রাজনীতি

বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ: কাক্সিক্ষত সাড়া না পেয়ে হতাশ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব

বিশেষ প্রতিবেদক
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সংসদে যোগদান কোনো কিছুতেই যখন প্রত্যাশিত ফল আসছে না, তখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবার ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট ছেড়ে ‘একলা চলো’ নীতিতে হাঁটতে শুরু করেছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি ও গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি হিসেবে এবার একাই বিভাগীয় মহাসমাবেশ করছে বিএনপি। এরই মধ্যে বরিশাল, চট্টগ্রাম ও খুলনায় মহাসমাবেশ করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এ রাজনৈতিক দল। তবে বিএনপি সংশ্লিষ্ট দুই জোট – জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের এসব মহাসমাবেশে দেখা যায়নি। অবশ্য তাদেরকে এবার আমন্ত্রণও জানায়নি বিএনপি।
চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জোটসঙ্গী দলের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ না থাকায় বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। যদিও বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করছে, ‘একলা চলো’ নীতিতেই দলটি খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ অন্যান্য দাবি আদায়ে সক্ষম হবে। ভবিষ্যতে দল আরও শক্তিশালী হতে এই নীতি ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করছেন তারা।
পর্যায়ক্রমে সব বিভাগে এ মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। এ পরিকল্পনারই অংশ হিসেবে বরিশাল ঈদগাহ মাঠে গত ১৮ জুলাই বিএনপির মহাসমাবেশে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতারা বক্তব্য দেন। ২০ জুলাই চট্টগ্রামে এবং ২৫ জুলাই খুলনায় মহাসমাবেশ হয়। পরবর্তী মহাসমাবেশ হবে রাজশাহীতে। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
বিএনপি সূত্র বলছে, জোটসঙ্গীদের ছাড়া আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। বিশেষত ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তাদের মধ্যে প্রবল। তাই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে এখন আর আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তারেক রহমানের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির মতের অমিল ছিল। খালেদাপন্থিদের অনেকে তারেক রহমানের কাছে এর আগে জোর দাবি জানিয়েছেন, আপাতত তৃণমূল নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে এবং সরকারকে চাপে রাখতে প্রতি মাসে অন্তত দুই-একদিন হলেও বড় ধরনের কর্মসূচি হাতে রাখতে। সেটিকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি তিন বিভাগে মহাসমাবেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানেও নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে ভাটা লক্ষ্য করা যায়। প্রথম দিন বরিশালের মহাসমাবেশ ছিলো জ্যেষ্ঠ নেতাশূন্য! মির্জা ফখরুলের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের যে দূরত্ব, তারেক রহমানকে সেই বার্তা দেয়ার জন্য সমাবেশে উপস্থিত থাকা থেকে বিরত থাকেন একাংশ। অবশ্য চট্টগ্রামে দ্বিতীয় বিভাগীয় মহাসমাবেশের চিত্র পুরো উল্টে যায়। সেখানকার সমাবেশে ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে।
চট্টগ্রামে বিএনপির দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে ২০ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে সমাবেশ শুরু হয়। চলে বিকেল ৬টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত। নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্য রাখেন স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস-চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, মোহাম্মদ শাহজাহান, বরকতউল্লাহ বুলুসহ আরো অনেকে।
প্রধান অতিথির বক্তব্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়া বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতীক। তিনি উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। আজীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। এভাবে তিনি কারাগারে থাকা স্বাধীন দেশের নাগরিকের কাম্য নয়।
তিনি বলেন, যে মামলায় বেগম জিয়া আটক এগুলো কোনো মামলাই নয়। এগুলো সাজানো, মিথ্যা, বানোয়াট। খালেদা জিয়া এখন ঠিকভাবে চলতে পারেন না। ঠিকভাবে খেতে পারেন না। উচ্চ রক্তচাপ ওঠানাম করছে। তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। তাঁর চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থাও এই সরকার করছে না।
বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, থানায় থানায় গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে যেতে হবে। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সংগ্রাম করতে হবে। বাঁচার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।
এসময় তিনি, ‘মুক্তি! মুক্তি! মুক্তি চাই! খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’ বলেও স্লোগান তোলেন। নিরপে সরকারের অধীনে নিরপে নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতিও অনুরোধ জানান।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদ বলেন, বিএনপিকে ধবংস করে দিতে চাইছে এই সরকার। কিন্তু পারবে না। যতই নির্যাতন করেন না কেন, বিএনপির জয় হবে।
