প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্রে প্রিয়া সাহার উসকানিমূলক বক্তব্য : সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রেরই আলামত

বিশেষ প্রতিবেদক
দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন সারাদেশে নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে বসবাস করছে। দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা ও অস্থিরতা নেই।
দেশে যখন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ-পরিস্থিতি বিরাজ করছে, ঠিক এমন এক সময়ে হঠাৎই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে দেশের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য দিয়ে অভিযোগ করেছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেত্রী প্রিয়া সাহা।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) শারি’র পরিচালক প্রিয়া সাহা ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে ওয়াশিংটনে আয়োজিত এক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গত ১৭ জুলাই হোয়াইট হাউসে যান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাহায্য চেয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মৌলবাদীদের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু-বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান নিখোঁজ (ডিজঅ্যাপিয়ার্ড) হয়েছেন।’ তারা যেন নিরাপদে দেশে থাকতে পারেন, সে জন্য ট্রাম্পের সহায়তা চান প্রিয়া সাহা। তিনি বলেন, আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই। এখন সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। আমরা আমাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছি। তারা আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। তারা আমাদের ভূমি দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বিচার পাইনি।
যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রিয়াকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, আমরা কখনো মনে করি না, পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্রের কাছে সমস্যা তুলে ধরলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের সমস্যার সমাধান হবে।
এদিকে হঠকারী মন্তব্যের জন্য প্রিয়া সাহার সমালোচনা এবং তার বিচার দাবিতে মুখর হন দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ ও বিশিষ্টজনরা। প্রশ্ন উঠছে, প্রিয়া কি শুধুই ব্যক্তিগত স্বার্থে এমন জঘন্য মিথ্যাচার করেছেন, নাকি তার পেছনে দেশি-বিদেশি বড় ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে, যারা বাংলাদেশের ক্ষতি করার ছক এঁটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ বলেছেন, প্রিয়া সাহার এমন বক্তব্যের পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন। দেশের বিশিষ্টজনদের কেউ কেউ প্রিয়ার কর্মকা-ে বিস্ময় প্রকাশের পাশাপাশি নানা প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ একে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো অপরাধ বলেছেন। বাংলাদেশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীও প্রিয়ার সমালোচনা করেছেন।
মিথ্যাচারের মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ুণেœর জন্য প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান কামাল। এটা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক, পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
এদিকে বিতর্কিত প্রিয়া সাহাকে সরকার নিরাপত্তা দেবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মাল্টা সফর শেষে দেশে ফেরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। গত ২৪ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এটা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাাতের পরিপ্রেেিত প্রিয়া সাহা বাংলাদেশে এলে তাকে গ্রেপ্তারের পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা সেটা জানতে চেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমরা বলেছি, তাকে গ্রেপ্তারের পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমরা তার বিরুদ্ধে মামলাও করতে চাই না। আমরা তাকে নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত।
অপরদিকে বাহরাইন ও ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ইরান সংকট নিয়ে একটি বৈঠক শেষে ছবি তুলে টুইটারে পোস্ট দেন। সেই ছবিতে হাস্যোজ্জ্বল এই দুই নেতার পেছনের একটি চেয়ারে বসে থাকতে দেখা গেছে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সদ্য বরখাস্ত সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহাকে।
ইসরাইলি দৈনিক টাইমস অব ইসরাইলে এ ছবি প্রকাশের পর প্রিয়া সেখানে কেন এবং কী উদ্দেশ্যে গেছেন, সামাজিকমাধ্যমে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। বলা চলে, এক বিতর্ক শেষ না হতেই অন্য বিতর্কের মুখে পড়লেন প্রিয়া সাহা।
