সম্মেলনে জেলা প্রশাসকরা পেয়েছেন সরকারের নির্বাহী ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও এবার প্রধান বিচারপতি, স্পিকার এবং তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে পাওয়া নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনেকটাই সহায়ক হবে। দেশের জনগণ বিভিন্ন সেবাপ্রাপ্তির জন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অফিসের ওপর নির্ভরশীল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে এবারের ডিসি সম্মেলন উদ্বোধন করেন। সেখানে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ডিসিরা।
গত ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে ডিসিদের দিকনির্দেশনা দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এর আগে ওই দিন ৬টি অধিবেশন ছিল, যেখানে বিদ্যুৎ, পরিবেশ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, শিা, সমাজকল্যাণ, যুব ও ক্রীড়া, মুক্তিযুদ্ধ, তথ্য, সংস্কৃতিসহ মোট ১৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কে আলোচনা হয়।
১৬ জুলাই বিকেলে সুপ্রিমকোর্ট জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাাৎ করেন ডিসিরা। ওইদিন মোট ৫টি অধিবেশন ছিল; যেখানে খাদ্য, দুর্যোগ ও ত্রাণ, পানিসম্পদ, নৌ পরিবহন, বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, পররাষ্ট্র, শ্রম ও কর্মসংস্থান, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক, আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় নিয়ে আলোচনা হয়।
১৭ জুলাই সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কে প্রতিরা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কার্য-অধিবেশন হয়। ওইদিন ৮টি অধিবেশনের মধ্যে প্রতিরা, সশস্ত্র বাহিনী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ, স্বাস্থ্য, মহিলা ও শিশু, ভূমি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
১৮ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ কে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন এবং মন্ত্রিপরিষদ বিষয়ক অধিবেশন শেষে দুপুরে হয় ডিসি সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশন। ওইদিন মোট ৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনে জনপ্রশাসন, জননিরাপত্তা, সুরাসেবা এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নিয়ে আলোচনা হয়। পরে বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কে ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়ার সঙ্গে ডিসিরা সৌজন্য সাাৎ করেন।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে নীতি বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জেলা প্রশাসন কর্মকর্তাদের দতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ডিসিদের অবশ্যই জেলার অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজের সমন্বয়ের পাশাপাশি জনগণের মৌলিক অধিকার পূরণে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কার্যকর সিদ্ধান্ত দিতে হবে। ডিসিদের সঙ্গে সমন্বয় আছে বলেই উন্নয়ন এত ত্বরান্বিত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার জয়নুল বারী ও বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ। এবারের ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ ৫৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অংশ নেয়। কার্য-অধিবেশনগুলোতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
এবারের ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারদের কাছ থেকে ডিসি সম্মেলনে আলোচনার জন্য ৩৩৩টি প্রস্তাব পাওয়া গিয়েছিল। কিছু কিছু বিষয় তাৎণিক সিদ্ধান্ত দিয়ে বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে ডিসিদের। এছাড়াও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে নির্দেশনা পেয়েছেন ডিসিরা।
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম জোরদারকরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ পুনর্বাসন কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ই-গভর্ন্যান্স, শিার মান উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবারকল্যাণ, পরিবেশ সংরণ ও দূষণ রোধ, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিবীণ ও সমন্বয় নিয়ে ডিসি সম্মেলনে আলোচনা হয়।