মওদুদ আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, মিথ্যা ভিত্তিহীন মামলায় ১৭ মাস ধরে কারাগারে খালেদা জিয়া। সরকার তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছে বিএনপি, কিন্তু পারেনি। কিছুদিনের মধ্যে খালেদা জিয়া আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি না হলে রাজপথে নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।
এদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে হাঁকডাক দিয়ে বিএনপিকে নিয়ে কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হলেও ভোটের পর ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে এই জোট। জোটের নেতাদের পারস্পরিক আস্থাহীনতার বিষয়টি ইতোমধ্যে সামনে এসেছে গত ১০ জুলাই কাদের সিদ্দিকীর জোট ছাড়ার মধ্য দিয়ে। কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকীর যুক্তি ছিল, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে যে জোট তারা গড়েছিলেন, নির্বাচনের পর গত ৭ মাসে তার কোনো অস্তিত্ব এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
তার ভাষ্যে, জাতীয় কোনো সমস্যাকে তারা তুলে ধরতে পারছে না। এরকম একটি জোট যে আছে, তা দেশের মানুষ জানেই না। এই অবস্থায় ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে দলগুলোর কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে; ঐক্যফ্রন্ট আদতে আছে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তারা।
গত সংসদ নির্বাচনের আগে ১৩ অক্টোবর কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তখন জোটে ছিল বিএনপি, জেএসডি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া। পরে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগও এতে যোগ দিয়েছিল।
ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে যোগ দেয়ার পর নির্বাচনেও অংশ নেয় বিএনপি; যদিও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কিংবা খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ তাদের কোনো দাবিই পূরণ হয়নি।
নির্বাচনের পর ফল প্রত্যাখ্যান পর্যন্ত একসঙ্গেই ছিলেন জোটের নেতারা। কিন্তু দল ও জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আকস্মিকভাবে গণফোরামের সুলতান মো. মনসুর আহমেদ এমপি হিসেবে শপথ নেয়ার পর দল ও জোটে অবিশ্বাসের শুরু হয়। নেতাদের মধ্যে দেখা দেয় পারস্পরিক অবিশ্বাস। তখন বিএনপিও তার বিরোধিতা করে। পরে তারাও অবস্থান বদলে সংসদে যোগ দেয়। তবে দুই দলের অবস্থান নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের অন্য দলগুলোর মনে প্রশ্ন থেকেই যায়। এনিয়ে মতবিরোধের সূত্র ধরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যায় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি।
জানা গেছে, গত দেড় মাসে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কিংবা কো-অর্ডিনেশন কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। ফ্রন্টের পে কোনো বিবৃতিও দেয়া হয়নি। গত ১০ জুন সর্বশেষ ফ্রন্টের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক বসেছিল উত্তরায় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দল জেএসডির সভাপতি আ স ম রবের বাড়িতে। সেই বৈঠকে কামাল হোসেন অসুস্থতার কথা বলে উপস্থিত হননি। উল্লেখ্য, ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর জোট পরিচালনার জন্য গঠন করা হয় জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি, যার নেতৃত্বে ছিলেন কামাল হোসেন। গত ৮ মাসে স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক হয়েছে ২৬টি, এর মধ্যে কামাল ছিলেন ২১টিতে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি প্রদান, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ধর্ষিতা নারী ও সিলেটে ছাত্রদলের নেতাকে দেখতে যাওয়া, নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে গণশুনানি ও জাতীয় প্রেসকাবে মানববন্ধন ছাড়া ঐক্যফ্রন্টের উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি।
বিভাগীয় শহরগুলোতে গণশুনানি ও সমাবেশের ঘোষণা এলেও সেই কর্মসূচি আলোর মুখ দেখেনি। নুসরাত হত্যা নিয়ে ঢাকায় শাহবাগের সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেও পরে তা স্থগিত করে।
জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক ডেকেছেন ড. কামাল। এসব কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির প্রতিনিধি দল।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ঐক্যফ্রন্টের পেছনে না ছুটে দল ও দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে সংগঠন গোছানোকে যুক্তিযুক্ত মনে করছেন তারা।
নির্বাচনের পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে স্কাইপে মতবিনিময় করেন। সেখানেও ঐক্যফ্রন্টের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল নেতারা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে সরে আসার মতও দেন অনেকে। এর কারণ হিসাবে তারা বলেছেন, যেকোনো কর্মসূচিতে উপস্থিত সব নেতাকর্মীই বিএনপির। অথচ খালেদা জিয়ার নামে স্লোগান দেয়া যাবে না, ফ্রন্টের নেতারা তার মুক্তি চাইবে না – এমন জোট না রাখাই ভালো।