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলার জানিয়েছেন, মার্কিন দূতাবাস বাংলাদেশ থেকে ৫ জন প্রতিনিধি এবং দুজন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ওয়াশিংটনের ওই সম্মেলনে পাঠিয়েছিল।
উল্লেখ্য, ‘শারি’ নামে বাংলাদেশের দলিত সম্প্রদায় নিয়ে একটি এনজিও-র পরিচালক প্রিয়া ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দলিত কণ্ঠ’ নামক একটি পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক। পিরোজপুরের মেয়ে প্রিয়ার স্বামী মলয় কুমার সাহা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তা। তাদের দুই মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করে।
সমালোচনার মুখে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় প্রিয়া বলেছেন, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সরকার যাতে ‘একসঙ্গে কাজ করতে পারে’ সে জন্যই তিনি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সহযোগিতা চেয়েছেন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা তার উদ্দেশ্য ছিল না।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ
থেকে প্রিয়া সাহাকে বহিষ্কার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর পর প্রিয়া সাহাকে সংগঠন থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। গত ২২ জুলাই সন্ধ্যায় সংগঠনের স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত এ বিষয়ে বলেন, ‘সংগঠনের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহাকে সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী কাজের জন্য সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে সকল সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, ওই সম্মেলনে তাদের প্রতিনিধি হয়ে প্রিয়া সাহা যাননি। তিনি যা বলেছেন, তাও তার নিজস্ব বক্তব্য; সাংগঠনিক বক্তব্য নয়।

‘প্রিয়া সাহা আমার তথ্য-উপাত্ত বিকৃত
করে উপস্থাপন করেছেন’: বারকাত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহা অভিযোগ করেছিলেন, ‘১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনসংখ্যার হার ছিল ২৯ দশমিক ৭ ভাগ। আর ২০০১ সালের জরিপ অনুযায়ী এখন সংখ্যালঘু জনসংখ্যার হার ৯ দশমিক ৭ ভাগ। এখন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক ১ কোটি ৮০ লাখ। তার মানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক লোক বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেছেন।’
২১ জুলাই প্রিয়া সাহা নিজের পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ‘শারি’র ইউটিউব চ্যানেলে পোস্ট করা ৩৫ মিনিটের একটি ভিডিওবার্তায় সংখ্যালঘুরা দেশ থেকে ‘ডিসঅ্যাপিয়ার’ হয়ে যাচ্ছে বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন তার ব্যাখ্যা দেন।
সেখানে প্রিয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি সমিতির সভাপতি আবুল বারকাতকে রেফারেন্স টেনে বলেন, ‘আমি এক সময় তার (আবুল বারকাত) সঙ্গে কাজ করেছি। আবুল বারকাত বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করেই গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রতিদিন গড়ে ৬৩২ জন সংখ্যালঘু বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। আমি সেই গবেষণা থেকেই রেফারেন্স দিয়েছি।’
কিন্তু প্রিয়া সাহার এই বক্তব্যে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আবুল বারকাত। তিনি জানান, তার গবেষণাকে বিকৃত করে তথ্য দেয়া হয়েছে। ২২ জুলাই আবুল বারকাত তার স্বারিত এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন।
আবুল বারকাত বলেন, আমার হিসাবে প্রায় পাঁচ দশকে (১৯৬৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত) আনুমানিক ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দুধর্মাবলম্বী নিরুদ্দিষ্ট হয়েছেন। (উৎস: আবুল বারকাত, ২০১৬ বাংলাদেশ কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি, পৃঃ ৭১) অর্থাৎ আমি কোথাও ‘৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নিখোঁজ রয়েছেন’ – এ কথা বলিনি। উপরন্তু তিনি কোথাও বললেন না যে, আমার গবেষণা তথ্যটির সময়কাল ৫০ বছর-১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত।
প্রিয়া সাহা আরো দাবি করেন, ‘২০১১ সালে স্যারের (আবুল বারকাত) সঙ্গে আমি সরাসরি কাজ করেছিলাম যার কারণে বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত।’
এ ব্যাপারে আবুল বারকাত তার বিবৃতিতে বলেন, প্রিয়া সাহা কখনও আমার সহ-গবেষক, গবেষণা সহযোগী অথবা গবেষণা সহকারী ছিলেন না। ২০১১ সালে সরকারি আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে ১৯০১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার উল্লেখ করেছি মাত্র।