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানেও নেতাদের অধিকাংশের মত ছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঐক্যফ্রন্টের প্রয়োজন নেই।
সম্প্রতি গণফোরামের এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেনকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আছে কি না? জবাবে তিনি বলেন, ওইটা (জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট) তো একটা নির্বাচনকে সামনে রেখে করা হয়েছিল। মূল্য ল্য ছিল নির্বাচন, মূল ল্য রেখে সেই ফ্রন্ট হয়েছিল। সেই মূল ল্য তো আমাদের থাকবেই। তবে এখন বন্যা সারাদেশে। আমি মনে করি, এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নয়, জনগণের আসল ঐক্য প্রয়োজন। এখানে কয়েক দলের ঐক্য নয়, সকল দল ও জনগণের ঐক্যকে আমি বেশি গুরুত্ব দিতে চাই।
ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল গণমাধ্যমকে বলেন, এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো কর্মসূচি নেই। তবে ভবিষ্যতে ফ্রন্টের কী অবস্থান হবে এবং কী কর্মসূচি হবে, তা আলোচনা করে ঠিক করা হবে।
বিএনপি নেতারা জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ার পেছনে দলটির নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্য ছিল- কারাবন্দি খালেদা জিয়ার অভাব পূরণ করতে দেশে-বিদেশে পরিচিত এমন কোনো রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। তাই ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। যদিও কামাল হোসেনকে খালেদা জিয়ার আসনে বসানো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে মনে করেন অনেক নেতাই। বিশেষ করে ড. কামাল হোসেন নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় তাকে নিয়ে বিএনপিতে ওই সময় থেকে সন্দেহ তৈরি হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, এখন মনে হয় ড. কামাল হোসেন বিএনপি নয়; সরকারেরই সুবিধা করে দিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান দল। ড. কামাল এই ফ্রন্টের নেতৃত্বে আছেন অথচ বিএনপি নেত্রীসহ নেতাকর্মীদের মুক্তি চাইবেন না। এটি কী হতে পারে? বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্ত হওয়ার পর তিনিই ঠিক করবেন ফ্রন্টের ভবিষ্যতে কী হবে। তাই এখন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি একাই মাঠে রয়েছে।
অপরদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি প্রধান অলি আহমেদ কিছুদিন আগে নতুন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ গঠন করেছেন। ২০ দলীয় জোটের ছোট কয়েকটি দল তার সঙ্গে রয়েছে। অলির নতুন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠনের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয় খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের কথা। তবে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে এখন পর্যন্ত জাতীয় মুক্তি মঞ্চের বড় কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির ডাকা বিভাগীয় সম্মেলনগুলোতেও ডাক পড়েনি অলির।
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের নাম করে সাবেক বিএনপি নেতা অলি আহমেদ হঠাৎ নতুন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম (জাতীয় মুক্তি মঞ্চ) গড়ায় সন্দেহের কারণ হয়েছে। অলির ভূমিকাকে গুরুত্বহীন করতেও খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন জোরদার করেছে বিএনপি।
তবে মওদুদ আহমদ, মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আমান উল্লাহ আমানসহ বিএনপির মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাই আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে আসছেন দীর্ঘ সময় ধরে। কিন্তু তারেক রহমান, প্রবাসী বুদ্ধিজীবীবৃন্দ এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে দল গোছানোর কাজে বেশি মনোযোগী হয়েছেন। ফলে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন বেগবান হচ্ছিলো না। এখন দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাপে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন জোরালো করার লক্ষ্যে মাঠের কর্মসূচি নিয়ে এগুচ্ছে। এতেও প্রত্যাশিত পর্যায়ে সাড়া না পেয়ে হতাশ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব।
এর নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান করে জানা যায়, বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এখন নিশ্চিত হয়েছে যে, বর্তমান সরকার ও প্রশাসন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকবে। তাই স্রোতের প্রতিকূলে অবস্থান নিয়ে তারা ক্ষমতাসীনদের বিরাগভাজন হতে চাচ্ছেন না। বরং বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা যে যার মতো করে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে তুলতে ব্যস্ত। এ সম্পর্ক তাদের নিজ নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য সুখ শান্তি নির্বিঘœ ও নিরাপদ করবে। তাদের অনেকেই বিএনপি ও খালেদা জিয়ার জন্য তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারিবারিক জীবন বিপন্ন করতে রাজি নয়।